এক রাজ্যে নিরঙ্কুশ জয় অন্য রাজ্যে ভরাডুবি

ভারতের দুই রাজ্য মহারাষ্ট্র ও ঝাড়খণ্ডের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল স্পষ্ট হয়েছে আগেই। মহারাষ্ট্রে নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে ক্ষমতাসীন বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট। আর ঝাড়খণ্ডে ঐতিহ্যের ধারা ভেঙে ইতিহাস গড়েছে ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা-কংগ্রেস-এনিডএর সম্মিলিত ইন্ডিয়া জোট। তবে ভোটের আগে দুই রাজ্যের চিত্র ছিল পুরোপুরি ভিন্ন। মাত্র ছয় মাস আগে ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজ্য মহারাষ্ট্রের লোকসভা নির্বাচনে বিরোধীদের কাছে ভরাডুবি হয়েছিল এনডিএ জোটের। ফলে বিধানসভা নির্বাচনেও বিরোধী জোট মহাবিকাশ আঘাদি জয়ের স্বপ্ন দেখছিল। আর ঝাড়খণ্ডে লোকসভা নির্বাচনে আদিবাসী প্রভাবিত রাজ্যটিতে জয় পেয়েছিল নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহর দল। বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাজ্যটিতে তথাকথিত বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী ইস্যু সামনে এনে জেএমএম-কংগ্রেস জোটকে সরিয়ে বিধানসভাতেও ক্ষমতায় আসার পরিকল্পনা করেছিল বিজেপি জোট। তবে ঝাড়খণ্ডে তাদের সেই কৌশল কোনো কাজে আসেনি। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সেখানে দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে হেমন্ত সোরেনের ইন্ডিয়া জোট।

মহারাষ্ট্র

কয়েক বছর ধরে ছবির মতো বদলেছে মহারাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। বিজেপি-কংগ্রেসের লড়াইয়ের বাইরে রাজ্যটির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে শিবসেনা ও এনসিপি। এই দুদলের বিভাজন মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ২০২২ সালে একটি বড়সংখ্যক বিধায়ক নিয়ে শিবসেনা থেকে বেরিয়ে আসেন দলটির প্রতিষ্ঠাতা বালাসাহেব ঠাকরের অতি ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত একনাথ শিন্ডে। জোট ভেঙে বেরিয়ে এসে শিন্ডে হাত মেলান বিজেপির সঙ্গে। এরপর ভাঙন ধরে মহারাষ্ট্রের আরেক পুরোধা রাজনীতিক শরদ পাওয়ারের ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টিÑ এনসিপিতেও। চাচা শরদ পাওয়ারের দল থেকে বেরিয়ে বিজেপি ও শিবসেনার (শিন্ডে) সঙ্গে জোট গড়েন ভাতিজা অজিত পাওয়ার। আর উদ্ধব ঠাকরে শিবসেনার বাকি অংশ নিয়ে থেকে যান মহাবিকাশ আঘাদি জেটে। মহারাষ্ট্রের ২৮৮টি আসনের মধ্যে বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ২৩৬টি আসন। যার মধ্যে ১৩২টি আসনেই জিতেছে বিজেপি। শিন্ডের দল ৫৭টি ও অজিত পাওয়ারের এনসিপি জিতেছে ৪১টি আসনে। অন্যদিকে শিবসেনা (উদ্ধব)-এনসিপি-কংগ্রেসের জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন। মহারাষ্ট্রের নির্বাচনে বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোটের এই সাফল্যের পেছনে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির নয়, বরং এটিকে কৌশলগত জয় বলে দেখা হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজ্যটিতে মহাজুটি জোটের নেওয়া কিছু প্রকল্প বিরোধী জোট মহাবিকাশ আঘাদির সঙ্গে পার্থক্য গড়ে দিয়েছে। এর মধ্যে প্রান্তিক নারীদের উন্নয়নে নেওয়া অর্থ প্রকল্প,

কৃষকদের জন্য নেওয়া সম্মাননিধি প্রকল্প নির্বাচনে তাদের নিরঙ্কুশ জয়ের পথ প্রশস্ত করেছে। মুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডের সরকার নারীদের উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি জনমনে ইতিবাচক প্রভাব রেখেছে। কৃষকদের ভোট পেতে তাদের সম্মাননিধি প্রকল্পের অর্থ ১২ হাজার টাকার পরিবর্তে ১৫ হাজার টাকা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল শিন্ডের সরকার। এমনকি ভোটের আগে পেঁয়াজ রপ্তানির ওপর থেকে বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করেও কৃষকদের মুখে হাসি ফুটিয়েছিল ক্ষমতাসীনরা। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য অন্তত ২০ শতাংশ বাড়ানোর কথাও ঘোষণা করা হয়েছে। দিল্লিতে আম আদমি পার্টির বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকিনীতির সমালোচনা করলেও মহারাষ্ট্রে কেজরিওয়ালের দেখানো পথেই হেঁটেছে এনডিএ জোট, যা মহারাষ্ট্রের মতো

কৃষিপ্রধান রাজ্যে বিজেপিকে সুবিধা দিয়েছে। এর পাশাপাশি জাতীয়তাবাদী ভোটব্যাংককে এককাট্টা করা এবং অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির ভোটারদের নিজেদের দিকে টানার চেষ্টা করেছিল এনডিএ জোট। মেরূকরণের সেই কৌশলও তাদের পক্ষে কাজ করেছে। প্রয়াত বালাসাহেব ঠাকরের পুত্র উদ্ধবের বদলে মারাঠা ভোটারদের শিন্ডের নেতৃত্বাধীন শিবসেনাকেই বেছে নেওয়ায় সেটিই স্পষ্ট হয়েছে।

আর ক্ষমতাসীনদের হারাতে জোটবদ্ধ হয়ে লড়লেও শিবসেনা (উদ্ধব)-এনসিপি-কংগ্রেস জোট খুব একটা সুবিধা করে উঠতে পারেনি। নিজেদের ভেতর মতপার্থক্য ও কৌশল নির্ধারণে ভুলকে তাদের হারের পেছনে মুখ্য কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভোটের আগে বিরোধী জোটের নেতারা বিশেষত, উদ্ধব ঠাকরে এবং শরদ পাওয়ার জোটের প্রচার ছেড়ে নিজেদের আসন বাঁচাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। তাতে চিড় খায় বিরোধী ঐক্য। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আসনরফা নিয়ে বিরোধী জোটের টানাপড়েনকে বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন বিশ্লেষকরা। এমনকি নারীদের উন্নয়নে প্রকল্পে বিজেপি জোটের থেকে বেশি পরিমাণ অর্থ বাড়ানোর ঘোষণা দিলেও, তাতে আস্থা রাখেনি মহারাষ্ট্রের নাগরিকরা। অর্ধশতক ধরে মারাঠা রাজনীতির ব্যাটন ছিল ঠাকরে পরিবারের হাতে। সদ্য সমাপ্ত এই নির্বাচনের ভেতর দিয়ে মারাঠা রাজনীতিতে বালা ঠাকরের পরিবার তাদের সেই ঐতিহ্য অনেকাংশেই হারিয়ে ফেলল। নির্বাচনে এই জোটের বিপর্যয়ের পেছনে উদ্ধব ঠাকরের অনমনীয় মনোভাব নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

ঝাড়খণ্ড

মহারাষ্ট্রের ঠিক বিপরীত চিত্র ছিল ঝাড়খণ্ডে। লোকসভা নির্বাচনে জয়ের পর রাজ্যটির বিধানসভা নির্বাচনেও বাজিমাতের প্রত্যাশা ছিল বিজেপির। আর সেজন্য নির্বাচনী প্রচারের সময় তথাকথিত বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী ইস্যুতে রাজ্যের মানুষের সমর্থন আদায়ে জোর চেষ্টা চালিয়েছে বিজেপি। তবে বিজেপির কৌশল যে কাজে লাগেনি, সেটি স্পষ্ট হয়েছে ভোটের ফলে। রাজ্যের ৮১টি আসনের মধ্যে ৫৬টি আসনে জয়ী হয়েছে জেএমএম। ২৪টি আসনে জয় পেয়েছে বিজেপি।

