জশ হেজেলউডের শর্ট লেংথের বলে এজ হয়ে উসমান খাজার হাতে ক্যাচ দিয়ে ৫ রানে ফিরে যান বিরাট কোহলি। সবশেষ পাঁচ ইনিংসেও তার রান যথাক্রমে ১, ১৭, ৪, ১, ৫। এই কোহলি একসময় মাঠে নামলে ২২ গজ হয়ে যেত কুরুক্ষেত্র, ব্যাট হত তরবারি। যেন মহাভারতের অর্জুনের বেশে হাজির হতেন তিনি। সেই কোহলি আজ অস্ট্রেলিয়ার পার্থে পার্থ (অর্জুনের আরেক নাম) হতে পারলেন না। আজ পেসে আউট হলেও তাকে এখন হাঁসফাঁস করতে দেখা যায় স্পিনারদের বেলায়। পরিসংখ্যান ঘাটলে বলা যায় করোনা পরবর্তী সময় থেকেই রান খরায় ভুগছেন সাবেক বিশ্বসেরা এই ব্যাটসম্যান। তার ব্যাট থেকে সবশেষ সেঞ্চুরি এসেছিল ১৪ ইনিংস আগে গত বছরের ২০ জুলাইতে উইন্ডিজের বিপক্ষে। সেঞ্চুরিহীন বছর কাটিয়ে দিতে চলা কোহলি বারবার পড়ছেন স্পিনারদের ফাঁদে।
২০২১ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত ঘরের মাঠে বিরাট কোহলি ৩৮ ইনিংস খেলেছেন। যার মধ্যে ২৭ বার তিনি আউট হয়েছেন স্পিনারদের বলেই। আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে ঐ সময়ে তিনি বেশি আউট হয়েছেন বাহাতি অর্থডক্স ও ডানহাতি অফ স্পিনারদের বোলারদের ডেলিভারিতে। চলতি বছরে তিনি এই দুই ধরনের বোলারকে মোট ৮ ইনিংসে মোকাবেলা করেছেন, যার মধ্যে ৭ ইনিংসে তাদের বলেই আউট হয়েছেন। ২০২৩ সালে ৯ ইনিংসের মধ্যে এই ঘটনা ঘটেছে ৮ বার।
অথচ ক্যারিয়ারের শুরুতে নিজের জাত চিনিয়ে স্পিনারদের কাছে কোহলি হয়ে উঠেছিলেন মূর্তিমান এক আতঙ্ক। অভিষেকের পর থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত স্পিনারদের বিপক্ষে তার গড় ছিল ৫০ এর বেশি। কিন্তু গত চার বছরে বারবার হোঁচট খাওয়াতে সেটা নেমে এসে হয়েছে ২৮.৩।
কোহলি কি তবে স্পিনারদের খেলতে ভুলে গেছেন? গত চার বছরে তিনি বাহাতি স্পিনারদের এমন সব বলে আউট হয়েছেন, যেগুলো ভেতরে সোজা আসছে অথবা ভেতরের দিকে ঢুকছে সেগুলোতে। এসব বলে তিনি রক্ষণাত্মক শট খেলতে গিয়েই আউট হচ্ছেন।এখানে আরেকটি সমস্যা হচ্ছে শরীর বরাবর আসা বলগুলোতে তিনি সাড়া দিচ্ছেন। সাবকন্টিনেন্টের কন্ডিশনে তার বডি মুভমেন্ট এবং ব্যাটিং স্টাইলকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন ভ্যারিয়েশন ব্যবহার করেন স্পিনাররা। যার ফলে কোহলি ঠিকভাবে বল পড়তে পারছেন না।
অফস্পিনারদের ক্ষেত্রে আবার দুটি বিষয়। অ্যারাউন্ড দ্যা উইকেটে এসে তারা বলগুলো ভেতরের দিকে ঢোকানোর চেষ্টা করছেন, আর সেগুলো রক্ষণাত্মক শট খেলতে গিয়েই তিনি আউট হচ্ছেন। এছাড়া ওভার দ্যা উইকেটে বোলাররা তার শরীর বরাবর বল করছেন কিংবা স্টাম্প লক্ষ্য করে ভেতরের দিকে ঢোকানোর চেষ্টা করছেন, তখনই একই ধরনের শট খেলতে গিয়ে তিনি আউট হচ্ছেন।
