হজ নিবন্ধনের সময় বাড়াতে হবে

৩০ নভেম্বরের মধ্যে হজের জন্য চূড়ান্ত নিবন্ধনের সময়সীমা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু হজের নিবন্ধন আশানুরূপ হয়নি। এমতাবস্থায় হজ নিবন্ধনের সময় বাড়ানোর জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন দি সিটি ট্রাভেলসের ব্যবস্থাপনা অংশীদার হাফেজ মাওলানা নূর মোহাম্মদ। তার সঙ্গে কথা বলেছেন আতিকুর রহমান

চলতি বছর হজে যেতে গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয় হজের প্রাথমিক নিবন্ধন। হজ নিবন্ধনের সময় প্রায় শেষ হয়ে এলেও শতাধিক এজেন্সি থেকে একজনও নিবন্ধন করেননি বলে জানা গেছে। এমতাবস্থায় দি সিটি ট্রাভেলসের ব্যবস্থাপনা অংশীদার হাফেজ মাওলানা নূর মোহাম্মদ দেশ রূপান্তরের সঙ্গে আলাপকালে হজযাত্রীর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং সুষ্ঠু হজ ব্যবস্থাপনার স্বার্থে হজযাত্রী নিবন্ধনের সময়সীমা বৃদ্ধি করার জন্য অনুরোধ জানান।

এ সময় তিনি হজযাত্রী নিবন্ধনের দূরবস্থার উত্তরণ ঘটিয়ে ২০২৫ সালের হজ পালনকে সহজতর করার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি বেশ কিছু প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেন।

হাফেজ মাওলানা নূর মোহাম্মদ বলেন, ‘নির্দিষ্ট দুই-তিনটি এয়ারলাইন্সের মাধ্যমে হজযাত্রী পরিবহন বাধ্য করায় হজ প্যাকেজের মেয়াদ দীর্ঘ হয় এবং সৌদি আরবে থাকা-খাওয়ার খরচ বৃদ্ধি পায়। মাত্রাতিরিক্ত উড়োজাহাজ ভাড়ার কারণে সরকারি-বেসরকারিভাবে নির্ধারিত হজ প্যাকেজ মূল্য প্রতি বছরই বৃদ্ধি পায়। ফলে সাধারণ হজযাত্রীরা আর্থিক চাপের সম্মুখীন হচ্ছেন এবং অনেক হজ পালনেচ্ছুক ব্যক্তি হজে যাওয়ার সক্ষমতা হারাচ্ছেন। এ অবস্থা উত্তরণে হজযাত্রী পরিবহনে থার্ড ক্যারিয়ার চালু কিংবা হজযাত্রী পরিবহনে দেশি-বিদেশি এয়ারলাইন্সের অংশগ্রহণে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা যেতে পারে। বিশ্বের অনেক দেশে হজযাত্রী পরিবহন ও সেবা প্রদানে এমন প্রচলন বিদ্যমান রয়েছে। এর ফলে দেশীয় এয়ারলাইন্সের পাশাপাশি বহুজাতিক এয়ারলাইন্সগুলোর অংশগ্রহণমূলক প্রতিযোগিতাপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি হবে এবং হজযাত্রী পরিবহন ব্যয়ের তুলনামূলক মূল্য নির্ধারণ ও মানসম্পন্ন সেবা নিশ্চিত করা সহজতর হবে।’

বেসরকারি হজ এজেন্সির মালিকদের সংগঠন হজ এজেন্সিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব) প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘হাব একটি সংগঠন। আমাদের নির্দিষ্ট কিছু কাজ রয়েছে। এখন হজের প্রস্তুতিতে সময় ব্যয় করার কথা, কিন্তু সেটা ঠিকমতো করা যাচ্ছে না। এক ধরনের অস্থিরতা চলছে, এর প্রভাবে হজ নিবন্ধনে সাড়া মিলছে না। গত বছর ৪০ হাজারের বেশি হজকোটা ফাঁকা ছিল, এবার অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, হজকোটা ৪০ হাজারও পূরণ হবে না। এর ফলে এজেন্সির মালিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়।’

