দীর্ঘ দরকষাকষির পর চুক্তি

প্রায় তেত্রিশ ঘণ্টা দরকষাকষির পর জলবায়ু অর্থায়ন নিয়ে সমঝোতা হলেও এ নিয়ে গরিব দেশগুলো খুবই হতাশ। জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনে গরিব দেশগুলোকে ৩০০ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে ধনী দেশগুলো। জলবায়ু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুতি ও প্রতিরোধে সহায়তার জন্য প্রতি বছর এ পরিমাণ অর্থ দেওয়া হবে।

আজারবাইজানে ক্লান্তিকর দুই সপ্তাহের বিশৃঙ্খল দরকষাকষির পর প্রায় ২০০টি দেশ এ বিষয়ে একমত হতে পারল। এর মধ্য দিয়ে শেষ হলো কনফারেন্স অব পার্টিজ (কপ)। এটা এই সম্মেলনের ২৯তম আসর। গত ১১ নভেম্বর কপ শুরু হয়, শেষ হওয়ার কথা ছিল শুক্রবার। তবে এক দিন সময় বাড়ানো হয়। তবে সমঝোতায় পৌঁছতে গতকাল রবিবার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।

চুক্তির আওতায় ২০৩৫ সাল পর্যন্ত ওই পরিমাণ অর্থ সহায়তা করা হবে। আগের চুক্তিতে ধনী দেশগুলো ২০২০ সালের মধ্যে প্রতি বছর ১০০ বিলিয়ন অর্থায়ন করার কথা ছিল। সেই প্রতিশ্রুতি দুই বছর দেরিতে ২০২২ সালে পূরণ করা হয়েছিল, যার মেয়াদ শেষ হবে আগামী বছর।

জাতিসংঘ জলবায়ু সংস্থার প্রধান সাইমন স্টেইল বলেছেন ‘এটা ছিল কঠিন যাত্রা, কিন্তু আমরা চুক্তিটি করতে পেরেছি।’

যদিও জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসার জন্য দেশগুলোর প্রতি যে আহ্বান গত বছর করা হয়েছিল, সে বিষয়ে কোনো চুক্তি এবারের সম্মেলনে করা যায়নি। বিবিসি ও বিভিন্ন সূত্রে খবর।

গত শনিবার গরিব ও উন্নয়নশীল দেশগুলো, বিশেষত জলবায়ুঝুঁকিতে থাকা দেশগুলো নাটকীয়ভাবে আলোচনা থেকে বেরিয়ে এসেছিল।

ছোট দ্বীপ রাষ্ট্রগুলোর যে জোট, তার প্রধান সেডিরক সুসটার বলেন, ‘আমি এটা বাড়িয়ে বলছি না যে, আমাদের দ্বীপগুলো ডুবে যাচ্ছে। একটা দুর্বল চুক্তি নিয়ে আমরা আমাদের নারী, পুরুষ ও শিশুদের কাছে ফেরত যাব, এটা আপনারা প্রত্যাশা করেন কী করে?’

শেষ পর্যন্ত গতকাল রবিবার কিছু পরিবর্তন এনে চুক্তিটি চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করে। এ সময় করতালি ও উল্লাস করেন অনেকে। তবে অন্যরা যথেষ্ট সহায়তা না করায় ধনী দেশগুলোকে তীব্রভাবে তিরস্কার জানায়। তারা বিতর্কিত পরিকল্পনার মাধ্যমে তাড়াহুড়া করে সম্মেলন শেষ করায় স্বাগতিক দেশ আজারবাইজানের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে। ভারতীয়দের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখে বোঝা যাচ্ছিল, গভীর হতাশা থেকেই গেছে।

‘আমরা এটা গ্রহণ করতে পারি না... এখানে যে লক্ষ্যের কথা বলা হয়েছে তা আমাদের সমস্যার সমাধান করবে না। আমাদের দেশের জন্য যে পদক্ষেপ জরুরি দরকার তার জন্য এটা সহায়ক হবে না,’ বলছিলেন ভারতীয় প্রতিনিধি লিলা নন্দন।

