বাংলাদেশ একটি ক্রান্তিকাল পার করছে। এক রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থানের মুখে দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসকের পতন হয়েছে। দীর্ঘকালের সেই স্বৈরশাসনে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ছিল না। নানারকম নিপীড়নমূলক আইন করে গণমাধ্যমকে শায়েস্তা করা হতো। এমনকি সরকারি দলের ইন্ধনে বেশ কিছু সংবাদমাধ্যম বন্ধও করে দেওয়া হয়েছে। আবার অনেক গণমাধ্যম ও তাদের কর্মীরা সরকারের সঙ্গে আঁতাত করতেন বলেও অভিযোগ আছে। তারা নিজেদের হীনস্বার্থ চরিতার্থে লিপ্ত হতেন। ফলে দেশের গণমাধ্যমের ওপর জনগণের সন্দেহ ও আস্থাহীনতা দেখা দিয়েছে।
তথাপি স্বৈরাচারী সরকারের রক্তচক্ষু এড়িয়ে সংবাদমাধ্যমই জনতার পক্ষে কথা বলেছে। জুলাই আন্দোলনের সময় ইন্টারনেট বন্ধসহ নানা প্রক্রিয়ায় তথ্যপ্রবাহের পথ বন্ধ করার চেষ্টা করেছিল পতিত সরকার, কিন্তু জীবন বাজি রেখে সাংবাদিকরা নিজেদের দায়িত্ব পালন করেছেন। সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কয়েকজন সাংবাদিক মারা গেছেন, আহত হয়েছেন অনেকে। তাদের এ আত্মত্যাগ এবং দায়িত্বশীলতা জুলাই আন্দোলনের সাফল্যের অংশীদার। গণমাধ্যমের গুরুত্ব প্রমাণ করেছে।
তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। ঝুঁকিতে আছেন সাংবাদিকরা। বেশ কিছু সংবাদপত্রের বিরুদ্ধে নানারকম উসকানি দেওয়া হচ্ছে। ফলে সংবাদপত্রের কর্মীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। কারওয়ান বাজারে কার্যালয়ের সামনে প্রথম আলোবিরোধী বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘর্ষ হয়েছে। সরেজমিন দেখা গেছে, পত্রিকাটির কার্যালয়ের মূল ফটক বন্ধ রাখা; সামনে মোতায়েন আছেন পুলিশ ও সেনাসদস্য। কারওয়ান বাজারের মতো ব্যস্ত এলাকায় কিছুটা আতঙ্ক ও অস্থিরতা বিরাজ করছে। পত্রিকাটির রাজশাহী কার্যালয়ও ভাঙচুর করা হয়েছে। বিগত সরকারের পতনের পর থেকেই আমরা বেশ কিছু গণহামলা বা মব জাস্টিস দেখতে পাচ্ছি। মাজারগুলোর ওপর হামলা হয়েছে। পতিত সরকারের সহযোগীদের বাড়িঘর ও প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। আর এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন সভা-সমাবেশে উসকানি দেওয়া হচ্ছে গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের ওপর হামলার।
গণমাধ্যমসহ সব ধরনের প্রতিষ্ঠানে মব জাস্টিস কঠোর হাতে দমনের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সম্পাদক পরিষদ। মঙ্গলবার সংগঠনটির সভাপতি মাহফুজ আনাম ও সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এ আহ্বান জানানো হয়। বিবৃতিতে উদ্বেগ জানিয়ে বলা হয়, দেশের সংবাদমাধ্যমগুলোর স্বাধীনতার ওপর নানাভাবে আক্রমণ অব্যাহত রয়েছে। এরই মধ্যে দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক প্রথম আলো, ডেইলি স্টার কার্যালয়ের সামনে অবস্থান, হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেন। এখনো প্রতিষ্ঠানগুলো নিরাপত্তা হুমকিতে রয়েছে। সম্পাদক পরিষদ মনে করে, কোনো পত্রিকার পরিবেশিত কোনো সংবাদ বা সম্পাদকীয় নীতিমালা নিয়ে কারও কোনো ভিন্নমত থাকলে তিনি যেকোনো মাধ্যমে নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান ও বক্তব্য তুলে ধরতে পারেন। কিন্তু এভাবে বিশৃঙ্খলার চেষ্টা সংবাদমাধ্যমে সাংবাদিকতার চর্চা ও পরিবেশকে ব্যাহত করছে। একইরকম বিবৃতি দিয়েছে সংবাদপত্রের মালিকদের সংগঠন নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব)। এ ধরনের ঘটনার নিন্দা জানিয়ে নোয়াব গণমাধ্যমসহ সব ধরনের প্রতিষ্ঠানে মব জাস্টিস কঠোর হাতে দমন করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার পরিপন্থী কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানায় নোয়াব।
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা হচ্ছে গণতন্ত্রের মূলভিত্তি। আদতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার মাধ্যমেই রাষ্ট্র কিংবা সরকারের স্বৈরাচার হয়ে ওঠার প্রথম ধাপ। একে টিপে ধরলে রাষ্ট্র ও সমাজের সুরক্ষা হারিয়ে যায়। ফলে একে গণতন্ত্রের ওপর আঘাত বলেই ধরে নেওয়া হয়। তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম এসব হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘প্রথম আলো নিয়ে একটি উত্তেজনা দেখতে পাচ্ছি কয়েক দিন ধরে। গতকালও (রবিবার) এরকম উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল অফিসের সামনে। আজকে (গতকাল) রাজশাহীতে তাদের অফিসে ভাঙচুর হয়েছে এবং চট্টগ্রাম ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা পরে ঘটলে টলারেট (সহ্য) করা হবে না।’ তবে সরকারের তরফ থেকে এ আশ^াসই যথেষ্ট নয়। সরকারকে অতি অবশ্যই কার্যকরী উদ্যোগ নিতে হবে। গণমাধ্যম ও এর কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।