নানান বদনাম-দুর্নাম, সমালোচনার মধ্যেও পুলিশকে শুদ্ধ করার মহাসুযোগটি দ্রুত চলে যাচ্ছে। যত দেরি তত গোল্ডেন চান্স বরবাদের শঙ্কা। পুলিশের ভেতর একটি গ্রুপ চায় যা হওয়ার হয়ে গেছে, ছাড় দিয়ে হলেও এখন পেশাদার হতে, মান-ইজ্জত ফিরে পেতে। অপেশাদারদের কথা আলাদা। কিছু পুলিশ কর্মকর্তার ব্যক্তিগত লোভ, দলকানা কর্মকাণ্ড ও ইউনিফর্ম গায়ে জড়িয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর কারণে মানুষের মধ্যে সঞ্চিত ক্ষোভ কোনো মন্ত্রে হুট করে চলে যাবে তা আশা করলে চরম আশাহতের বেদনায় পড়তে হবে। পরিস্থিতি এমন হয়েছিল যে, ‘পুলিশ জনগণের বন্ধু’ বিশেষায়িত এ বাক্য শুনলে মানুষ হাসত। সাধারণ মানুষের অনেকে পুলিশকে আর বন্ধু ভাবতে পারেন না। বাস্তব নানান ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই এ অনুভূতি। মানুষের সেই জেদ-ঘৃণার শিকার হয়েছে গোটা পুলিশ বাহিনী। নিরপরাধ, পেশাদার ও সাধারণ পুলিশ সদস্যরা এতে ব্যথিত-ভারাক্রান্ত। সময় খারাপ দেখে তাদের চিহ্নিত বসদের অনেকে ভেগেছেন। সেই গোষ্ঠীর বেশ কয়েকজন পাকড়াও হয়েছেন। বিপদে পড়ে গেছেন অসহায় ও নিরপরাধ পুলিশ সদস্যরা। তারা চান পুলিশের এমন পরিণতির জন্য দায়ীদের কঠোর এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি।
কেউ পুলিশকে শত অপছন্দ করলেও আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নে পুলিশ লাগবেই। সেনা-নৌ-বিমান তিনটি বাহিনী দিয়েও পুলিশের কাজ সারানো যাবে না। পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে এরই মধ্যে দাগি অপরাধীসহ দুষ্টচক্র নানান জায়গায় যা করছে, তা পুলিশের অপরিহার্যতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে। সংস্কারের আওতায় পুলিশকে যদ্দুর সম্ভব সাফ করার একটি প্রক্রিয়া চলছে। জনবান্ধব ও দক্ষ বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে পুলিশ বাহিনীর মধ্যে কাঠামোগত ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন আনার চিন্তা-চেষ্টাও হচ্ছে। সরকার, আইন বিভাগ ও বিচার বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে উহ্য রেখে এ চেষ্টা সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম। তাদের বাদ রেখে পুলিশ সংস্কার সম্ভব নয়। স্বাধীনতার ৫৩ বছরেও পুলিশ কেন জনবান্ধব বাহিনী হতে পারেনি এ ভাবনার অংশীজন কেবল পুলিশ নয়। পুলিশ সংস্কার কমিশন গত ২ মাস ধরে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করছে। জনগণ কেমন পুলিশ চায় সে বিষয়ে জনগণের মতামত নিচ্ছে তারা। দেশের সংবিধানে ও আইনে পুলিশকে বলা আছে পুলিশ ডিসিপ্লিন ফোর্স, ল’ ইনফোর্সমেন্ট এজেন্সি ও সিভিল ফোর্স নামে। প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে পুলিশ সিভিল ফোর্স না ল’ ইনফোর্সমেন্ট এজেন্সি? নাকি ডিসিপ্লিন ফোর্স? এই তিনটির কার্যক্রম একেক ধরনের। আবার নিয়োগ ও পদোন্নতিতেও ভিন্নতা রয়েছে। সামগ্রিক এ বিষয়গুলোকে আমলে নিতেই হবে।
জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন পর্যন্ত বাংলাদেশের পুলিশ নিয়ে ভাবছে। সেই লক্ষ্যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঘিরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা তদন্তের জন্য পুলিশ সদর দপ্তরের কাছে একগুচ্ছ তথ্য চেয়েছে। গণ-অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত ৪৬ দিনে কী ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে, পুলিশ এতে কীভাবে কতটুকু সম্পৃক্ত তা জানার চেষ্টা করছে জাতিসংঘ। এর বিস্তারিত তথ্য জানবে তারা। গণ-অভ্যুত্থান ও পরবর্তী সময় মিলিয়ে দেড় মাসে সারা দেশে কতজন মারা গেছেন, তাদের পেশাগত পরিচয় কী, কতজন আহত হয়েছেন, কতটি মামলা হয়েছে, কতজন গ্রেপ্তার হয়েছে, তা জানতে চায় ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন। এ ছাড়া ছাত্র-জনতার আন্দোলনে পুলিশ মোট কত রাউন্ড গুলি করেছে, আন্দোলনকালে কোন কোন কর্মকর্তা মাঠ পুলিশকে গুলির নির্দেশ দিয়েছেন, পুলিশের গুলিতে কতজন মারা গেছেন, কোন কোন এলাকায় সবচেয়ে বেশি সহিংসতা হয়েছে, কী ধরনের সহিংসতা হয়েছে এ ধরনের আরও নানা তথ্য জানতে চেয়েছে জাতিসংঘ মিশন। এদিকে পুলিশের অভ্যন্তরেও সংস্কার নিয়ে কাজ হচ্ছে। ৫ আগস্টের পর অভ্যন্তরীণ আটটি পৃথক সংস্কার কমিটি গঠন করেছে পুলিশ। বাহিনীর কার্যক্রমে সংস্কার প্রস্তাবের জন্য এরই মধ্যে তারা একাধিক বৈঠক করেছেন।
সংস্কার প্রশ্নে সামগ্রিকভাবে এটি ভালো লক্ষণ। বাংলাদেশ পুলিশ পরিচালিত হয় ১৮৬১ সালের পুলিশ আইনের মাধ্যমে, যা ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিপ্লবের পরিপ্রেক্ষিতে প্রণয়ন করা হয়েছিল। এ ছাড়া ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮; সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২; পুলিশ প্রবিধানমালা বেঙ্গল, ১৯৮৩; পুলিশ রেগুলেশন অব বেঙ্গল (পিআরবি) ১৯৮৩ এবং অন্যান্য আইনের মাধ্যমে পুলিশ বাহিনী দায়িত্ব পালন করে থাকে। খেয়াল করার মতো বিষয় হচ্ছে, প্রতিটি আইনই ব্রিটিশ আমলের, যা ঔপনিবেশিক শাসনের স্বার্থ রক্ষাকে প্রাধান্য দিয়ে তৈরি করা। তা যদি নাও হতো, এক-দেড়শ বছরের পুরনো আইন কখনোই এই সময়ের জন্য কার্যকরভাবে প্রযোজ্য হতো না। বহুদিন ধরে এসব আইন আধুনিকায়ন ও পরিমার্জন করার আলোচনা হলেও কোনো সরকারই তার বাস্তব রূপ দেয়নি। বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনী বিষয়ে সাধারণ মানুষের প্রধান দুটি সমালোচনার একটি হলো সরকারি দলের ক্ষমতার হাতিয়ার হিসেবে পুলিশ বাহিনীর কাজ করা ও জনবিমুখ একটি ভাবমূর্তির মধ্য থেকে জনগণের জন্য কাজ করার অকার্যকর চেষ্টা করা। বিপদে পড়লে একজন সাধারণ মানুষ প্রথমেই পুলিশ বাহিনীর সাহায্য চাওয়া বা থানায় যাওয়ার কথা ভাবতে ভয় পায়, বিশেষ করে তাদের অভিযোগ যদি অপেক্ষাকৃত বিত্তবান বা রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাবান কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে হয়।
এবারের ছাত্র আন্দোলনের পর ভালো পুলিশ পাওয়ার এটা একটা সুযোগ। মহাসুযোগও বলা যায়। শেষ সুযোগও বলতে চান কেউ কেউ। কারণ এমন সুযোগ বারবার আসে না। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয় রয়েছে। পলিটিক্যাল ভিশন না থাকলে সংস্কার কার্যকর হবে না তা মুখস্থ বলা যায়। যে যত কথাই বলুক রাজনীতিকরা দেশে সামাজিকভাবে পরাক্রমশালী। যে কোনো বিভাজিত সমাজে পুলিশিং কঠিন বিষয়। পুলিশ পাবলিক সার্ভেন্ট থেকে ডমিস্টিক সার্ভেন্ট হয়ে গেছে। এর একটা সীমানা টানার সময় এসেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের ‘পুলিশ সংস্কার কমিশন’ গঠনের উদ্দেশ্যও তাই। এটি রাজনৈতিক দলমুক্ত সরকার। নিশ্চয়ই এ সরকার জনমুখী, জবাবদিহিমূলক, দক্ষ ও নিরপেক্ষ পুলিশ বাহিনী চায়। অন্যান্য কমিশনের মতো তিন মাসের মধ্যে এই কমিশনকেও সম্ভাব্য সংস্কারের সুপারিশমালা রিপোর্ট আকারে দিতে বলা হয়েছে। জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানে পুলিশ বাহিনীর জনবিরোধী অবস্থান নেওয়ার কারণে সাধারণ মানুষের মনে অনেক দিনের জমে থাকা ক্ষোভ উপচে পড়েছে ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে। সরকার পতনের পর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার থানা, ফাঁড়িসহ পুলিশের ২২৪টি স্থাপনা জ্বালিয়ে দেওয়া হয়, ভাঙচুর করা হয়। বেশ কিছু থানায় এখনো পরিপূর্ণভাবে কাজে ফেরেনি অনেক পুলিশ। গত ২৫ অক্টোবর পুলিশ সদর দপ্তর জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানে নিহত ৪৪ জন পুলিশ সদস্যের তালিকা প্রকাশ করেছে। এসব ধারাবাহিকতায় নতুন প্রেক্ষাপটে কীভাবে পুলিশ বাহিনীর কার্য পরিচালনা আধুনিক ও জনবান্ধব করা যায়, তা নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা হচ্ছে। এর ইতিবাচক দিক হচ্ছে, সাধারণ জনগণ এই বিষয়ে তাদের অভিমত ও আকাক্সক্ষা প্রকাশ করতে পারছে, যা সহিংসতা-পরবর্তী সময়ে পুলিশের প্রতি তাদের ক্ষোভ ও অসন্তোষ কমাতে সাহায্য করবে। পুলিশ বাহিনীর সংস্কারেও তা কাজে দেবে।
সরকারি দলের প্রভাব থেকে পুলিশ বাহিনীকে মুক্ত করতে হলে, প্রাথমিকভাবে পুলিশের জন্য ভিন্ন একটা বিশেষ কমিশন গঠনের চিন্তাভাবনা চলছে বলে জানা গেছে। কমিশনকে অবশ্যই রাজনৈতিক ও দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখতে এর একটি শক্তিশালী কাঠামো গঠনের প্রয়োজন, যেন চাইলেই সরকার এর কোনো মন্ত্রণালয়ের কাজে হস্তক্ষেপ করতে না পারে। ফলে পুলিশকে সংস্কার করতে হলে শুধু পোশাক আর মনোগ্রাম পাল্টালে চলবে না, একই সঙ্গে নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি ও চাকরিচ্যুতির মতো বিষয়গুলোকে বিরাজনীতিকরণ করতে হবে, আর এটাই হবে প্রস্তাবিত পুলিশ কমিশনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কেননা পুলিশ বাহিনীর ওপর সরকারি দলের প্রভাব এমনি এক অপসংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে, যা দীর্ঘ মেয়াদে পরিবর্তন করতে হবে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে পুলিশে নিয়োগ হয়েছে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার। এই সময়ে বরাদ্দ বেড়েছে ৪৩৩ শতাংশ। কিন্তু পুলিশকে পেশাদার বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার কার্যকর কোনো উদ্যোগ ছিল না; বরং পুলিশ বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
আওয়ামী লীগের অতিরিক্ত পুলিশ নির্ভরতায় বাহিনীটির প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দেড় মাসেও পুলিশ কার্যকর ভূমিকায় যেতে পারছে না। পুলিশ সদস্যদের আচরণবিধির মানোন্নয়ন জরুরি। জনবান্ধব বাহিনী হওয়ার জন্য যাবতীয় বেআইনি কাজের জন্য পুলিশ বাহিনীর জবাবদিহি নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পৃথক কমিশন গঠনের মাধ্যমে এই ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে সময় লাগলেও দীর্ঘ মেয়াদে তা পুলিশ ও জনগণের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক গড়তে সহায়ক হবে। এসব দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের পাশাপাশি এই মুহূর্তে স্বল্পমেয়াদি কিছু পদক্ষেপ নেওয়াও প্রয়োজন। সাধারণ মানুষ, মিডিয়া, বুদ্ধিজীবী মহল, রাষ্ট্র সবাই আমরা একটি আধুনিক পুলিশ বাহিনী চাই। কিন্তু পুলিশের মনের যত্ন না নিয়ে একটি ‘আধুনিক পুলিশ বাহিনী’ নির্মাণ করা আদৌ সম্ভব কি না, তা-ও ভেবে দেখা দরকার।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট
mostofa71@gmail.com