সামাজিক মালিকানার নতুন ব্যবস্থা চাই

আপডেট : ০১ জুলাই ২০২৬, ১২:১০ এএম

সমুদ্রবন্দরের মতো আমাদের প্রধান বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের ব্যবস্থাপনাতেও বিদেশিদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। ঢাকার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নাম পরিবর্তন করা আবশ্যক ছিল এমন কথা কোনো যুক্তিবাদী মানুষই বলবেন না, কিন্তু বিমানবন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির অত্যাবশ্যকতার বিষয়ে কারোই দ্বিমত নেই। সে কাজটা করাও হয়েছে। এ ব্যাপারে জাপানিদের সহায়তা পাওয়া গেছে। সহায়তা মানে কিন্তু দান-অনুদান নয়, শর্তাধীন ঋণ বটে। সেই ঋণের অর্থ শোধ করার কঠিন কাজও শুরু হয়েছে। কিন্তু যেটা শঙ্কার বিষয় সেটা হলো বিমানবন্দরের নতুন টার্মিনাল থেকে যে রাজস্ব আদায় হবে তার শতকরা ৭৩ ভাগ চলে যাবে জাপানে, অবশিষ্ট ২৩ ভাগ থাকবে বাংলাদেশে। রাজস্ব আদায়ের খাতগুলো হলো এমবারকেশন ফি, দোকানপাট ও লাউঞ্জ ভাড়া, কার্গো হ্যান্ডলিং চার্জ এবং কার-পার্কিং ভাড়া। প্রধান সামুদ্রিক বন্দরে বিদেশি ব্যবস্থাপনা, প্রধান বিমানবন্দরের রাজস্ব বিদেশিদের পকেটে অসম বাণিজ্যচুক্তির সঙ্গে মিলিয়ে পাঠ করলে এসব সংবাদে আহ্লাদিত হওয়ার কোনো কারণ থাকে না।

আকাশ এবং পানি দুইয়ের সঙ্গেই যোগ আছে পাখিদের। পাখিরা আকাশে ওড়ে, পানি না পেলে বাঁচে না। আমরা নদীমাতৃক এবং সমুদ্রপ্রাপ্তিক একটি দেশ। কিন্তু খাবার পানিও এখন আমাদের কিনতে হয়, নদীর পানি দূষিত আর সমুদ্রের পানি অবহেলিত। সমুদ্রের পানির উচ্চতা বাড়ছে, তাতে যে বিপদটা ঘটবে সেটা সহ্য করা মোটেই সহজ হবে না। ওদিকে সমুদ্রের নিচে যে বিপুল পরিমাণ সম্পদ জমা আছে তা আহরণের ব্যাপারে রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের যে ঔদাসীন্য সেটা কেবল যে নিন্দনীয় তা নয়, অপরাধতুল্যও বটে। দেশে মানুষের যেমন অধিকার, অধিকার তেমনি পাখিরও। মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু পাখির সংখ্যা কমছে। হ্রাস-বৃদ্ধির বেলাতে আরও অনেক বৈষম্যের মতোই এটিও উদ্বেগজনক বৈকি। দেশের পাঁচটি বড় শহর নিয়ে গবেষণায় দেখা গেছে পাখির প্রজনন-ক্ষমতা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে এবং পাখির বৈচিত্র্য নাকি শতকরা ২৫ ভাগ ইতিমধ্যেই হারিয়ে গেছে। কারণ হচ্ছে বায়ুদূষণ এবং খাদ্যের, বিশেষভাবে পানির অভাব।

কাকপক্ষী শব্দযুগল আমাদের খুবই পরিচিত। কাককে যে পাখির সঙ্গে যুক্ত করে রাখা হয়েছে তার ঐতিহ্যগত কারণটা হয়তো কাকের প্রাচুর্য। কাক যত্রতত্র পাওয়া যেত, তাদের উপস্থিতি এবং ডাকাডাকি অনেক সময় মানুষের জন্য বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়াত। তবে বর্জ্য পরিষ্কারে কাকদের যে ক্ষমতা ও কর্মসংযুক্তি সেটা বেতনভুক পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের জন্য লজ্জার কারণ না হলেও নগরবাসীর জন্য সুখের খবর ছিল বৈকি। বহুদিন আগে ঢাকা শহরে স্বল্পকালীন অবস্থান শেষে সাম্প্রদায়িকতাস্পর্শিত বিখ্যাত এক ঔপন্যাসিক মন্তব্য করেছিলেন যে, এই শহরে মুসলমান, কাক ও উকিলদের উপস্থিতি বিশেষভাবে লক্ষণীয় এবং ওই তিন প্রাণীর মধ্যে এই সামঞ্জস্যও তার গোচরীভূত হয়ে যে, তারা সবাই আওয়াজপ্রিয়। পুনরুজ্জীবন লাভ করলে তিনি দেখতে পেতেন যে, সেই কাকেরা এখন ঢাকা শহরে বিরল পাখিতে পরিণত হয়েছে। তাদের দেখা পাওয়া যে ভার নগরবাসী সেটা টের পান; আওয়াজ যে বিরক্ত করবে সে ঘটনাও তাই স্বভাবতই কমে গেছে। এটাকে কিন্তু মোটেই সুসংবাদ বলা যাবে না; যেমন বলা যাবে না অন্য একটি প্রাণীর বৃদ্ধিকে, সেটা ইঁদুর।

পূর্ববর্তী সরকারগুলোর মতো এই সরকারও সংস্কার ঘটাবেন শিক্ষার যে মূলধারা সেখানেই, অর্থাৎ বাংলা মাধ্যমে শিক্ষার ক্ষেত্রেই। ইংরেজি মাধ্যম এবং মাদ্রাসা শিক্ষার সংস্কারের ব্যাপারে আগের সংস্কারকরা যেমন মাথা ঘামাননি, বর্তমান সরকার যে তেমনি উদাসীনই থাকবে সেটা নিশ্চিত। তাদের সংস্কার উদ্যোগে মূলধারার শিক্ষার পক্ষে আগে যেমন উদ্বেগের কারণ ঘটেছে এবারও হয়তো তার ব্যতিক্রম ঘটবে না। আমাদের অর্থাৎ সাধারণ মানুষের কিন্তু ধারণা সংস্কারের চেষ্টা স্থগিত রেখে সরকার যদি দুটি ক্ষেত্রে মনোযোগ দেয় তাহলে দেশবাসী বড়ই উপকৃত হবে এবং কৃতজ্ঞ থাকবে। একটি হচ্ছে উপযুক্ত শিক্ষক সংগ্রহ ও শিক্ষক-প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা; অপরটি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলের সংখ্যা বৃদ্ধি। এই দুটি ক্ষেত্রে উন্নয়ন বাদ দিয়ে শিক্ষার উন্নয়ন ঘটানোর চেষ্টা অকার্যকর তো হবেই, ক্ষেত্রবিশেষে ক্ষতিকর বলেও প্রমাণিত হতে পারে।

