অধ্যাপক ড. সলিমুল্লাহ খান বলেছেন, ‘আমরা সমতাভিত্তিক বাংলাদেশ চাই। ১৯৭১ সালেও যে তিনটি উদ্দেশ্য সামনে রেখে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, তার মধ্যে ছিল সাম্য, ন্যায় ও মর্যাদাভিত্তিক রাষ্ট্র। কিন্তু ১৯৭২ সালে যে সংবিধান রচনা করা হলো, সেখানে এ বিষয়গুলো অনুপস্থিত ছিল। আপনারা জানেন, এই যে ফ্যাসিবাদী সিস্টেম গড়ে উঠেছে, তা ২০০৭ বা ২০০৮ সালের পর থেকে গড়ে ওঠা। তবে এর গোড়াপত্তন হয়েছিল সেই ১৯৭২ সালেই। তারা মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে বেইমানি করেছে। এটি নিয়ে আমি একটি বই সম্পাদনা করেছি, যার নাম হচ্ছে বেহাত বিপ্লব ১৯৭১।’ গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর জাতীয় জাদুঘর মিলনায়তনে ‘কী চাই নতুন বাংলাদেশে’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানটি আয়োজন করে বেনার নিউজ। এ সময় প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মাহাদী আমিন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ, গুম হওয়া ব্যক্তিদের খোঁজে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠান ‘মায়ের ডাক’র সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম তুলি, লেখক ও গবেষক ড. মোবাশ্বর হাসান, অভিনেত্রী নওশাবা আহমেদ এবং ২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানে দুজন শহীদের অভিভাবক উপস্থিত ছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির বিচার হওয়া উচিত মন্তব্য করে সলিমউল্লাহ খান বলেন, ‘আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি যে ভূমিকা রেখেছিল, সেজন্য তাদের বিচার হওয়া উচিত। তারা শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল শুধু তাই নয়, নির্লজ্জ প্রেস রিলিজও দিয়েছিল; কিন্তু এরপরও তারা স্বাভাবিকভাবেই তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। দ্রুত এদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ফ্যাসিবাদ আসমান থেকে নাজিল হয়নি। আমাদের মধ্য থেকেই তৈরি হয়েছে। সরকার যদি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে না পারে, তাহলে তার বসার যোগ্যতা নেই। অন্তর্বর্তী সরকারকে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে বাংলাদেশকে একটি সাম্যের রাষ্ট্রে পরিণত করতে হবে।’
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, ‘যেসব শহীদের নাম এসেছে, তাদের আমরা নিখুঁতভাবে খুঁজে বের করেছি। ফলে একটু দেরি হয়ে গেছে। এটুকু আমি বলতে পারি। আর যাদের হাতে রক্ত আছে, যারা এই ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেছে, তাদের আগে বিচার করতে হবে। না হলে আমরা এই ইতিহাসকে ধারণ করতে পারব না। তাদের (শহীদদের) সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে। এদের (আওয়ামী লীগ) মধ্যে কোনো অনুশোচনা নেই, বরং ওরা একটা বড় গল্প নিয়ে আসছে, তিন হাজার পুলিশ মারা গেছে, তাই আমরা এগুলো করেছি। এটাতেই তারা এই যে বাচ্চা ছেলেগুলোকে মেরেছে, সেটার বৈধতা দিচ্ছে। এই জায়গায় কোনো ধরনের ছাড় হবে না, এদের বিচার হবেই। যার হাতে রক্ত আছে, তার আগে বিচার করতে হবে।’
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মাহাদী আমিন বলেন, ‘আমরা সেই বাংলাদেশ দেখতে চাই, যেটা আসলে গত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী আমলে অনেকেই অনেক ত্যাগ, অনেক সংগ্রাম করেও অর্জন করতে পারিনি। আমরা সেই বাংলাদেশ চাই, যেখানে মনে করব আমরা সত্যিই স্বাধীন দেশের নাগরিক। আমরা সেই বাংলাদেশ চাই, এমন একটি শাসনব্যবস্থা চাই, যেখানে জবাবদিহি থাকবে, স্বচ্ছতা থাকবে। আমরা চাই, এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে মেধার বিকাশ ঘটবে, জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য কোনো একটি রাজনৈতিক দল করতে হবে না। আমরা চাই সেই মেধাভিত্তিক বাংলাদেশ, যেখানে সৃজনশীলতা দিয়ে, মেধা দিয়ে, যোগ্যতা দিয়ে, যার যার ভাগ্যের পরিবর্তন হবে। আমরা সেই বাংলাদেশ চাই, যেখানে আমাদের ধর্ম, বর্ণ, বিদ্যা, আদর্শ, রাজনীতি যার যে মতাদর্শই হোক না কেন, প্রত্যেকেরই সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠা করা হবে। ক্ষমতার পরিবর্তন মানে কিন্তু একটা দল থেকে আর একটা দলের কাছে ক্ষমতা চলে যাওয়া না, রাজনীতির সংস্কৃতি পরিবর্তন হওয়া। আমরা চেষ্টা করছি আমাদের অবস্থান থেকে যতটুকু সম্ভব ইতিবাচক রাজনীতি করা।’
বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলো সমঝোতার রাজনীতি শুরু করে দিয়েছে এবং আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করতে চাচ্ছে উল্লেখ করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রকাঠামোকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আমরা তাদের দেশ থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য করেছি। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ফিরবে কী ফিরবে না, সেই সময় এখনো আসেনি। আওয়ামী লীগের বিচার না করা পর্যন্ত যারা এই আলোচনাটি করছে, তারা মূলত কখনোই এই ফ্যাসিবাদবিরোধী জুলাইয়ের আন্দোলনকে প্রকৃতপক্ষে হৃদয়ে ধারণ করেনি।’