সংকট কোথায়?

যে মুহূর্তে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্যবৃদ্ধির জেরে নাভিশ্বাস উঠছে সাধারণ মানুষের, ঠিক তখনই শুরু হয়েছে দৈনন্দিন ব্যবহার্য ওষুধ নিয়ে একশ্রেণির মুনাফাখোরের কারসাজি। চাহিদা বেশি ও প্রচুর বিক্রি হয় এমন ৩০টিরও বেশি ওষুধের দাম বাড়ানো হয়েছে। গত এক মাসেরও কম সময়ে এগুলোর দাম বেড়েছে ২০ থেকে ৮৪ শতাংশ পর্যন্ত এ যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। দুর্জনের যেমন ছলের অভাব নেই, তেমনি ওষুধের দাম বাড়ার কারণ হিসেবে ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধিকে দুষছেন ওষুধ শিল্প সমিতির কোনো কোনো নেতা।

চিকিৎসা বাবদ মাসিক মোট খরচের বড় অংশই ওষুধের পেছনে ব্যয় হচ্ছে।  এ রকম বাস্তবতায় ওষুধভেদে বড় ব্যবধানে দাম বাড়ানো হয়েছে। জ¦ালানি তেল ও ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ওষুধের বাজারে তার প্রভাব পড়েছে বলে দাবি করেছে ঔষধ প্রশাসন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে ওষুধের দাম বাড়লে চিকিৎসা বড় ধরনের সংকটে পড়বে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের তথ্যমতে, একজন মানুষের মোট চিকিৎসা ব্যয়ের ৬৪ শতাংশ ওষুধ বাবদ খরচ হয়। আবার এই খরচ করতে হয় রোগীর পকেট থেকে। অর্থাৎ দেশের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা নিতে গিয়ে ওষুধ কিনতেই মানুষের সবচেয়ে বেশি ব্যয় হচ্ছে। আমাদের দেড় হাজারের বেশি ধরনের ৩৫ হাজারেরও বেশি ব্র্যান্ডের ওষুধ রয়েছে, যার মধ্যে কেবল ১১৭টি ওষুধের মূল্য সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। তার মানে, এর বাইরের ‘সিংহভাগ’ ওষুধ সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে! এ বিষয়ে শুক্রবার দেশ রূপান্তরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। জানা যাচ্ছে, ওষুধের মূল্য সবচেয়ে বেশি বেড়েছে গত ১৫ দিনে। এসবের মধ্যে ঠান্ডা, কাশি, ডায়াবেটিস, শ্বাসকষ্ট, স্নায়বিক সমস্যা, ব্যথানাশক, অ্যান্টিবায়োটিক, ভিটামিন, গ্যাস্ট্রিক, উচ্চ রক্তচাপ, চর্ম ও প্রদাহজনিত, আগুনে পোড়া ও ঘুমের ওষুধসহ বিভিন্ন রোগের ওষুধ রয়েছে। কিছু কোম্পানির বেশ কিছু ওষুধের তীব্র সংকট চলছে দীর্ঘদিন ধরে। কিছু ফার্মেসি আগে স্টক করা ওষুধও বিক্রি করছে চড়া দামে। কিছু বিদেশি ওষুধের বৈধ সরবরাহ নেই। অবৈধ পথে দেশে আসছে, বিক্রিও হচ্ছে বেশি দামে। ফলে ওষুধ কিনতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে সাধারণ মানুষ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক নাহিদ আক্তার জাহান জানিয়েছেন, এ বিষয়ে সরকারের নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। তা না হলে দেশের চিকিৎসা খাত নিম্নবিত্ত মানুষের আওতার বাইরে চলে যাবে এবং তার সার্বিক প্রভাব পড়বে জনস্বাস্থ্যের ওপর।  

সরকার এ বিষয়ে কী করতে পারে? সবার আগে এক্ষেত্রে সরকারের নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। তা নাহলে দেশের চিকিৎসা খাত নিম্নবিত্তের আওতার বাইরে চলে যাবে এবং এর সার্বিক প্রভাব পড়বে জনস্বাস্থ্যের ওপর। জীবনরক্ষাকারী ওষুধগুলোর দাম প্রাইভেট মার্কেটের ওপর ছেড়ে দেওয়া যাবে না। এর মূল্য নির্ধারণে সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক আশরাফ হোসেন বলেন, ‘যে ওষুধগুলোর দাম বেড়েছে, সেগুলোর অনুমতি নেওয়া ছিল ২০১৪-১৫ সালে। অনেক কোম্পানি দাম বাড়িয়েছে। যারা এতদিন দাম বাড়ায়নি তারা এখন মূল্য সমন্বয় করছে।’ সম্প্রতি দু-তিনটি কোম্পানিকে মূল্য সমন্বয়ের অনুমতি দেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘১০-১২ বছর আগে দাম বাড়ানোর অনুমতি নেওয়া ছিল। আমরা দাম বাড়াতে কিংবা সমন্বয় করতে চাই না। কিন্তু দাম না বাড়ালে কোম্পানিগুলো উৎপাদন বন্ধ করে দেবে। তখন পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। এ কারণে কিছু ওষুধের মূল্য সর্বনিম্ন পর্যায়ে সমন্বয় করা হয়েছে।’ কিন্তু এর ফলে সাধারণ মানুষের ওপর যে প্রভাব পড়বে, তার প্রতিক্রিয়া কেমন হবে?

ওষুধের মূল্য নিয়ে বাজারে অব্যাহতভাবে যে নৈরাজ্য চলছে,  কোম্পানিগুলোর অধিক মুনাফা অর্জন ও দাম নিয়ে যে রকম স্বেচ্ছাচারিতা চলছে, তা বন্ধ করা জরুরি। মানুষকে বাঁচাতে হবে। বিশেষ করে, নিম্নবিত্ত এবং মধ্যবিত্তকে উদ্ধার করতে হবে মূল্যবৃদ্ধির চক্র থেকে। বাজারে ওষুধের সংকট কাটাতে হবে, ওষুধের উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সমন্বয় করতে কী পরিমাণ দাম বাড়াতে হবে, তার নিয়ন্ত্রণ সরাসরি সরকারের ওপর থাকা দরকার। পাশাপাশি লক্ষ রাখতে হবে যাদের এই দায়িত্ব, তারা যেন কোনোভাবেই ‘দুর্নীতি’ ব্যাধিতে আক্রান্ত না হন। আসল সংকট কোথায়, সেটি চিহ্নিত হওয়া জরুরি।