সড়কে বিষাদের ছায়া

আপডেট : ০১ জুলাই ২০২৬, ১২:০৬ এএম

বিভিন্ন উৎসবে নাড়ির টানে মানুষ গ্রামে যায়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে যাত্রাপথের আনন্দ, বিষাদে পরিণত হয়। সড়ক দুর্ঘটনায় নেমে আসে শোক ও দুর্ভোগ। দায়িত্বহীনতা, অসাবধানতা আর অসচেতনতায় ঝরে শত প্রাণ। অস্থির উন্মাদনায় বিবেক আর বোধশক্তি বিলীন। উৎসবে কোটি মানুষের চলাচলের পথে রয়েছে- সড়ক, পরিবহন, চালক ও মালিক। গাড়ির নিয়ন্ত্রণহীন গতি, অতি মুনাফা বা আয়ের অন্তহীন আকাক্সক্ষা এবং চালক-যাত্রী উভয়ের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। কোন রাস্তায় একটি গাড়ির গতিবেগ কত হতে হবে কিংবা চালক একটানা কত সময় গাড়ি চালাবেন, সে ধারণা খুব কম। গতির সর্বোচ্চ ক্ষমতা কিংবা গতি কতটুকু নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব, সে বিষয়ে বাস্তবসম্মত শিক্ষার অভাব রয়েছে।

উৎসবের সময় স্বাভাবিকভাবেই ঘরে ফেরা মানুষের চাপ বাড়ে। আর অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহনের চাপ থেকে অতিরিক্ত মুনাফা কিংবা অধিক আয় বৃদ্ধির অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলে। প্রতিযোগিতায় চালককে, মালিকের প্রত্যাশা পূরণে মাত্রাতিরিক্ত ট্রিপ দিয়ে গাড়ি চালাতে হয়। তার চাকরির নিশ্চয়তা ও মালিকের অধিক মুনাফা যেন একসূত্রে গাঁথা। অতিরিক্ত মুনাফার জন্য অতিরিক্ত ট্রিপ; আর তা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত গতি। ট্রিপের ক্লান্তি দূর করতে অনেক সময় চালকের আসনে বসছে হেলপার। এই গতি হয়তো অতিরিক্ত মুনাফা আনছে, তবে জীবনের উচ্চমূল্য পরিশোধের বিনিময়ে। এভাবে গণপরিবহনে অব্যবস্থাপনার জটিল চক্র চলছে। যেখানে যুক্ত হয় ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং লাইসেন্সবিহীন চালক। পরিবহন যেন টাকার মেশিন, আর চালক হচ্ছেন চাবি। ফিটনেসবিহীন গাড়ি বা চালকের ট্রিপ দেওয়ার সক্ষমতা আছে কি-না, তা মালিক-চালকের বিবেচ্য নয়। নির্দিষ্ট সময়ে গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষা কিংবা নির্দিষ্ট গাড়ির জন্য নির্দিষ্ট প্রশিক্ষিত ড্রাইভার নিয়োজিত থাকার মতো সংস্কৃতি দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অধিক মুনাফালোভী মনোবৃত্তি থেকে সৃষ্টি হয় অসুস্থ প্রতিযোগিতা আর অব্যবস্থাপনা। কোন পরিবহন কত বেশি ট্রিপ দিল তার প্রতিযোগিতা চলতে থাকে। কিন্তু সেই পরিবহন বা চালকের অধিক ট্রিপ দেওয়ার সক্ষমতা আছে কি-না, তা নিয়ে ভাবার ফুরসত নেই। রাস্তায় যে পরিমাণ যাত্রীর চাপ, সেই বাস্তবতায় প্রতিটি গাড়ি থামিয়ে লাইসেন্স আর ফিটনেস পরীক্ষা করা এক আকাশকুসুম ভাবনা। চালক-যাত্রীরা গাড়ি চালানো কিংবা রাস্তা পারাপারের সময় দিব্যি মোবাইলে কথা বলেন। এতে রাস্তা হয় মরণফাঁদ। এ ছাড়া সড়কে অবৈধ যানবাহন চলাচল, চালকের অজ্ঞতা-অদক্ষতা, রাস্তার সংকীর্ণতা, অতিরিক্ত গতি, অহেতুক পাল্লায় গাড়ি চালানো, অতিরিক্ত যাত্রী ও পণ্য পরিবহন, সড়কের ওপর অবৈধ হাটবাজার, ফুটপাতের অবৈধ দখল এবং জনসাধারণের অসচেতনতা ও অসাবধানতার কারণে প্রতিদিন শত শত প্রাণ ঝরে যাচ্ছে।

ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত, গাড়ি আর রাস্তায় কাটে চালক ও হেলপারের জীবন। জীবন যেন আমৃত্যু ছুটে চলে, যেখানে সামাজিকতার ছোঁয়া নেই। ব্যস্ত জীবনের পরিসরে নির্মল আনন্দ, স্বপ্ন নেই। আছে নিত্যদিনের চাহিদা আর বেঁচে থাকার যুদ্ধ। কর্মব্যস্ততা, শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি, পারিবারিক সময়ের অভাব এবং সামাজিক মূল্যায়ন সংকটের কারণে কিছু চালক জড়াচ্ছেন মাদকের জালে। ফলে অবহেলা আর অবজ্ঞার কারণে চালকদের মধ্যে পেশাদারিত্বের মনোভাব তৈরি হচ্ছে না। মুনাফা মূল কথা নয়, জীবনের নিরাপত্তা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। বিষয়টি সবাইকে উপলব্ধি করতে হবে। সড়কে প্রাণরক্ষা শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে নিশ্চিত করা যাবে না। মালিক, চালক ও যাত্রীদের সচেতন ও দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে তা নিশ্চিত করতে হবে। চালককে পরিবহনের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ, রাস্তা এবং গতি সমন্বয়ের যোগ্যতা ও মানসিক স্থিরতাসম্পন্ন সুস্থ মানুষ হতে হবে। তাদের সম্মান ও মর্যাদার জায়গাটি অনুধাবন করাতে হবে এবং সামাজিক জীবনের সঙ্গে সংযোগ ঘটাতে হবে।  গাড়ির গতিবেগ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি একজন ড্রাইভার সপ্তাহে কিংবা দৈনিক কত ঘণ্টা গাড়ি চালাবেন, তা নির্ধারণ করা উচিত। প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে দেশে বায়োমেট্রিক মাধ্যমে স্মার্ট সিস্টেমে একটি কেন্দ্রীয় সফটওয়্যার থাকা জরুরি। যার অধীনে সব চালক সংযুক্ত থাকবেন। চালক তার ডিউটি শুরুর আগে আঙুল স্ক্যান করবেন এবং ডিউটি শেষ করার সময় আবার স্ক্যান করবেন। স্ক্যান না করলে, ওই গাড়ি কেন্দ্রীয় ইউনিটে স্বয়ংক্রিয় সংকেত পাঠাবে। চালকের পাশাপাশি মালিককেও দায়িত্বশীল ও মানবিক হতে হবে। চালক যেমন ফিটনেসবিহীন গাড়ি চালাবেন না, তেমনি মালিক লাইসেন্সবিহীন চালকের হাতে তার সম্পদ হস্তান্তর করবেন না। প্রত্যেক চালককে নিয়োগপত্রের মাধ্যমে চাকরির নিশ্চয়তা দিতে হবে। যাত্রীদের চালকের প্রতি আচরণে পরিবর্তন আনতে হবে। তাছাড়া চালকদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে ড্রাইভার ও হেলপারদের উন্নত প্রশিক্ষণ, আলাদা পোশাক এবং কর্মজীবন শেষে মাসিক ভাতা প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া যায়। নির্দিষ্ট স্টপেজ থেকে গাড়িতে ওঠা এবং নির্দিষ্ট স্টপেজে নামার অভ্যাস গড়তে হবে। দুর্ঘটনাকবলিত একটি পরিবার কী ধরনের প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়, তা চালকদের সামনে তুলে ধরতে হবে। ‘১০ মিনিট আগে পৌঁছানোর চেয়ে, ১০ বছর বেশি বাঁচা গুরুত্বপূর্ণ’ তা বোঝার মতো মানসিক সুস্থতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি দরকার রাস্তার সুস্থতা।

সড়ক-মহাসড়ক ও এক্সপ্রেসওয়েগুলোতে, নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে অবাধে চলছে ধীরগতির যানবাহন। যাদের না আছে রুট পারমিট, না আছে লাইসেন্স। এসব যানবাহনের মহাসড়কে প্রবেশাধিকার জরুরি ভিত্তিতে বন্ধ করতে হবে। চলন্ত অবস্থায় মোবাইল ফোনের ব্যবহার বন্ধে লাইসেন্স এবং রুট পারমিট বাতিলের মতো কঠোর অবস্থান নেওয়া দরকার। সর্বোপরি মালিক, চালক ও যাত্রী সবাইকে আইন, নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতার বন্ধনে আবদ্ধ করতে হবে। তখন থামবে যাত্রাপথের কান্না এবং নিশ্চিত, নিরাপদ যাত্রা।

লেখক : জেলা প্রশাসক, চট্টগ্রাম

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত