নিকট অতীতে বাংলার যে কয়েকজন মনীষী দ্বীনের প্রতিটি স্তরে অসামান্য অবদান রেখেছেন তাদের মধ্যে সৈয়দ ফজলুল করিম (রহ.) অন্যতম। তিনি ছিলেন সত্যিকারের একজন সুফি সাধক। যিনি রাজনীতি ও সুফিবাদকে সমন্বিত করেছেন। একই ব্যক্তি খানকায় পীর, ময়দানে বীর। তিনি চাইলে সুফিবাদের নিভৃতচারী ব্যক্তি হতে পারতেন। নির্জনে শুধু ইবাদত বন্দেগিতে ব্যস্ত থাকার সুযোগ ছিল। জগৎবিচ্ছিন্ন হয়ে নিজেকে গুটিয়ে রাখলে কেউ তাকে বাধা দেওয়ার ছিল না, বরং তখন তিনি হতেন দলমত নির্বিশেষে প্রশংসিত। কিন্তু বিপরীতে তিনি করেছেন সমন্বয় সাধন। এতে তার পথ যেমন রুদ্ধ হয়েছে তেমন আশার আলোও দেখা গিয়েছে। এখন সেই আলো দিবালোকের মতো সবার সামনে সুস্পষ্ট। রাতের আঁধারে দরদ ভরা কণ্ঠে আহ্বান করতেন রবের কাছে। দিনের বেলায় গর্জে উঠতেন প্রচলিত সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে। তিনি ধর্মীয় রাজনীতিকে মুক্ত করেছেন স্বার্থান্বেষী মহল থেকে। স্রোতের বিপরীতে গিয়ে ধর্মীয় রাজনীতিকে তার নিজস্ব সত্তায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাসাউফের মূল ধারায় ছিলেন সম্পূর্ণ অটল ও অবিচল। সুফিবাদকে যারা কলুষিত করার অপপ্রয়াস চালিয়েছিল, তাদের জন্য তিনি ছিলেন যমদূতের মতো। তিনি মনে করতেন শরিয়ত বাদ দিয়ে মারেফত অসম্ভব।
তার দর্শন শুধু ব্যক্তি নয়, বরং সমাজ ও রাষ্ট্রকে পরিশুদ্ধ করার নীতিই ছিল অন্যতম। তিনি বলতেন, সমাজ ও রাষ্ট্র পরিশুদ্ধির জন্য সর্বপ্রথম নীতি ও আদর্শের পরিবর্তন দরকার। তার স্লোগান ছিল, শুধু নেতা নয়, নীতিরও পরিবর্তন চাই। তিনি মনে করতেন শুধু দল কিংবা নেতার পরিবর্তনে শান্তি প্রতিষ্ঠা অসম্ভব।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও ছিল তার বেশ গ্রহণযোগ্যতা। ভারত পাকিস্তানের গণ্ডি পেরিয়ে আরব বিশ্বেও ছিল তার যথেষ্ট কদর। বিশ্ববরেণ্য স্কলারদের কাছে তিনি ছিলেন সমাদৃত। অতিথি হয়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। ভাষণ প্রদান করেছেন ঐতিহাসিক আরাফাত ময়দানে। তার সেই ভাষণে ছিল মুসলিম উম্মাহকে পূর্বের চেতনায় জাগ্রত করার খোরাক। ভাষণে প্রভাবিত হয়েছেন উম্মাহর আলেমরা। ১৯৯৭ সালে কুয়েত সিটিতে ওলামা সম্মেলনে তার ভাষণ ছিল যুগান্তকারী। ৭১ বছরের কর্মময় পুরো জীবনটাই ছিল উম্মাহর জন্য নিবেদিত। তিনি ছিলেন উম্মাহর খাদেম। কুরআন সুন্নাহর ধারক, বাহক ও প্রচারক।
ক্ষণজন্মা এই মনীষী ১৯৩৫ সালে নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা সৈয়দ ইসহাক (রহ.) ছিলেন তৎকালীন শীর্ষ আলেমে দ্বীন। আপন পিতার নিবিড় তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠেন। পিতার কাছেই হয় শিক্ষার হাতেখড়ি। চরমোনাই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৫ বছর লেখাপড়া করে ১৯৪৫ সালে পিতার প্রতিষ্ঠিত চরমোনাই কামিল মাদ্রাসায় ভর্তি হন। এখান থেকে দাখিল, আলিম ও ফাজিল সম্পন্ন করেন। এ সময় তিনি মুফতিয়ে আজম হজরত মাওলানা আবদুল মুঈজ বিহারি (রহ.)-এর শিষ্যত্ব লাভ করেন।