মাঠে যখন কোহলি একটা সময় স্পিনারদের খেলতেন, ধারাভাষ্যকার তাকে বলতেন সর্বকালের সেরা স্পিন হিটার ব্যাটসম্যান। কিন্তু তিনিই এখন তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন। কি কারণে এই সমস্যাটা হচ্ছে সেটা নিয়েও সবসময় আলোচনা হয় তাকে নিয়ে। এক্ষেত্রে বেশ কিছু উদাহরণও সামনে আনা হয়। তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা সময় ২০১৬-২০১৭ সালের দিকে স্পিনারদের খেলতে গেলে কেমন করতেন সেটাও তুলে ধরা হয়েছে।
ঐ সময়টাতে কোহলির একটা কৌশল দেখা যেত সবসময়। সেটা হলো স্পিনারদের যে বলগুলো ভেতরের দিকে আসত, সেগুলোতে তিনি বাম পা একটু পেছনের সরিয়ে নিয়ে জায়গা করে আক্রমণাত্মক শট খেলতেন। পেছনের পায়ের মুভমেন্ট বেশ ভালো সুইফট থাকত। ২০১৬ সালে তিনি ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১৬৩ করেছিলেন। সেখানে তাকে দেখা গেছে, বাহাতি স্পিনারদের খেলছেন আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে। যে শটগুলো খেলার আগে তিনি একটা জায়গা তৈরি করে নিয়ে। যা তার সুইফট ফুটওয়ার্কের কারণে সম্ভব হয়েছিল। ঐ বছর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও সুলেমান বিনের বল তাকে খেলতে দেখা গিয়েছিল। যেখানে ইনসাইড-আউট শট খেলতেন তিনি। বাংলাদেশের বিপক্ষে ২০১৮ সালে একটা ডাবল সেঞ্চুরি করেছিলেন। সেখানেও দেখা গেছে তার ফুটওয়ার্কের জাদু। তাইজুল-মিরাজদের খেলতে গেলেই বলের পথ থেকে শরীর সরিয়ে জায়গা করে নিয়ে তিনি খেলতেন।
কিন্তু বর্তমান সবশেষ কয়েকটি ইনিংসে কোহলির পেছনের পা খুব বেশি নাড়াচাড়া করতে দেখা যায় না। এই ফুটওয়ার্কের কারণেই হয়তো তার স্পিনারদের বিপক্ষে খেলাটা কঠিন হয়ে উঠেছে। পেছনের পা আগের মতো আর সুইফট হচ্ছে না। যা হতে পারে তার ফুটওয়ার্কের সমস্যার কারণে। অথবা বয়সটাও ৩৬ ছাড়িয়েছে, সে কারণেও হতে পারে। যেমনটা রাহুল দ্রাবিড়ের ক্যারিয়ারের শেষের দিকে দেখা যেত তিনি প্রচুর এলবিডব্লিউয়ের শিকার হচ্ছিলেন তিনি।
কোহলির ক্ষেত্রে যেটা দেখা যাচ্ছে ভারতের মাটিতে বল যখন একটু টার্ন করছে, ঐ সময়টাতে শরীর বরাবর আসা বলগুলো পড়তে পারছেন না এবং জায়গা তৈরি করে খেলতে পারছেন না। অথচ ক্যারিয়ারের সেরা সময়টাতে তিনি কত দৃষ্টিনন্দন ব্যাটিং শৈলী দেখিয়ে তিনি এসব শট খেলতেন। এখন না পারার কারণ সেই ফুটওয়ার্ক। যাকে ক্রিকেটের ভাষায় লেক অফ বডি মুভমেন্ট বলা হয়। দীর্ঘ ১৬ বছরের ক্যারিয়ারের ধকলে হয়তো বা শরীর আগের মতো শট খেলার সময় সায় দিচ্ছে না তাকে। তাই ব্যাটিং নিয়ে বিরাট সমস্যায় ভুগছেন বিরাট কোহলি।