আদিবাসীদের মন জোগাতে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকে হাতিয়ার করে ঝাড়খণ্ডে প্রথম থেকেই সুর চড়িয়েছিল বিজেপি। ঝাড়খণ্ডে মোট জনসংখ্যা ২৬ শতাংশেরও বেশি আদিবাসী। সব মিলিয়ে রাজ্যটিতে ভোটারদের ৪০ শতাংশের বেশি আদিবাসী ভোটার রয়েছে। আদিবাসী ভোটব্যাংককে নিজেদের দিকে টানতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি থেকে শুরু করে অমিত শাহ, রাজনাথ সিংয়ের মতো শীর্ষ নেতারা বিরোধীদের বিরুদ্ধে সরাসরি তোপ দেগেছেন। কিন্তু ভোটের ফলাফল বলছে, আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকাগুলোয় এক তরফাভাবে জয় পেয়েছে ঝাড়খণ্ড জনমুক্তি মোর্চা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছে, আদিবাসীদের ক্ষেত্রে সংরক্ষণ ইস্যুতেই বিজেপির বিরুদ্ধে খেলা ঘুরিয়েছেন দ্বিতীয় দফায় রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নিতে যাওয়া হেমন্ত সোরেন।

এমনকি এই রাজ্যেও দলীয় বিভাজন ঘটিয়েছে বিজেপি। দুর্নীতির অভিযোগে হেমন্ত সোরেন জেলে যাওয়ার পর মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান চম্পাই সোরেন। চলতি বছর জুলাইয়ে জেল থেকে মুক্তির পর আবারও মুখ্যমন্ত্রী হন হেমন্ত সোরেন। এরপরই চম্পাই সোরেন এবং সীতা সোরেন বিজেপিতে যোগ দিলেও ঝাড়খণ্ডের মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারেননি। পাশাপাশি কোলিয়ারি অঞ্চলে কুড়মিদের সমর্থন আদায়ের জন্য অল ঝাড়খণ্ড স্টুডেন্ট ইউনিয়নের সঙ্গে গেরুয়াদের জোট বাঁধার কৌশলও কাজে আসেনি। সব জল্পনার অবসান ঘটিয়ে জেএমএম নেতৃত্বাধীন জোটের ওপরই ভরসা রেখেছে ঝাড়খণ্ডের নাগরিকরা।

মুখ্যমন্ত্রী হবেন কে?

মহারাষ্ট্রের নির্বাচনে বড় জয়ের পর মধুর সমস্যার মুখে পড়েছে বিজেপি জোট। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডে নাকি রাজ্যটির বিজেপিপ্রধান দেবেন্দ্র ফড়নবিশ কে বসতে যাচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রীর মসনদে? তাই নিয়ে চলছে জল্পনা-কল্পনা। মুখ্যমন্ত্রী বাছাইয়ে অজিত পাওয়ারের এনসিপিও বড় ভূমিকা নিতে পারে। এই আলোচনার মধ্যেই মহাজুটির তিন নেতা গতকাল রবিবার নিজ দলীয় জয়ী প্রার্থীদের নিয়ে বৈঠক করেন। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, বৈঠকগুলো আলাদা আলাদা হলেও নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে কে শপথ নেবেন সেটিই মূল আলোচনার বিষয়। জোট শরিকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আসন জয় পেয়েছে বিজেপি। ফলে দেবেন্দ্র ফড়নবিশ মুখ্যমন্ত্রীর গদিতে বসতে পারেন বলে মনে করা হচ্ছে। তবে মহারাষ্ট্রে এমন বিপুল জয়ের পেছনে নেওয়া প্রকল্পগুলো শিন্ডের মস্তিষ্কপ্রসূত হওয়ায় ফের তাকেই মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দাবি করতে চায় শিবসেনা। কিন্তু এতগুলো আসনে জয়ের পর বিজেপি সেই সিদ্ধান্ত মানবে কি না সেটিই প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে।

মুম্বাইয়ে নিজের বাসভবনেই বিজেপির কোর কমিটির বৈঠক করেন ফড়নবিশ। বান্দ্রায় এক হোটেলে দলের জয়ী প্রার্থীদের নিয়ে বৈঠকে বসেন শিন্ডে। অন্যদিকে, নিজের বাড়িতেই এনসিপি নেতাদের নিয়ে বৈঠক করেন অজিত। আজ সোমবার তিন দলের নেতাদের মধ্যে সম্মিলিত বৈঠক হওয়ার কথা। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই বৈঠকেই ঠিক হতে পারে মহারাষ্ট্রের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রীর নাম। নতুন মুখ্যমন্ত্রী কে হবেন সংবাদমাধ্যমের এমন প্রশ্নে সতর্ক উত্তর দিয়েছেন বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডে। তিনি বলেন, আমরা যেভাবে একসঙ্গে নির্বাচনে লড়েছি, তেমনি তিনটি দল একসঙ্গে বসেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। একই সুরে কথা বলেছেন দেবেন্দ্র ফড়নবিশও।