প্রত্যেকটি গণতান্ত্রিক সরকারকেই হতে হয় জনগণের সরকার। যদিও বাংলাদেশে বেশিরভাগ দুষ্কর্ম হয় জনগণের ইচ্ছার দোহাই দিয়ে। কিন্তু জনগণ আর ‘মব’ তো এক না। এতে জনগণের নামে জায়গা দখল করে সুযোগ সন্ধানীরা। বিশৃঙ্খলা ও পেশিশক্তি হয়ে ওঠে তাদের প্রধান হাতিয়ার। এই মুহূর্তে বাংলাদেশে মব একটি আলোচিত বিষয়। একটি আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামোতে মব কখনো বিচারের হাতিয়ার হতে পারে না। মব শুধু আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের লঙ্ঘনই নয়, এটি জনজীবনে এমন এক অবস্থার তৈরি করে তা নৈরাজ্যকেই প্রশ্রয় দেয়। একই সঙ্গে মব রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর জনগণের আস্থাহীনতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রম ক্ষয়িষ্ণুতার জন্য দায়ী। মব যখন ধারাবাহিক হয়ে ওঠে তখন বিপর্যয় ঘনিয়ে আসে। মব বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আবেগ দ্বারা তাড়িত, গুজব নির্ভর বা উগ্র মতাদর্শ দ্বারা পরিচালিত হয়। এই উচ্ছৃঙ্খল গোষ্ঠী আইনকানুন, নিয়ম, বিচার কিছুই মানে না। এটি আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরোধী এবং বহু মত, পথ ও চর্চায় বাধা দেয়। মব আমাদের রাষ্ট্রকাঠামো ও আদর্শের অংশ হতে পারে না, এমনকি সরকারেরও না। গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশের গণজাগরণ হয়েছে, সরকার পরিবর্তন হয়েছে, ফলে দেশে একটি বিশেষ পরিস্থিতি অতিক্রম করছে। তবে তা কোনোভাবেই মবের বৈধতা দেয় না।
সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন রকমের কর্মকাণ্ড দেখে মনে হয় মব যেন রাজনৈতিক সংস্কৃতি হয়ে উঠছে। কারণে-অকারণে ক্ষণে ক্ষণে মব তৈরি হচ্ছে। কেউ কেউ উসকিয়ে দিচ্ছে। অনলাইনে কারও কারও উসকানিতে উচ্ছৃঙ্খল তথাকথিত ছাত্র-জনতা রাস্তাঘাটে লাঠিসোঁটা হাতে জড়ো হচ্ছে। ঘোষণা দিয়ে অন্যের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। সে হতে পারে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বা সাধারণ কোনো একজন মানুষ। ছাত্র-জনতার রক্তের মাধ্যমে গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে তাদের কারও কারও হাবভাব দেখে মনে হয়, সরকারি বাহিনী তাদের জন্য চ্যালেঞ্জিং না। এই মবের হাত থেকে বাদ যাচ্ছে না নারীরা, বয়স্ক মানুষ, মুক্তিযোদ্ধা, গণমাধ্যম বা সাংবাদিক। আদালতে বিরোধী পক্ষকে হেনস্তা করা, এমনকি বিরোধী পক্ষের আইনজীবীদের হেনস্তা ও শারীরিকভাবে নিগৃহীত করার ঘটনা ঘটছে। এই সময়ে মবকে উসকে ও বৈধতা দেওয়ার জন্য পতিত রেজিম কিংবা ফ্যাসিবাদের দোসর, সমর্থক প্রভৃতি অভিধায় অভিহিত করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই অভিযোগের প্রমাণ কোনো বিষয় হিসেবে আসছে না।
আবার এই ধরনের উচ্ছৃঙ্খল আচরণ বন্ধ করার জন্য কোনো প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাস্তবতায় পুলিশকে এখনো পুরো মাত্রায় সক্রিয় করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ ও মব মোকাবিলায় অন্তর্বর্তী সরকারকে বেগ পেতে হচ্ছে। অন্যদিকে, রাজনৈতিক দলগুলোও নিজেদের কর্মী-সমর্থকদের নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট তৎপর, তা বলা যাবে না। দলগুলো কিছু ক্ষেত্রে বিবৃতি দিয়েই দায় এড়িয়ে থাকতে চাচ্ছে বলে মনে হয়। এমন পরিস্থিতিতে সুযোগসন্ধানী ও স্বার্থবাদী কিছু লোক বিশেষ বিভিন্ন বর্গ, সম্প্রদায়কে উসকে দিতে যে ভাষা, ভঙ্গি ও আচরণের আশ্রয় নিচ্ছে যা সাবেক সরকারের ফ্যাসিবাদী নেতাদের মনোভাবকে মনে করিয়ে দেয়। প্রশ্ন হচ্ছে ফ্যাসিবাদকে মোকাবিলা করতে ফ্যাসিবাদ অনুরূপ কোনো পদ্ধতি গ্রহণ করতে হয় কি না? একটি কাল্ট সিস্টেম কি আরেকটি কাল্ট দ্বারা প্রতিস্থাপন করা যায় কি না? এ যেন পুরনো সংস্কৃতির নতুন মোড়ক। এটাই হয়ে আসছে গত পঞ্চাশ বছরের বাংলাদেশের রাজনৈতিক চর্চার ক্ষেত্রে। বিজয় সম্পূর্ণ করতে বিরোধী পক্ষকে দমনের নামে তৈরি করা হয়েছে অরাজকতা আর এর ফলে তারা আসলে বিরোধীকে দমনে ব্যর্থ হয়ে নিজেই বিরোধীর বাতিল রূপে হাজির হয়।
যারা মব-এর অংশ হচ্ছে তাদের আদর্শ কী? তারা কি বাধ্য হয়ে মবের অংশ হচ্ছে, নাকি বুঝেশুনে অংশ নিচ্ছে? তারা কি অন্যদের দ্বারা প্ররোচিত হচ্ছে বা অন্য কারও দাবার ঘুঁটি হচ্ছে? যারা মব তৈরি করছে বা একে ব্যবহার করছে তারা কারা এবং তাদের উদ্দেশই বা কী? প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা দরকার। সময় যত গড়াচ্ছে এই মব কালচার অন্তর্বর্তী সরকারকে নাজুক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সরকারের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক হালকা হচ্ছে, একই সঙ্গে আত্মবিশ্বাসেও চির ধরছে। কেউ কেউ মনে করছে মব এবং বিশেষ করে এর উসকানিদাতারা সরকার ঘনিষ্ঠ। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এসব মব সরকারের ভাবমূর্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে। এটা ঠিক অন্তর্বর্তী হলেও এই সরকারেরও রাজনৈতিক সমর্থন দরকার। সেই সমর্থন তো অভ্যুত্থানকারী ছাত্র-জনতা এবং দেশের রাজনৈতিক দলগুলো দিয়ে আসছে। ফলে সরকারের কোনো সুযোগ নেই সমর্থনকারী হিসেবে মব ও তার উসকানিদাতাদের ছাড় দেওয়ার।
মূল বিষয়টা হচ্ছে রাজনৈতিক সংস্কৃতি। আমরা কোনোভাবেই যেন প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বের হতে পাড়ছি না। এখানে রাজনীতির একটি বড় অনুষঙ্গ হচ্ছে যুদ্ধংদেহী মনোভাব, ঔদ্ধত্য ও জনসম্মুখে হুমকি-ধমকি দেওয়া। অনেক সময়ই তা বেশিরভাগ মানুষের বিরক্তির কারণ হয়ে থাকে। মব কোনোভাবেই সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হতে পারে না। বরং এর মাধ্যমে অপরাজনীতি রাজনীতিতে ঢুকে পড়ে। রাজনীতিতে পেশিশক্তির ব্যবহার বৈধতা পায়। যারা জনমতের নামে পেশিশক্তির ব্যবহারকে বৈধতা দিচ্ছে তারাই ধীরে ধীরে অগণতান্ত্রিক আচরণে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। তাদের কাছে রাজনীতির পরিবর্তে পেশিশক্তির ব্যবহার তখন মুখ্য হয়ে উঠবে। রাজনীতির মাধ্যমে জনগণের মঙ্গল ও অধিকার আদায়ই যেখানে উদ্দেশ্য সেখানে পেশিশক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে এই রাজনীতি হয়ে ওঠে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বেচ্ছাচারিতার হাতিয়ার।
অনেক ক্ষেত্রে মবের বৈধতার ন্যারেটিভ হিসেবে ফ্যাসিবাদের কিংবা স্বৈরাচারের দোসর, আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ইত্যাদি ট্যাগিং কালচার দেখা যাচ্ছে। এ যেন উইচ হানটিং-এর আরেকটি রূপ। সারাক্ষণ শত্রু খোঁজা। ইতিহাসের পরতে পরতে বিভিন্ন বিশ্বাস ও চর্চার নামে উইচ হানটিং চলেছে। সব থেকে বড় প্রশ্ন এই ন্যারেটিভে ঠগ বাছতে গা উজাড় হয়ে যেতে পারে। মনে রাখতে হবে আপনার সামনে ১৬ বছরের একটি রেজিমের জঞ্জাল। এবং এই দীর্ঘসময় দেশের মানুষকে ‘কায়দা করে’ বেঁচে থাকতে হয়েছে, রুটি-রুজির জোগাড় রাখতে হয়েছে। ফলে অনেকেই অনেক কিছু বলতে বা করতে বাধ্য হয়েছেন। ফলে ফৌজদারি, দুর্নীতি, অনিয়ম ইত্যাদির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া ‘অমুক ওই সময় তমুক বলছিলেন’ বলে শত্রুর কাতারে ঠেলে দিতে থাকলে একা হয়ে যেতে হবে। সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের মুখপাত্রদের এবং উপদেষ্টাদেরও এই ধরনের মব এবং এর উসকানিদাতাদের প্রসঙ্গে স্পষ্ট কথা বলা দরকার। তবে অনেক সময় রাজনৈতিক নেতারা বক্তব্য প্রদানের জন্য রাজনৈতিক রেটরিক বা বাগাড়ম্বরতা করে থাকেন। যেটাকে আমাদের দেশে তারা রাজনৈতিক বক্তব্য বলে চালিয়ে দেন।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশে মবের ব্যাপকতা বোঝাতে মবের মুল্লুক শব্দটির ব্যবহার করা হচ্ছে। এর আগে আমরা মগের মুল্লুকের সঙ্গে পরিচিত ছিলাম। মগের মুল্লুক বলতে এমন একটা দেশ বা জায়গার কথা বোঝানো হয় যেখানে আইনের শাসনের কোনো বালাই নাই, পেশিশক্তি ব্যবহার করে যে যার মতো করে অন্যের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এমন একটা অবস্থা। ইতিহাসের আলোকে দেখলে শায়েস্তা খান বাংলা থেকে মগদের মুল্লুক ছাড়া করেন। শায়েস্তা খান ১৬৬৬ সালে মগদের চট্টগ্রাম থেকে বিতাড়িত করেন সেটাই হচ্ছে ঐতিহাসিক ভাষ্য। মূলত এই মগ বলতে আমরা যাদের বুঝাচ্ছি তারা ছিল আরাকানিজ, ১৫৩৮ সালে আরাকানিজরা চট্টগ্রাম অঞ্চল দখলে নেয়। তখন থেকে এই আরাকানিজরা মাঝে মধ্যেই বর্তমান বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নৌপথে অতর্কিত লুটতরাজ চালাত। এমনকি মাঝে মাঝে তারা ঢাকাও আক্রমণ করত। তবে শুধু মগের মুল্লুকই না আমরা এই ভূখণ্ডে শত বছরব্যাপী মাৎস্যন্যায়-এর কথা জানি, প্রাচীন বাংলায় অরাজকতা বলতে মাৎস্যন্যায় দিয়ে বোঝানো হতো। এই মাৎস্যন্যায় থেকে রক্ষা পেতে দেশের জনগণ পাল রাজারের হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়েছিল।
বর্তমানে অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে মবের মুল্লুক কায়েম করে কোন গোষ্ঠীর কী লাভবান হওয়ার সুযোগ আছে? এর মাধ্যমে দেশের মধ্যে এক ধরনের নৈরাজ্য পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। আর তা হলে তার দায় কার সেটা একটা বড় প্রশ্ন হিসেবে দেখা দেবে। আমরা সবাই চাই শেখ হাসিনা পরবর্তী নতুন আমল হবে রূপক অর্থে তথাকথিত শায়েস্তা খানের। মগের মুল্লুক ও মবের মুল্লুক বিতাড়নের আমল। ইতিহাসের নতুন কোনো মাৎস্যন্যায় আবার নতুন করে দেখতে চাই না। সরকার ও তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিবর্গকে দৃঢ়ভাবে এর মোকাবিলা করতে হবে। এটা যত দ্রুত তারা আমলে নেবেন, ততই আমাদের মঙ্গল।
লেখক : উন্নয়নকর্মী ও কলামিস্ট
psmiraz@yahoo.com