অতঃপর ১৯৫৬ সালে উচ্চশিক্ষা অর্জনের লক্ষ্যে ঢাকার লালবাগ মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে দুবছর অধ্যয়ন করেন। লালবাগ জামিয়া থেকে ১৯৫৭ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করেন। লালবাগে অধ্যয়নকালে তিনি ধন্য হয়েছেন যুগশ্রেষ্ঠ ওলামা ও মাশায়েখের শিষ্যত্ব লাভ করে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন হজরত মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী (রহ.), আল্লামা হেদায়াতুল্লাহ (রহ.), হজরত মাওলানা মুহাম্মদ উল্লাহ হাফেজ্জি হুজুর (রহ.), হজরত মাওলানা আবদুল মজিদ ঢাকুবী হুজুর (রহ.), হজরত মাওলানা মুফতি আবদুল মুহিত (রহ.) এবং শাইখুল হাদিস হজরত মাওলানা আজিজুল হক (রহ.) প্রমুখ যুগশ্রেষ্ঠ বুজুর্গ ও মাশায়েখ। লালবাগে অধ্যয়নকালে তার বিস্ময়কর মেধা ও প্রতিভা দেখে হাফেজ্জি হুজুর (রহ.) তাকে তিরমিজি শরিফের পরীক্ষায় ১০০ নম্বরের জায়গায় ১০৫ নম্বর প্রদান করেন।
শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করার পর এ মনীষী চরমোনাই মাদ্রাসায় অধ্যাপনার কাজ শুরু করেন। এখানে অসাধারণ দক্ষতার সঙ্গে তিনি দীর্ঘ দেড় যুগ দ্বীনি শিক্ষাদান করেন। এ সময় তিনি হাদিস, ফিকহ, উসুলে ফিকহ ও তাফসিরসহ বিভিন্ন বিষয়ের পাঠদান করেন। আরবি সাহিত্যের উচ্চতর কিতাব মাকামাতে হারিরি তিনি অনায়াসে পড়াতেন। এতে আরবি সাহিত্যে তার অসাধারণ দক্ষতা ও যোগ্যতা ফুটে ওঠে। সাবলীল ও সুন্দর উপস্থাপনায় আরবি বলতে ও লিখতে পারতেন।
পীর সাহেব চরমোনাই (রহ.)-এর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ১৯৮৭ সালে গড়ে ওঠে ইসলামি শাসনতন্ত্র আন্দোলন নামে একটি স্বতন্ত্র ধর্মীয় রাজনৈতিক সংগঠন। দেশের মুসলিম সমাজে আল্লাহর জিকির জারি করতে ১৯৮২ সালে বাংলাদেশ মুজাহিদ কমিটির যাত্রা শুরু করেন। ১৯৮২ সালে চরমোনাই কওমি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। কোরআনের শিক্ষাকে সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে তিনি ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশ কোরআন শিক্ষাবোর্ড গঠন করেন। দেশের ছাত্র সমাজের নৈতিক অবক্ষয় রোধে ১৯৯১ সালে ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন প্রতিষ্ঠা করেন।
হজরত পীর সাহেব চরমোনাই (রহ.) ছাত্র জীবনেই স্বীয় পিতা ও শায়েখ হজরত মাওলানা সৈয়দ মুহাম্মদ ইসহাক (রহ.)-এর কাছে বাইয়াত গ্রহণ করেন। জাহেরি ইলমের পাশাপাশি তিনি বাতেনি ইলমও অর্জন করেন। এই মনীষী আজীবন উম্মাহর সেবায় নিজেকে উজাড় করে দিয়ে ২০০৬ সালের ২৫ নভেম্বর লাখ লাখ ভক্তকে শোক সাগরে ভাসিয়ে রবের ডাকে সাড়া দিয়ে পরপারে পাড়ি জামান। আল্লাহতায়ালা এই মহান সাধককে জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন। আমিন।