এরপর সুইজারল্যান্ড, মালদ্বীপ, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ কিছু দেশ প্রতিবাদ জানায়। তারা বলছে জীবাশ্ম জ্বালানির বৈশি^ক ব্যবহার কমিয়ে আনার জন্য চুক্তিতে যে ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে তা খুবই দুর্বল।

তবে আরও অর্থের অঙ্গীকার মানে হলো, দরিদ্র দেশগুলো যে জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যায্য বোঝা বহন করে চলেছে তার প্রতি একটি স্বীকৃতি। জলবায়ু সংকটের পেছনে এসব দেশের অবদান তুলনামূলক অনেক কম, কিন্তু তারাও এর শিকার হচ্ছে।

যুক্তরাজ্যের জলবায়ু পরিবর্তন কমিটির (সিসিসি) সদস্য নাইজেল টোপিং ধনী দেশগুলোর বার্ষিক ৩০০ বিলিয়ন প্রতিশ্রুতি অগ্রগতির লক্ষণ হলেও সহায়তার পরিমাণ এখনো কমই। অন্যদিকে আগের চেয়ে তিনগুণ। তিনি বলেন, ভবিষ্যৎ জলবায়ু আলোচনায় আরও বেশি অর্থায়নের সুযোগ দেখছেন তিনি।

নতুন করে এবার যে অর্থের প্রতিশ্রুতি এসেছে, সেটি আসবে সরকারি মঞ্জুরি ও ব্যাংক-ব্যবসার মতো বেসরকারি খাত থেকে। তবে দেশগুলোকে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যেতে আরও সহায়তা করা দরকার।

৩০০ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি দেশগুলো একমত হয়েছে যে, জলবায়ু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অন্তত ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার দরকার।

চলতি বছরও গরম আবহাওয়ার রেকর্ড হতে যাচ্ছে। সঙ্গে নিয়মিতই দেখা গেছে দাবদাহ ও প্রাণঘাতী ঝড়।

এবারের আলোচনার শুরুতে ১১ নভেম্বর বেশি কথা হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচন নিয়ে। তিনি জানুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নিবেন। তিনি জলবায়ু নিয়ে সন্দেহবাদী মানুষ, যিনি যুক্তরাষ্ট্রকে প্যারিস চুক্তি থেকে সরিয়ে নেবেন বলেছিলেন। ২০১৫ সালের ওই চুক্তি জলবায়ু সংকট মোকাবিলার ক্ষেত্রে দেশগুলোকে একটি পথনকশা দিয়েছিল।

‘অন্য উন্নত দাতা দেশগুলো প্রকৃত অর্থে জানে যে, ট্রাম্প একটি পয়সাও দেবে না,’ ক্যামব্রিজ বিশ^বিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক জলবায়ু দরকষাকষিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোয়ানা ডেপ্লেজ বিবিসিকে বলেছেন।

তবে চুক্তিতে উপনীত হওয়ার অর্থ হলো দেশগুলো জলবায়ু বিষয়ে এক হয়ে কাজ করতে এখনো অঙ্গীকারবদ্ধ। তবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশটি এর অংশ হতে চাইছে না, যা কয়েক বিলিয়ন ডলার মূল্যের লক্ষ্য অর্জনকে কঠিন করে তুলবে।

যুক্তরাজ্যের জ্বালানিমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড বলেছেন, নতুন প্রতিশ্রুতির অর্থ এই নয় যে, যুক্তরাজ্য আরও অর্থ নিয়ে এগিয়ে আসবে, তবে ব্রিটিশ ব্যবসার জন্য অন্য বাজারগুলোতে বিনিয়োগের একটি বড় সুযোগ। তিনি বলছিলেন, ‘জলবায়ুর জন্য এটি শেষ মুহূর্তের একটি কঠিন চুক্তি। আমি বা আমরা যা চাই, তার জন্য এটাই সব নয় তবে সবার জন্য এটি এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া।’

আর বেশি অর্থের অঙ্গীকারের বিনিময়ে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো চাইছে দেশগুলো জীবাশ্ম জ্বালানি কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে আরও জোরালো অঙ্গীকার করুক।