উত্তেজনা প্রশমিত হোক

কোনো দেশে অবস্থানরত অন্য দেশের দূতাবাসকে ধরা হয় সেই দেশের একটি ভূখ- হিসেবে। ফলে, দূতাবাসে হামলাকে সেই দেশে হামলার সমতুল্য বলেই অনেক সময় ধরে নেওয়া হয়। স্বাগতিক রাষ্ট্র ও সরকারের কর্তব্য হচ্ছে দূতাবাসকে সুরক্ষা দেওয়া। এর ব্যত্যয় হলে স্বাগতিক দেশের জন্য তা ব্যর্থতা ও কূটনৈতিক বিপর্যয় বলে ধরা হয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ত্রিপুরা রাজ্যের উত্তর আগরতলায় বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনে হামলা হয়েছে। হিন্দু সংঘর্ষ সমিতি নামের একটি সংগঠনের সমর্থকরা এ হামলা চালান। এ সময় ভাঙচুর ও জাতীয় পতাকা নামিয়ে ফেলার ঘটনাও ঘটে। বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর থেকেই প্রতিবেশী দুই বন্ধুত্বপূর্ণ দেশের মধ্যে সম্পর্কে টানাপড়েন চলছে। দূতাবাসে হামলা এর সর্বশেষ উদাহরণ। এর ফলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে। সংবাদমাধ্যমের খবরে জানা গেছে, মঙ্গলবার বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার নিরাপত্তার কারণে আগরতলার সহকারী হাইকমিশনের কনস্যুলার সেবা বন্ধ ঘোষণা করেছে। এমতাবস্থায় দুদেশের কূটনীতি আরও জোরালো এবং দুদেশের নাগরিকদের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমন না করলে আঞ্চলিক অস্থিরতার শঙ্কা ছড়িয়ে পড়তে পারে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র দপ্তরের বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয়েছে যে, বিক্ষোভকারীদের পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশনের প্রধান ফটক ভেঙে প্রাঙ্গণে আগ্রাসনের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল বলে সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে। এ প্রক্রিয়ায় স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের উপস্থিতিতে তারা পতাকার খুঁটি ভাঙচুর করে, বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার অবমাননা করে এবং সহকারী হাইকমিশনের ভেতরে সম্পত্তির ক্ষতি করে। এই হামলা কূটনৈতিক সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা সনদের লঙ্ঘন। পরিতাপের বিষয়, প্রাঙ্গণ রক্ষার দায়িত্বে থাকা স্থানীয় পুলিশ সদস্যরা শুরু থেকেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় ছিল না। ভারতে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার অপবিত্রতা একটি নৈমিত্তিক উদাহরণ হয়ে উঠেছে। গত ২৮ নভেম্বর কলকাতায়ও একই ধরনের হিংসাত্মক বিক্ষোভ হয়েছে।

অন্যদিকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আগরতলায় বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনের ভবনে আজকের অনুপ্রবেশের ঘটনা গভীরভাবে দুঃখজনক। কোনো অবস্থাতেই কূটনৈতিক ও কনস্যুলার সম্পত্তি লক্ষ্যবস্তু হওয়া উচিত নয়।’ ভাঙচুর ও জাতীয় পতাকায় আগুন দেওয়ার ঘটনায় তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করেছে ভারতীয় কর্র্তৃপক্ষ। সেই সঙ্গে হামলায় জড়িত থাকার সন্দেহে গ্রেপ্তার করা হয়েছে সাতজনকে। তবে ভারতীয় বেশকিছু রাজনীতিবিদ ও সংবাদমাধ্যম বেশ কিছুদিন ধরেই ন্যক্কারজনক আচরণ করছেন। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিধানসভার অধিবেশনে যোগ দিয়ে বাংলাদেশে শান্তিসেনা (পিস কিপিং ফোর্স) পাঠানোর জন্য কেন্দ্রকে জাতিসংঘের সঙ্গে কথা বলার আর্জি জানান। বেশ কিছু প্রভাবশালী নেতা বাংলাদেশে ভারতীয় পণ্য রপ্তানি বন্ধের হুমকি দিয়েছেন। এর জেরে সিলেটের জকিগঞ্জ শুল্ক স্টেশন দিয়ে পণ্য আমদানি-রপ্তানিসহ সব ধরনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে পড়েছে। ভারতের করিমগঞ্জ (কিছুদিন আগে নাম পরিবর্তন করে হয়েছে শ্রীভূমি) সনাতনী ঐক্য মঞ্চ নামের সংগঠনের বিক্ষোভের কারণে এই কার্যক্রম বন্ধ হয়েছে।

শেখ হাসিনা আন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ত্যাগ করে বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে ভারতে আশ্রয়ে আছেন। এরপর থেকেই ভারতের গণমাধ্যমে বাংলাদেশ বিরোধিতা বেড়ে গেছে। বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর নির্যাতনের অতিরঞ্জিত খবর প্রকাশিত হচ্ছে নিয়মিত। সম্প্রতি আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে জানা গেছে যে, বিপুল অর্থ ব্যয়ে ভারতে মিথ্যা তথ্যের ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠেছে। এতদিন এই ইন্ডাস্ট্রি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অগণিত মিথ্যা তথ্য ও প্রোপাগান্ডা উৎপাদন করত। ফলে, অনুমান করা যায়, এই ইন্ডাস্ট্রি এখন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডায় লিপ্ত। সম্প্রতি বাংলাদেশে ইসকনের নেতা চিন্ময় কৃষ্ণের আটকের প্রেক্ষাপটে তার ভক্তরা চট্টগ্রামে এক মুসলিম আইনজীবীকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করেছে। উপমহাদেশের ইতিহাস স্মরণে রাখলে এর জের ধরে হিন্দুদের ওপর চরম সাম্প্রদায়িক হামলার আশঙ্কা থাকলেও বাংলাদেশে তা হয়নি। তবে, প্রবল ভারতবিরোধী মনোভাব থেকে বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভারতীয় পতাকা অঙ্কন করে তার অপমানের ছবি সামাজিক মাধ্যমে দেখা গেছে। অবশ্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত একটি হলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আনুষ্ঠানিকভাবে এর নিন্দা জানিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সবারই দায়িত্ব উত্তেজনা প্রশমনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। অচিরেই দুদেশের দায়িত্বশীলদের আরও বেশি সংহত আচরণ জরুরি। দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করলে তা কারও জন্যই ভালো ফল বয়ে আনবে না।