বেগম রোকেয়া এবং নারীর সংগ্রাম

অন্ধকারে মানুষ চায় আলো আর দিশাহীন সময়ে চায় পথের দিশা। সমাজের এ রকম সময়ে কিছু কিছু মানুষের জীবনসংগ্রাম, অসংখ্য মানুষের জীবনে আলোকবর্তিকার মতো ভূমিকা পালন করে। তারা মানুষকে স্বপ্ন দেখান, সাহসী করেন, সমাজের প্রতি দায় পালনে উদ্বুদ্ধ করেন। একই সঙ্গে সমাজ পরিবর্তনের সংগ্রামে অংশগ্রহণ করতে আহ্বান জানান। আমাদের এই ভূখণ্ডে তেমনি এক মহীয়সী নারী ছিলেন বেগম রোকেয়া। জ্ঞান হওয়ার পর দেখেছেন, নারীর প্রতি বৈষম্য আর এর হাত থেকে মুক্তির জন্য পথ খ্্ুঁজেছেন সারাজীবন। মৃত্যু অবধি লড়েছেন অবিরাম। নারীর মুক্তি অর্জনে শিক্ষিত হওয়াকে উপায় হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন।  অপবাদ, গ্লানি আর শত আঘাতেও তিনি অবিচলিত ছিলেন। গঙ্গা জলে যেমন গঙ্গাপূজা হয়, তেমনি বেগম রোকেয়ার জীবন সংগ্রাম থেকে শিক্ষা নিয়েই তাকে স্মরণ করতে হয়। তার শিক্ষাবিষয়ক লেখা, সমাজ ভাবনা, বিজ্ঞানমনস্কতা, নারীর মর্যাদাপূর্ণ জীবনের আকুতি, স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা  আমরা তার বই পড়ে জানতে পারি। কিন্তু ভাবতে কি পারি, কী প্রতিকূলতা তাকে মোকাবিলা করতে হয়েছে, কত অপমান সহ্য করতে হয়েছে? কাছের মানুষকে মুখ ফিরিয়ে নিতে দেখেছেন কতবার! কিন্তু হাল ছাড়েননি মৃত্যুর আগে পর্যন্ত।

