সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র ও আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের (ইসকন) সাবেক নেতা চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীকে দিয়ে ভারত দেশে পরিকল্পিত দাঙ্গা লাগাতে চেয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মামুনুল হক। গতকাল শুক্রবার জুমার নামাজের পর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেইটে হেফাজতে ইসলাম ঢাকা মহানগর আয়োজিত বিক্ষোভ ও সমাবেশে এমন মন্তব্য করেন তিনি।
ইসকনকে নিষিদ্ধের দাবি ও চট্টগ্রামে আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ হত্যার প্রতিবাদে এই বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে সংগঠনটি। সমাবেশে ইসকনকে নিষিদ্ধের দাবি জানিয়ে বক্তব্য দেন মামুনুল হক। তিনি বলেন, দিনের পর দিন আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে ভারত ও আওয়ামী লীগ ইসকনকে তৈরি করেছে; চিন্ময় দাশ ভিনদেশি গুপ্তচর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিল।
বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগাতে একটি চক্র চক্রান্তে লিপ্ত হয়েছে উল্লেখ এই হেফাজত নেতা বলেন, ‘আমরা স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই। সুপরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগাতে একটি চক্র চক্রান্ত করছে। চট্টগ্রামে দিনেদুপুরে আদালত চত্বরে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা একজন দেশপ্রেমিক আইনজীবীকে টেনেহিঁচড়ে হত্যা করবে এমন দৃশ্য দেখতে বাংলাদেশ প্রস্তুত নয়। বাংলাদেশের মানুষের প্রতিটি হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে।’
চট্টগ্রামের আদালত পাড়ায় খুন হওয়া আইনজীবী সাইফুলের হত্যাকারীদের নেপথ্য ইন্ধনদাতাদের খুঁজে বের করার আহ্বান জানিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারকে বলতে চাই মানুষের ক্ষোভ বোঝার চেষ্টা করুন। সাইফুল হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাদের বিচার করলে হবে না। এই খুনিদের পেছনে যারা রয়েছে সেই খুনিদের খুঁজে বের করে মুখোশ উন্মোচন করতে হবে।’
সাইফুল হত্যার ঘটনায় ইসকনের মদদদাতা হিসেবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী হাসিনাকে আসামি করে মামলা করার দাবি জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘বিগত ১৬ বছর ধরে দেখেছি আমরা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে শুধু অসহযোগিতামূলক নয়, কূটনৈতিক শিষ্টাচার গর্হিত বিভিন্নভাবে ভারত নগ্ন হস্তক্ষেপ করছে। ভারত রাষ্ট্রের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। ভারতকে স্পষ্ট বার্তা দিতে চাই, বাংলাদেশের নীতি পরিবর্তন করো। না হলে তোমাদের বিরুদ্ধে ২০ কোটি মানুষ রাজপথে নামবে। এদেশের মানুষ কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে বাধ্য হবে।’
প্রশাসনের উদ্দেশ্যে মামুনুল হক বলেন, ‘চিন্ময় ভিনদেশি গুপ্তচর হিসেবে কাজ করছিল। সে তার প্রভুর দেশের নির্দেশনা নিয়ে এসে বাংলাদেশের শান্তি নষ্টের পাঁয়তারা চালানোর চেষ্টা করেছে। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস প্রভুর আশ্রয়ে থেকে ভারত ও আওয়ামী লীগের যৌথ প্রযোজনায় ইসকন তৈরি করা হয়েছে। এই ইসকন নিষিদ্ধ করে আওয়ামী লীগ ও ভারতকে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে বাংলাদেশ তোমাদের ষড়যন্ত্রের কাছে মাথানত করবে না। আমরা রক্ত দেব, জীবন দেব, লড়াই করব, বাংলাদেশের গৌরব রক্ষা করব।’
