রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বেড়েছে বলে মনে করছেন দেশের ৬০ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ। একইভাবে ৬১ দশমিক ২ শতাংশ মানুষের ধারণা, বর্তমান সময় সংবাদমাধ্যম আওয়ামী লীগ সরকারের চেয়ে বেশি স্বাধীনতা ভোগ করছে। গতকাল বুধবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানায় ভয়েস অব আমেরিকা বাংলা। গণমাধ্যমটি গত ১৩ থেকে ২৭ অক্টোবর দেশের আট বিভাগে ১৮ বছর বা তার চেয়ে বেশি বয়সী এক হাজার মানুষের মধ্যে একটি জরিপ পরিচালনা করে। তাদের হয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ করে গবেষণা ও জরিপ প্রতিষ্ঠান ওআরজি-কোয়েস্ট রিসার্চ লিমিটেড। সেই জরিপের তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে জরিপের ফল কয়েকটি পর্বে প্রকাশ করছে ভয়েস অব আমেরিকা বাংলা। গতকাল দ্বিতীয় পর্বে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রতিবেদনটি ছাড়াও পৃথক আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সংবাদমাধ্যমটি। ওই প্রতিবেদনে সংবাদমাধ্যমটি বলছে, বাংলাদেশের মধ্যে ৫৭ শতাংশ মানুষ আওয়ামী লীগকে রাজনীতি করতে দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। অন্যদিকে ৩৫ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার পক্ষে মত দিয়েছেন।
ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা বিভাগ বলছে, তাদের ঠিক করে দেওয়া সুনির্দিষ্ট প্রশ্নমালার ভিত্তিতে কম্পিউটারের সহায়তায় দেশের আটটি বিভাগে ১৮ বছর বা এর চেয়ে বেশি বয়সী এক হাজার মানুষের ওপর টেলিফোনভিত্তিক জরিপটি চালানো হয়।
জরিপটি করা হয়, র্যান্ডম ডিজিটাল ডায়ালিং পদ্ধতিতে। বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশনের সর্বশেষ প্রকাশিত অফিশিয়াল টেলিফোনে প্ল্যান থেকে বাংলাদেশের মোবাইল নম্বরগুলোর সম্ভাব্য সবধরনের কম্বিনেশন থেকে করা ওআরজি-কোয়েস্ট রিসার্চ লিমিটেডের নিজস্ব ডেটাবেজ থেকে জরিপটির স্যাম্পল নেওয়া হয়েছে। একটি আর-বেজড প্রোগ্রাম ব্যবহার করে সিম্পল র্যান্ডম স্যাম্পলিংয়ের (এসআরএস) মাধ্যমে জরিপটির নমুনা বাছাই করা হয়েছে। জরিপটির উত্তরদাতারা প্রায় এক মাস আগে তাদের মতামত জানিয়েছে বিধায় এখন জরিপটি করলে এর ফলাফল অনেক ক্ষেত্রেই ভিন্ন হতেও পারে বলে মনে করে ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা বিভাগ।
এর আগে গত শনিবার জরিপের প্রথম পর্ব প্রকাশ করা হয়, যেখানে দেখা যায়, ৬১ দশমিক ১ শতাংশ মানুষ মনে করেন আগামী এক বছরের মধ্যে পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়া উচিত।
গতকাল প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ভয়েস অব আমেরিকা বলছে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়ে ২৫ দশমিক ২ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের মতোই রয়েছে। ১৪ দশমিক ২ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কিছুটা কম। এ বিষয়ে শূন্য দশমিক ২ শতাংশ উত্তরদাতা কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
পুরুষদের মধ্যে ৬৪ দশমিক ৩ শতাংশ এবং নারীদের মধ্যে ৫৬ দশমিক ৫ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, বর্তমান সরকারের অধীনে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আগের চেয়ে বেশি।
আর তরুণদের (১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়সী) মধ্যে ৫৭ দশমিক ১ শতাংশ এবং ৩৫ বছরের বেশি বয়সী ৬৩ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের তুলনায় বেড়েছে।
এ ব্যাপারে গ্রামাঞ্চলে ৫৮ দশমিক ৪ শতাংশ এবং শহরাঞ্চলে ৬৬ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ একমত হয়েছেন যে, অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বেশি।