হাবের নির্বাচিত কমিটি বাতিল হওয়ায় আগামী বছরের হজ ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, ‘হাব একটি স্পর্শকাতর জায়গা। যেখানে ৯৫ শতাংশ হজযাত্রী বেসরকারি এজেন্সিগুলোর মাধ্যমে হজপালন করে থাকেন, হাব এই বিশাল সংখ্যক হজযাত্রীদের সমন্বয় করে থাকে, সেখানে বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে তাদের কে নিয়ন্ত্রণ করবে? কমিটি না থাকায় হজ এজেন্সিগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা দেখা দেবে। মন্ত্রণালয়কে এক-দেড় হাজার এজেন্সির পেছনে সময় ব্যয় করতে হবে। তাছাড়া হাবের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ এবং সৌদি আরবে যে সেবাগুলো হজযাত্রীদের দেওয়া হয়, সেখানে অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। এসব বিষয় দেখে ২০২৫ সালের হজে আমি বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা করছি।’

তিনি বলেন, ‘আমরা বহু আগে থেকেই দাবি করে আসছি, এজেন্সি প্রতি হজযাত্রীর কোটা নির্ধারণ করে দিতে। এর ফলে অধিক সংখ্যক এজেন্সি অপারেটিং সুবিধা পাবে এবং সেবার মান বৃদ্ধি ও অধিকতর সন্তোষজনক হবে। কিন্তু আমরা দেখছি, প্রায় শতাধিক এজেন্সি এবার কোনো হজযাত্রীর প্রি-রেজিস্ট্রেশনই করতে পারেনি। এভাবে চললে অনেকে এজেন্সির মালিককে পথে বসতে হবে।’

হজ এজেন্সির মালিকদের সেবা দেওয়ার পথ মসৃণ করতে তিনি বেশ কিছু প্রস্তাবনা তুলে ধরেন। এ সময় তিনি মোনাজ্জেমদের জন্য মাল্টিপল বিজনেস ভিসা ও গাইডদের জন্য বারকোর্ড ভিসার ব্যবস্থা করার কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘বাড়ি ভাড়া করার জন্য এজেন্সির মালিকদের একাধিক বার সৌদি আরবে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে। মাল্টিপল ভিসা না থাকলে এজেন্সির মালিকরা সময়মতো ও প্রয়োজনীয় মুহূর্তে সৌদি আরবে নির্বিঘ্নে প্রবেশ করতে না পারলে বাড়ি ভাড়া, মুয়াল্লিম নির্ধারণ, মিনা-আরাফায় হাজিদের তাঁবু বরাদ্দসহ নানাবিধ কাজে ব্যাঘাত ঘটে। ফলে ভিসা ইস্যু বিলম্বিত হয় এবং ফ্লাইট সিডিউলে বিপর্যয় দেখা দেয়।’ এসব কারণে মালিকদের জন্য মাল্টিপল ভিসার দাবি জানান তিনি।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের বয়োবৃদ্ধ হাজিদের জন্য প্রতি ৪৫ জনে একজন গাইড থাকার নিয়ম রয়েছে। গাইডদের বারকোড ভিসা সরবরাহ না করা হলে হজ ভিসায় যেতে বাধ্য করলে প্যাকেজ মূল্য বৃদ্ধি পাবে।’ তাই প্রত্যেক গাইডের জন্য বারকোড ভিসার দাবিও জানান তিনি।

সুষ্ঠু হজ ব্যবস্থাপনার স্বার্থে গ্রুপ লিডার প্রথা বন্ধ না করে একটা নিয়মের মধ্যে আনারও দাবি করেন তিনি। তার মতে, ‘তাদের একটা নিয়মের মধ্যে এনে হজ ব্যবস্থাপনাকে ঝুঁকিমুক্ত করা সময়ের দাবি।’ সেই সঙ্গে তিনি সাধারণ হজযাত্রীদের সুন্দর হজযাত্রা নিশ্চিত করতে সরাসরি এজেন্সির মালিকদের সঙ্গে চুক্তি ও এজেন্সির ব্যাংক একাউন্টে টাকা জমা দেওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ‘হজের কাজের অনেক ক্ষেত্রেই বাংলাদেশি এজেন্সির কোনো হাত থাকে না। এটা হাজিদের স্পষ্টভাবে বলে দিলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়।’

চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী বছরের ৫ জুন পবিত্র হজ অনুষ্ঠিত হবে। আগামী বছর বাংলাদেশ থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ জন হজ করতে পারবেন। এর মধ্যে ১০ হাজার সরকারি ব্যবস্থাপনায় এবং বাকিরা যাবেন বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় হজ এজেন্সিগুলোর মাধ্যমে।