আমরা ভুক্তভোগী, মেঘ ডাকলেই বজ্রপাতের শঙ্কায় থাকি। একটি সংবাদের দিকে সংস্কারকামীদের দৃষ্টি নিক্ষেপ আবশ্যক। খবরটি এই রকমের : দক্ষিণ এশিয়ায় মাধ্যমিক শিক্ষা-স্তরে ন্যূনতম দক্ষতাসম্পন্ন শিক্ষকের হারে বাংলাদেশের অবস্থান সবার শেষে। ওই যে দুই মহামারী জুয়া এবং ধর্ষণ তাদের খবরের শেষ নেই। জুয়াকে অবশ্য কোনো অপরাধ বলেই গণ্য হয় না। ধর্ষণ এখনো অপরাধ, তাই খবর। ১০ জুনের খবর চট্টগ্রামের একটি গ্রামে ৮-১০ জনের সশস্ত্র ডাকাত দল রাত্রিবেলায় একটি বাড়ির জানালা ভেঙে ভেতরে ঢুকে স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ টাকা লুণ্ঠন করে। বাড়ির কর্তা চট্টগ্রামে গেছেন, ব্যবসায়িক প্রয়োজনে; বাড়িতে তার স্ত্রী ও কিশোরী মেয়েটি ছিল, ঘুমিয়ে। ডাকাতরা ডাকাতি করে সন্তুষ্ট হয়নি, দলবদ্ধভাবে মা ও মেয়েকে ধর্ষণও করেছে। দেশে নানা ধরনের ডাকাতি চালু আছে, ধর্ষণও চলছে, আবার দেখা গেল দুটি একসঙ্গেই ঘটেছে। ঘটনার সেই পুরনো খবর; ভুক্তভোগীরা হাসপাতালে। ডাকাতদের ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, বাকিদের খোঁজা হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্নটা তো রয়ে যায়, প্রতিকার কী?

প্রতিরোধ করা চাই। হ্যাঁ, সেটা চাই। তবে ব্যক্তিগত প্রতিরোধে কাজ হবে না। সেটা বিপজ্জনকও হতে পারে। যেমন ওই দিনেরই আরেক খবর। যশোরের মনিরামপুরে নাতনিকে উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করায় নানাকে কুপিয়ে হত্যা। অপরাধীদের গণপিটুনি দেওয়া চলছে। কিন্তু কত ক্ষেত্রে সেটা সম্ভব? অপরাধ তো সর্বত্র বিস্তৃত। আর গণপদক্ষেপেও বিপদ ঘটতে পারে। ১০ জুনেই এসেছে খবর সব সংবাদপত্রে যে এক কিশোরীকে ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে অভিযুক্ত এক ব্যক্তির বাড়িতে ক্ষিপ্ত জনতা অগ্নিসংযোগ করতে গেলে কয়েজকন অগ্নিদগ্ধ হন এবং দগ্ধ হওয়ার কারণে তাদের মধ্যে তিনজন প্রাণ হারিয়েছেন। তিনজনই ছিলেন কারখানা-শ্রমিক। পুঁজিবাদী ব্যবস্থাটাকে অন্য কোনো নামে চিহ্নিত করাটা বিভ্রান্তিজনক। পুঁজিবাদকে চিনে নিতে হবে পুঁজিবাদ হিসেবেই, যার কেন্দ্রে রয়েছে সম্পদের ব্যক্তিগত মালিকানা। ব্যক্তিগত মালিকানা অবসান ঘটিয়ে সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠার যে সংগ্রাম সেটা যেমন স্থানীয় ও তেমনি আন্তর্জাতিক। তবে লড়াইটা তো করতে হবে নিজেদের ভূমিতে দাঁড়িয়েই। এ লড়াই অবশ্যই রাজনৈতিক, কিন্তু এর জন্য প্রস্তুতিটা হওয়া চাই সাংস্কৃতিক। আমরা একাত্তরে লড়েছি সে চেতনাটা যে দুর্দমনীয় ছিল তা সত্য, কিন্তু চর্চা ও অনুশীলনের মধ্য দিয়ে তাকে সত্তার গভীরে নিয়ে যাওয়ার সময়টা তো পাওয়া যায়নি। যার ফলে যে-মুক্ত স্বদেশের কথা আমরা ভেবেছি সেখানে রাষ্ট্র এবং সমাজের চরিত্রটা কী দাঁড়াবে সেই ধারণাটি পরিষ্কার হয়নি। সমাজতন্ত্রের কথা এসেছে, না-বলে দিয়ে উপায় ছিল না বলেই। যুদ্ধটা পরিণত হয়েছিল জনযুদ্ধে এবং যুদ্ধরত মানুষেরা ঔপনিবেশিক যুগের শোষণমূলক পুরনো ব্যবস্থার অধীনেই রয়ে যেতে যে কিছুতেই রাজি হবে না এটা ছিল সুস্পষ্ট।