ইসকনের সাবেক নেতা চিন্ময় কৃষ্ণ দাশকে রিমান্ডে নিলেই সব ষড়যন্ত্র বেরিয়ে আসবে বলেও মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মামুনুল হক। তিনি বলেন, ভারত এবং আওয়ামী লীগের যৌথ প্রযোজনায় এই ইসকন তৈরি হয়েছে। ভারত থেকে প্রেসক্রিপশন নিয়ে এসে চিন্ময় উসকানি দিয়েছে। ভারত যদি এখনো বাংলাদেশের মানুষকে অসম্মান করার চেষ্টা করে, তাহলে সেটা মেনে নেওয়া হবে না। তারা মানুষ হত্যায় জড়িত হাসিনাকে প্রশ্রয় দিচ্ছে, আবার নিজেকে দাবি করে বাংলাদেশের বন্ধু! ইসকনকে নিষিদ্ধ করতে কেউ গড়িমসি করলে আরও কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবে হেফাজতে ইসলাম।
সমাবেশে বক্তব্যে ইসকন নিষিদ্ধের জোর দাবি তোলেন ইসলামি বক্তা আবু তোহা আদনান। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বিরুদ্ধে নই। কিন্তু ৯০ ভাগ মুসলমানদের দেশে একজন মুসলিম আইনজীবীকে দিনেদুপুরে জবাই করা হয় তখন আমরা চুপ থাকব না। বিনয়ের সঙ্গে বলতে চাই এই সন্ত্রাসী সংগঠনকে বাংলার মাটি থেকে বহিষ্কার করতে হবে। আর কতজন ভাইয়ের প্রাণ গেলে আপনারা জেগে উঠবেন। আমরা দাবি জানাই দ্রুত সময়ের মধ্যে এই সন্ত্রাসী সংগঠনকে নিষিদ্ধ করতে হবে।’
চট্টগ্রামের সমাবেশেও ইসকন নিষিদ্ধের দাবি : ইসকনকে নিষিদ্ধের দাবি এবং চট্টগ্রামে তরুণ আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফের হত্যার প্রতিবাদে চট্টগ্রাম নগরের ওয়াসা মোড়ে জমিয়াতুল ফালাহ জাতীয় মসজিদের সামনে ইসকনকে নিষিদ্ধের দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। এ সময় কয়েক হাজার মুসল্লি বিক্ষোভ করেন। সমাবেশ থেকে আগামী সোমবার সকাল ১১টায় চট্টগ্রামে অবস্থিত ভারতের ডেপুটি হাইকমিশনার অফিস অভিমুখে লংমার্চ করার ঘোষণা দেন সংগঠনটির যুগ্ম মহাসচিব মুফতি হারুন ইজহার।
বক্তব্যে হারুন ইজহার বলেন, ‘হিন্দুত্ববাদী বিভিন্ন সংগঠন দাবি করেছে আইনজীবী সাইফুল হত্যার সঙ্গে ইসকনের কোনো যোগাযোগ নেই। হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশসহ ইসলামপন্থি বিভিন্ন সংগঠন এবং তাদের নেতাদের সঙ্গে তারা বসতে চায়। আমরা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিতে চাই, এটা নতুন এক চক্রান্ত। শেখ হাসিনাকে বাংলার মাটি থেকে বিদায় করার পর এ দেশের ম্যাক্সিমাম হিন্দুত্ববাদী সংগঠন ভারতের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশে অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করছে।’
ভারতের সামনে দুটি পথ আছে উল্লেখ করে মুফতি হারুন ইজহার বলেন, ‘হিন্দুস্থানকে তার অতীতের অবস্থান পরিবর্তন করে আমাদের সঙ্গে ডায়ালগে বসতে হবে এবং আগামী দিনের সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। হিন্দুস্থান যদি তার ষড়যন্ত্র অব্যাহত রাখে, বিভিন্ন সংগঠন ও কুকুরকে লেলিয়ে দিয়ে বাংলাদেশে অরাজক পরিস্থিতি করতে চায়, তাহলে আমরাও হিন্দুস্থানের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও সামরিক আগ্রাসন অব্যাহত রাখব। বাংলাদেশে যে ষড়যন্ত্র হচ্ছে তার মাথা চিহ্নিত করতে হবে আপনাদের। ইতিমধ্যে হিন্দুস্থানের সঙ্গে ইসরায়েল যুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে ইসলামকে নিশ্চিহ্ন করতে ইসরায়েল ও ভারত যৌথ চক্রান্ত করে যাচ্ছে। আমাদের লড়াই সুদূরপ্রসারী। বাংলাদেশের কোনো হিন্দুর গায়ে আমাদের টোকাও পড়বে না।’
সমাবেশে হেফাজত নেতারা বলেন, দেশের পরাজিত শক্তি হিন্দুদের একটি অংশকে ব্যবহার করে বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য সৃষ্টির পাঁয়তারা চালাচ্ছে। এর অংশ হিসেবেই দেশকে অস্থিতিশীল করার অপতৎপরতা চালাচ্ছে ইসকন। মঙ্গলবার আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফকে যেভাবে কুপিয়ে ও জবাই করে হত্যা করেছে তাকে গৃহযুদ্ধ বাধানোর অপপ্রয়াস ছাড়া আর কী বলা যেতে পারে? একই সঙ্গে পতিত ফ্যাসিবাদী ও তাদের প্রভুদের পাতানো সাম্প্রদায়িক উসকানির ফাঁদে পা না দিয়ে দেশবাসীকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান হেফাজত ইসলামের নেতারা।