ইউক্রেন যুদ্ধ আরও তুঙ্গে নাকি অন্তিমপর্বে

সম্প্রতি প্রভাবশালী ব্রিটিশ পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ানে মার্কিন প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টোফার এস চিভিস ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে চলমান যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে এই কলামটি লিখেছেন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কমলা হ্যারিসের পরাজয় এই যুদ্ধের গতিপ্রকৃতিকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করেছে। প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ইউক্রেনের সমর্থনে পরপর দুটো অপ্রত্যাশিত ও আকস্মিক পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, এতে যুদ্ধের সমীকরণ খুব একটা বদলাবে না। ইউক্রেন সামরিকভাবে পরাস্ত হতে চলেছে। আগামী বছর রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য হবে ন্যাটো ও ইউক্রেন। কূটনৈতিক দরকষাকষিতে এগিয়ে থাকার কৌশল খুঁজতে পশ্চিমা কূটনীতিবিদরা তাই এখন ব্যস্ত। সেই নিরীখে এই কলামটি প্রাসঙ্গিক। যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ থিংকট্যাংক কার্নেগি এনডাওমেন্টের পরিচালক ও জন্স হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের খন্ডকালীন শিক্ষক ক্রিস্টোফার পেন্টাগনেও দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। লেখাটি মূলত তার কলাম অবলম্বন করে এগিয়েছে। এটি ধারণা করা অমূলক হবে না যে, তার কলামে মার্কিন প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চিন্তারই প্রতিফলন ঘটেছে।

পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, ইউক্রেন যুদ্ধ নতুন পর্যায়ে প্রবেশের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। যুদ্ধের ময়দানে রাশিয়ার পক্ষে যোগ দিয়েছে উত্তর কোরিয়ার সৈন্যরা। যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহকৃত অস্ত্র দিয়ে রুশ ভূখ-ের গভীরে ইউক্রেন আঘাত হেনেছে এবং ক্রেমলিন পারমাণবিক অস্ত্র প্রয়োগের হুমকি আবারও দিয়েছে। সাম্প্রতিক এসব ঘটনাপ্রবাহে যুদ্ধটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার শঙ্কা ঘনীভূত করেছে। কিংবা এসব ঘটনা হয়তো যুদ্ধটিকে চূড়ান্ত পরিণতির দিকেও নিতে পারে! অক্টোবর মাসে উত্তর কোরিয়া রুশ শিবিরে ১১ হাজার সৈন্য পাঠায়। বাইডেন প্রশাসনের মতে, এটি অগ্রহণযোগ্য উসকানি। কয়েক দিন পরই তারা ইউক্রেনকে দূরপাল্লার মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র রাশিয়ায় নিক্ষেপের অনুমতি দেয়। জবাবে রাশিয়া তাদের পরমাণু নীতিতে পরিবর্তন আনে। এতে বলা হয়, পরমাণু শক্তিধর নয় এমন দেশের বিপক্ষে রাশিয়া পারমাণবিক অস্ত্র প্রয়োগ করতে পারে। বলা বাহুল্য, হুমকিটা ইউক্রেনের প্রতি।

রাশিয়ার অভ্যন্তরে এটিসিএমএস (আর্মি টেকটিক্যাল মিসাইল সিস্টেম : ৩০০ কি.মি. দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম সুপারসনিক ব্যালিস্টিক মিসাইল) নিক্ষেপের অনুমোদন এই যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ একটি বাঁক। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণও বটে। ইউরোপীয় দেশগুলোও ইউক্রেনকে মিসাইল সরবরাহ করার সময় যেসব বিধিনিষেধ দিয়েছিল তা প্রত্যাহার করতে পারে। এই প্রথমবারের মতো রাশিয়ার অভ্যন্তরে কোনো লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে মার্কিন অস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। দুই পরাশক্তির মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষ লাগার ক্ষেত্রে যা তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ। রাশিয়া বারবার জানিয়েছে দূরপাল্লার এসব হামলাকে তারা রুশ ভূখন্ডের ওপর ন্যাটোর আক্রমণ হিসেবে বিবেচনা করবে। প্রত্যুত্তরে রাশিয়া বাল্টিক সাগরের নিচে ইন্টারনেটের তার কেটে দিতে পারে। হুতি বা আমেরিকার অন্য কোনো প্রতিপক্ষকে সামরিক সহযোগিতা করার মধ্য দিয়েও তারা এর জবাব দিতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রে এবং রণক্ষেত্রে এই যুদ্ধের কৌশলগত প্রেক্ষাপট বদলে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে মসনদের পেছনে অপেক্ষা করছেন  ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি একদিনের মধ্যে এই যুদ্ধ থামানোর প্রতিজ্ঞা করেছিলেন। বাস্তবতা হলো, কার্যকর কোনো আলোচনার জন্য দুনিয়া জুড়ে কয়েক মাসব্যাপী নিবিড় কূটনৈতিক তৎপরতার প্রয়োজন হবে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশগুলো, প্রতিপক্ষ এবং ইউক্রেন ও রাশিয়ার সঙ্গে। শান্তি নিশ্চিত করার পথে যেসব জটিল ইস্যু রয়েছে সহসা বা সহজে তার সমাধান হবে না। যুদ্ধের ময়দানে ভারসাম্যও বদলে গেছে। একসময় দরকষাকষির ক্ষেত্রে প্রধান বাধা ছিল ভলোদিমির জেলেনস্কির কট্টরপন্থি ও অর্জন করা সম্ভব নয় এমন সব লক্ষ্যমাত্রা। আর এখন কূটনীতিবিদদের জন্য মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে রণক্ষেত্রে রুশ সাফল্য। কেননা সাফল্যের সংবাদ মস্কোকে কিয়েভ দখলের ব্যাপারে আশাবাদী করে তুলেছে। রাশিয়ার অনেকের পর্যবেক্ষণ যত খাবে, পাল্লা দিয়ে ক্ষুধাও তত বাড়বে।

রাশিয়াকে যুদ্ধবিরতির ব্যাপারে রাজি করাতে পরবর্তী মার্কিন সরকারের হাতে তাই যত বেশি তাস থাকবে তত সুবিধা হবে। এটিএসিএমএস ব্যবহারের বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করে বাইডেন ট্রাম্পের হাতে দারুণ একটি তাস তুলে দিয়েছেন। এই সিদ্ধান্ত ক্রেমলিনকে জলদি কূটনৈতিক সমাধানের পথ বেছে নিতে উৎসাহিত করবে। তবে এটা যথেষ্ট হবে না। রাশিয়ার অভ্যন্তরে এ জাতীয় হামলার অনুমোদন দেওয়ার ব্যাপারে বাইডেন প্রশাসনের সতর্কতা যথার্থ ছিল। কিন্তু রাশিয়া এই সুযোগে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করেছে। বাইডেন যদি রাশিয়ার ওপর আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তাহলে যুদ্ধবিরতি নিয়ে দেনদরবারের সময় ট্রাম্প সেগুলো উঠিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব দিতে পারবেন। রাশিয়া যদিও ইতোমধ্যেই শক্ত নিষেধাজ্ঞার কবলে আছে কিন্তু তারা এটা সামলে নিয়েছে এবং পাশ্চাত্যের ওপর তাদের নির্ভরতা কমিয়ে ফেলেছে। দেনদরবারের সুবিধার্থে নিষেধাজ্ঞা এমনভাবে আরোপ করা উচিত যেন রাশিয়া ছাড় দিতে রাজি হলে হোয়াইট হাউজ অনায়াসেই কিছু নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে পারে।

যুদ্ধ বন্ধ করার ব্যাপারে ট্রাম্পের পরিকল্পনা এখনো ঘোলাটে। যুদ্ধবিরতি যৌক্তিক একটি লক্ষ্য হতে পারে। এর ফলে ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব রক্ষা পাবে এবং ন্যাটোতে না হলেও ইউরোপীয় ইউনিয়নে একদিন তাদের যোগদানের সম্ভাবনা অটুট থাকবে। তবে ট্রাম্প মন্ত্রিসভায় যাদের নিয়েছেন ইউক্রেন ও রাশিয়া নিয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি মিশ্র। তুলসী গ্যাবার্ডের মতো কয়েকজন পুরো ইউক্রেনকে রাশিয়ার হাতে ছেড়ে দিতে পারলে খুশি হবে। অন্যদিকে মার্কো রুবিও এবং মাইকেল ওয়াল্টজের মতো মন্ত্রীরা কঠোর পদক্ষেপ নিতে উৎসাহী। নতুন সরকার যাত্রা শুরু করার পরেই যদি দেখা যায় রুশরা জিততে চলেছে, তাহলে এমনকি ট্রাম্পও ক্রেমলিনের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিতে পারেন। আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের সময় বাইডেনের নাকানিচুবানি খাওয়ার পুনরাবৃত্তি এড়ানোর জন্য তিনি এমনটা করবেন। ট্রাম্প দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক সপ্তাহ পরই ইউক্রেন যুদ্ধ গড়াবে চতুর্থ বছরে। কয়েক লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে এবং আরও বহুগুণ মানুষের জীবন তছনছ হয়ে গেছে।

লেখক : অনুবাদক ও লেখক

rezwanur1991@gmail.com