এদিকে জরিপে অংশগ্রহণকারী ৬১ দশমিক ২ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সংবাদমাধ্যমগুলো আওয়ামী লীগ আমলের চেয়ে বেশি স্বাধীনতা ভোগ করছে। তবে এই দুই আমলের মধ্যে সংবাদমাধ্যমগুলোর স্বাধীনতা ভোগের ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য দেখে না বলে জানিয়েছেন ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ।
একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আওয়ামী লীগ আমলের চেয়ে সংবাদমাধ্যমগুলো কম স্বাধীন বলে মনে করেন ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ। এ ছাড়া ৬ দশমিক ৮ শতাংশ উত্তরদাতা এ ব্যাপারে জানেন না ও শূন্য দশমিক ২ শতাংশ মানুষ এ বিষয়ে কথা বলতে চাননি।
অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আওয়ামী লীগ আমলের তুলনায় সংবাদমাধ্যম অপেক্ষাকৃত বেশি স্বাধীনতা পাচ্ছে বলে মনে করেন শহরের ৭৩ দশমিক ৮ শতাংশ উত্তরদাতা। আর গ্রামের উত্তরদাতাদের মধ্যে এমন মত পোষণ করেন ৫৭ দশমিক ১ শতাংশ।
তরুণদের (১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়সী) মধ্যে ৬৫ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ৩৫ বছর ও তার চেয়ে বেশি বয়সী উত্তরদাতাদের মধ্যে ৫৬ দশমিক ৫ শতাংশ মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের তুলনায় সংবাদমাধ্যম অপেক্ষাকৃত বেশি স্বাধীনতা ভোগ করছে।
আর পুরুষদের মধ্যে ৬৮ দশমিক ২ শতাংশ এবং নারীদের মধ্যে ৫৪ দশমিক ২ শতাংশ উত্তরদাতা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আগের আমলের চেয়ে সংবাদমাধ্যম বেশি স্বাধীনতা ভোগ করছে বলে মত দিয়েছেন।
এদিকে আওয়ামী লীগকে রাজনীতি করতে দেওয়ার বিষয়ে চালানো জরিপের ভিত্তিতে করা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ-সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তরদাতাদের মধ্যে ৪ দশমিক ৯ শতাংশ বলেছেন, তারা এ ব্যাপারে কিছু জানেন না। আর ২ দশমিক ৬ শতাংশ উত্তরদাতা প্রশ্নের উত্তর দিতে রাজি হননি।
জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে যারা আওয়ামী লীগকে রাজনীতি করতে দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন, তাদের মধ্যে পুরুষদের সংখ্যাই বেশি। জরিপে অংশগ্রহণকারী পুরুষদের ৬১ দশমিক ৮ শতাংশই মনে করে আওয়ামী লীগকে রাজনীতি করতে দেওয়া উচিত। নারী উত্তরদাতাদের মধ্যে এই হার ৫২ দশমিক ২ শতাংশ।
আওয়ামী লীগকে রাজনীতি করতে দেওয়ার পক্ষে মত দেওয়া উত্তরদাতাদের মধ্যে শহর ও গ্রামের বাসিন্দার সংখ্যা প্রায় সমান। শহরের ৫৬ দশমিক ৭ শতাংশ এবং গ্রামের ৫৭ দশমিক ১ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, তারা মনে করেন আওয়ামী লীগকে রাজনীতি করতে দেওয়া উচিত।
জরিপে অংশগ্রহণকারীদের বয়স বিবেচনায় নিলে দেখা যায়, আওয়ামী লীগকে রাজনীতি করতে দেওয়ার পক্ষে মত দেওয়া উত্তরদাতাদের মধ্যে ৩৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের সংখ্যাই বেশি। এই বয়সী উত্তরদাতাদের ৬০ দশমিক ৩ শতাংশই আওয়ামী লীগকে রাজনীতি করতে দেওয়ার পক্ষে। আর ১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়সী উত্তরদাতাদের মধ্যে এই হার ৫৩ দশমিক ৯ শতাংশ।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার পক্ষে যারা মত দিয়েছেন, তাদের মধ্যে তরুণদের সংখ্যাই বেশি। ১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়সী উত্তরদাতাদের ৩৯ দশমিক ৯ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা চান আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হোক। ৩৫ বছর বা তার বেশি বয়সী উত্তরদাতাদের মধ্যে এই হার ৩০ দশমিক ৮ শতাংশ।