যুদ্ধকালে নেতৃত্ব ছিল যে আওয়ামী লীগারদের হাতে, তারা মোটেই সমাজতন্ত্রী ছিলেন না, উল্টো ছিলেন সমাজতন্ত্রবিরোধী; কিন্তু সমাজতন্ত্রের কথাটা তাদের বলতে হয়েছে, নির্বাচনের সময়ে ভোট পাওয়ার জন্য এবং যুদ্ধের সময় যুদ্ধক্ষেত্রে অনুপস্থিত থেকেও নেতৃত্বে বহাল রাখার আত্যন্তিক প্রয়োজনে। ভারতের যে সরকার মুক্তিযুদ্ধে জয়ী হতে আমাদের সাহায্য করেছে তারাও ছিল সমাজতন্ত্র-বিরোধীই এবং তাদের বিশেষ রকমের শত্রুতা ছিল সমাজতন্ত্রীদের সঙ্গেই, যে জন্য গাত্রে সামান্য বামপন্থি গন্ধ আছে এমন সন্দেহভাজনদেরও তারা মুক্তিবাহিনীতে প্রবেশাধিকার দেয়নি এবং এমনকি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই গঠিত তৎকালীন বাংলাদেশ সরকারের সম্পূর্ণ অজ্ঞাতে মুজিব বাহিনী নামে একটি সশস্ত্র বাহিনীকে গঠন ও প্রশিক্ষিত করা হয়েছিল জনযুদ্ধের প্রয়োজনে নয়, মুক্তিযুদ্ধ যাতে সমাজতন্ত্রীদের নেতৃত্বাধীন হয়ে না পড়ে তার ব্যবস্থা করতে। কথা ছিল মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে উপনিবেশবাদী পুরনো রাষ্ট্রটিকে ভেঙে প্রকৃত অর্থে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং পুরনো সমাজকে বদলে ফেলে নতুন এক সমাজ প্রতিষ্ঠার; উপলব্ধি ছিল প্রকৃত গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন হবে ব্যক্তিগত মালিকানার জায়গাতে সামাজিক মালিকানা কায়েমের। সে স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়নি। দুটি কারণে : প্রথম কারণ পাকিস্তানি বুর্জোয়াদের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে শাসন-ক্ষমতা উঠতি বাঙালি বুর্জোয়াদের দখলে চলে যাওয়া। দ্বিতীয় কারণ, স্বাধীনতার সংগ্রামকে জাতীয় মুক্তির সংগ্রামে পরিণত করার কর্তব্যপালনে সমাজতন্ত্রীদের ব্যর্থতা।

ব্যর্থতার ওই ইতিহাস করুণ ও হতাশাব্যঞ্জক। জগৎজুড়ে আজ যে সংকট সেটি সভ্যতার নয়, এমনকি মানবতারও নয়, সরাসরি মনুষ্যত্বের এবং তার পেছনে ও সামনে রয়েছে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা। সামাজিক মালিকানার নতুন ব্যবস্থা গড়ে তোলাটাই হচ্ছে মনুষ্যত্বকে রক্ষা করার একমাত্র কার্যকর উপায়। সেই লক্ষ্যেই প্রয়োজন ব্যাপক সাংস্কৃতিক অনুশীলনের। যে কাজটা শুধু সমাজতন্ত্রীরাই করতে পারেন এবং তাদেরই করতে হবে। এই সত্যটা সর্বক্ষণ সামনে থাকা দরকার যে, সংস্কার আবশ্যক বটে, তবে সংস্কারে কুলাবে না; প্রয়োজন হবে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের এবং সে পরিবর্তন সম্ভব করে তোলার জন্য সমাজ বিপ্লবের কোনো বিকল্প আজ নেই।

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত