সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো সংবিধানের যে সংস্কারের কথা বলছে, তার সঙ্গে ‘একমত নয়’ জুলাই-আগস্টের গণআন্দোলনে সরকার পতনের পর গঠিত সংগঠন জাতীয় নাগরিক কমিটি। সংগঠনটি বলছে, ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনের মাধ্যমে আগের ‘সংবিধান বাতিল হয়ে গেছে’ বলে তারা মনে করে। ফলে নতুন করে সংবিধান প্রণয়নের প্রস্তাব তাদের, যার মাধ্যমে হবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ। এ ছাড়া নতুন সংবিধান অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি দুবারের বেশি রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না। প্রধানমন্ত্রী একই সঙ্গে দলের প্রধান ও সংসদ নেতাও হতে পারবে না বলে তারা প্রস্তাব দিয়েছেন। গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে জাতীয় নাগরিক কমিটি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে মতবিনিময় করে সংবিধান সংস্কার কমিশন। সেখানে ৬৯ দফা লিখিত প্রস্তাব দিয়েছেন নাগরিক কমিটির নেতারা।
এ সময় জাতীয় নাগরিক কমিটির পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন সদস্য সচিব আখতার হোসেন ও মুখপাত্র সামান্তা শারমিন। কেন্দ্রীয় সদস্যদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন সারোয়ার তুষার, অ্যাডভোকেট মুকুল মুস্তাফিজ, অ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলাম মুসা, ড. আতিক মুজাহিদ এবং সালেহ উদ্দিন সিফাত। সংবিধান সংস্কার কমিশনের পক্ষে প্রস্তাবনা গ্রহণ করেন কমিশনের প্রধান আলী রীয়াজ। আরও উপস্থিত ছিলেন কমিশন সদস্য ফিরোজ আহমেদ, মুস্তাইন জহির, সুমাইয়া খায়ের, অধ্যাপক মোহাম্মদ ইকরামুল হক, মইন আলম ফিরোজি ও ব্যারিস্টার ইমরান সিদ্দিকি। এ সময় সংবিধান সংস্কার কমিটির সঙ্গে মতবিনিময়ও করেন জাতীয় নাগরিক কমিটির প্রতিনিধিরা।
জাতীয় নাগরিক কমিটি সংবিধান সংস্কার কমিশনকে যে প্রস্তাব দিয়েছে তার মধ্যে রয়েছে, জনগণের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করার পাশাপাশি পরে তার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার বিধান না রাখা, বিরোধীদলীয় নেতাকে ছায়া-মন্ত্রিসভা গঠনের অধিকার দেওয়া, মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণাপত্রকে প্রথম রিপাবলিকের প্রস্তাবনা হিসেবে গ্রহণ করে তা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা, ‘দ্বিতীয় রিপাবলিকের প্রোক্লেমেশন জারি করে’ তা নতুন সংবিধানের প্রস্তাবনা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা।
দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের প্রস্তাব করে জাতীয় নাগরিক কমিটি বলছে, উচ্চকক্ষের নাম হবে জাতীয় পরিষদ ও নিম্নকক্ষের নাম হবে আইনসভা। ৩০০ আসনের আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হবে জনগণের ভোটে। আর ১০০ সদস্যের জাতীয় পরিষদ হবে সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে। এর মধ্যে ৩৩টি আসনে পেশাজীবী কৃষক-শ্রমিক, ছাত্র, আইনজীবী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী-কৃষিবিদ-সাংবাদিকসহ আইনে তফসিলভুক্ত পেশা এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মানুষকে মনোনয়ন দিতে হবে। আইন পাশে উভয় কক্ষের অনুমোদনের বিধানের প্রস্তাব করে তারা।
তাদের প্রস্তাব নতুন ‘লিগ্যাল ফ্রেম অর্ডারের’ অধীন গণপরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সংবিধান প্রণয়ন করা, সংবিধান প্রণয়ন সম্পন্ন হলে গণপরিষদই আইনসভায় রূপ নেবে, সংবিধানে প্রত্যেক জাতিসত্তার স্বীকৃতি থাকা, বাংলাদেশের নাগরিকগণ ‘বাংলাদেশি’ হিসেবে পরিচিত করা, সংবিধানের প্রস্তাবনায় ‘গণ-সার্বভৌমত্বের’ স্বীকৃতির বিধান রাখার পাশাপাশি গণভোটের বিধান রাখার প্রস্তাব করেছে সংগঠনটি। একই সঙ্গে সংবিধানে পরিবর্তনও শুধু গণভোটে করার প্রস্তাব করেছে নাগরিক কমিটি।
স্বাধীন বিচার বিভাগ গঠনে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের প্রস্তাব করে নাগরিক কমিটি বলছে, এর প্রধান হবেন প্রধান বিচারপতি। একই সঙ্গে প্রধান বিচারপতির অধীনে আলাদা সচিবালয় ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি। তারা মনে করে, রাষ্ট্র সরকারের নির্বাহী বিভাগের হস্তক্ষেপের বাইরে আনা গেলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার আর প্রয়োজন হয় না। তবে আগামী দুই নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতে পারে বলেও মত দিয়েছে তারা। এ ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ নিরাপত্তা বাহিনী এবং প্রশাসন নির্বাচনের আগের তিন মাস নির্বাচন কমিশনের অধীনে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।
সংবিধান কীভাবে পুনর্লিখন হবে, এমন প্রশ্নে জাতীয় নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, ‘ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আগের সংবিধান বাতিল হয়ে গেছে বলে আমরা মনে করি। আমরা দীর্ঘসময় ধরে নতুন সংবিধানের দাবি জানিয়ে আসছি। সেটা গণপরিষদের মাধ্যমে বা অন্যকে বৈধ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই দাবি ও প্রস্তাবনা আমরা করছি। সে ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলো যে সংবিধান সংস্কারের কথা বলছেন, তাদের সঙ্গে আমরা একমত নই।’