বেগম রোকেয়া জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্ধ গ্রামে এক রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারে। নিজের পরিবারেই দেখেছেন বৈষম্যের রূপ। তার ভাইয়েরা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হলেও বোনদের পড়াশোনা এমনকি বাংলা শেখাও ছিল নিষিদ্ধ। কিন্তু অন্যায় প্রথার কাছে আত্মসমর্পণ নয়, যোগ্যতা অর্জন করার চেষ্টা করেছেন তিনি। সবার অগোচরে ভাইয়ের সহযোগিতা ও বোনের উৎসাহে তিনি লেখাপড়া শুরু করেন। নিজে যত শিক্ষিত হয়েছেন ততই অনুভব করেছেন সমাজে পিছিয়ে রাখা নারীদের অপমান, বঞ্চনা ও বেদনা। ফলে সারাজীবন লড়াই করেছেন নারীর মর্যাদা ও মুক্তি অর্জনের জন্য। বেগম রোকেয়া বেদনার সঙ্গে বলেছিলেন, কোন সম্ভ্রান্ত পরিবারে যেমন গরু-ছাগল থাকে তেমনি একপাল নারীও থাকেন। তাই তিনি আহ্বান জানিয়েছিলেন, আমরা অলংকারের মতো সিন্দুকে আবদ্ধ থাকব না, আসবাবের মতো ঘরে থাকব না, আমরা পশুর মতো নির্বাক থাকব না। ভগিনীগণ সমস্বরে বল, আমরা মানুষ। তিনি লিখেছিলেন, ‘আমরা অকর্মণ্য পুতুল-জীবন বহন করিবার জন্য সৃষ্ট হই নাই, এ কথা নিশ্চিত।’ (স্ত্রী জাতির অবনতি) আবারও বলছেন, ‘বর দুর্লভ হইয়াছে বলিয়া কন্যাদায়ে কাঁদিয়া মরি কেন? কন্যাগুলিকে সুশিক্ষিত করিয়া কার্যক্ষেত্রে ছাড়িয়া দাও, নিজের অন্ন-বস্ত্র উপার্জন করুক।’ (স্ত্রী জাতির অবনতি) নারীর উঠে দাঁড়াবার পথে প্রতিবন্ধকতার কারণ উল্লেখ করেছেন তিনি। ‘আমাদের যথাসম্ভব অধঃপতন হওয়ার পর দাসত্বের বিরুদ্ধে কখনো মাথা তুলিতে পারি নাই; তাহার প্রধান কারণ এই বোধ হয়, যখনই কোনো ভগ্নি মস্তক উত্তোলনের চেষ্টা করিয়াছেন, অমনই ধর্মের দোহাই বা শাস্ত্রের বচন রূপ অস্ত্রাঘাতে তাহার মস্তক চূর্ণ হইয়াছে।’ (স্ত্রী জাতির অবনতি) কিন্তু আঘাত ও অপমান তাকে হতোদ্যম করেনি। বরং যুক্তি ও সাহস ছিল তার অবলম্বন । এর জোরেই তিনি লড়েছেন আজীবন। তিনি বলেছেন ‘কেহ বলিতে পারে যে তুমি সামাজিক কথা বলিতে গিয়া ধর্ম লইয়া টানাটানি কর কেন? তদুত্তরে বলিতে হইবে যে, ‘ধর্ম’ শেষে আমাদের দাসত্বের বন্ধন দৃঢ় হইতে দৃঢ়তর করিয়াছে, ধর্মের দোহাই দিয়া পুরুষ এখন রমণীর ওপর প্রভূত্ব করিতেছেন। তাই ধর্ম লইয়া ধার্মিকগণ আমাকে ক্ষমা করিতে পারেন। অতএব জাগ, জাগ গো ভগিনী। প্রথমে জাগিয়া ওঠা সহজ নহে, জানি। সমাজ মহা গোলযোগ বাঁধাইবে, জানি। ভারতবাসী মুসলমান আমাদের জন্য ‘কৎল’-এর বিধান দিবেন এবং হিন্দু চিতানল বা তুষানলের ব্যবস্থা দিবেন, জানি। এবং ভগিনীদিগের জাগিবারও ইচ্ছা নাই, জানি। কিন্তু সমাজের কল্যাণের নিমিত্ত জাগিতে হইবেই। বলিয়াছি তো, কোন ভালো কাজ অনায়াসে করা যায় না। কারামুক্ত হইয়াও গ্যালিলিও বলিয়াছিলেন, কিন্তু যাহাই হউক পৃথিবী ঘুরিতেছে। আমাদিগকেও ঐরূপ বিবিধ নির্যাতন সহ্য করিয়া জাগিতে হইবে।’ তিনি জেগে উঠেছিলেন কারণ নারী-পুরুষের বৈষম্যের বেদনা তাকে ঘুমিয়ে থাকতে দেয়নি। আবার অনেকের মতো শুধু নিজে জেগে উঠে একা এগিয়ে গিয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠা পাওয়া নয়, সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার কষ্টকর পথে হেঁটেছেন আজীবন। 

সমাজের প্রতি কর্তব্য এবং সমাজের কাছে প্রাপ্য অধিকার দুটোই যেন যুক্তি দ্বারা নির্ধারিত হয়, বেগম রোকেয়ার এই ছিল সমাজের কাছে চাওয়া। দয়া নয়, করুণা নয়, মর্যাদা এবং অধিকার পাওয়ার জন্যই ছিল তার সংগ্রাম। সে কারণেই তিনি যেমন বলেছিলেন, ‘অনুগ্রহ করে আমাদের অনুগ্রহ কোরো না।’ অন্যদিকে নারীদের ভর্ৎসনা করে বলেছিলেন, ‘আমাদের মন মগজ পর্যন্ত যেন দাসী হইয়া গিয়াছে।’ তাই তিনি সারাজীবন ধরে শিখিয়েছেন ‘কোন কাজই তুচ্ছ নয়, তা সংসারের কাজ হোক বা সমাজের কাজ। শিক্ষা যেন অহমিকা বা অলংকারের বিষয় না হয়। তা যেন মানসিক সৌন্দর্য বাড়ায়, সচেতন, সংগ্রামী, সাহসী ও সংযমী করে।’ বিয়ে, সংসার ও মাত্র ২৯ বছর বয়সে বিধবা হওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি বুঝেছিলেন পরিবারে ও সমাজে নারীর অবস্থান কত দুর্বল। তিনি এটাও উপলব্ধি করেছিলেন যে, অধিকার কোনো দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়। নারীর মুক্তি অর্জনের সংগ্রামে শিক্ষাকে তিনি পথ হিসেবে বিবেচনা করে স্কুল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। স্বামীর মৃত্যুর পর ১৯০৯ সালে  ভাগলপুরে মাত্র ৫ জন ছাত্রী নিয়ে তিনি প্রথম স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু স্বামীর পরিবার ও সমাজের বাঁধার কারণে তিনি কলকাতায় চলে আসতে বাধ্য হন এবং ১৯১১ সালে ৮ জন ছাত্রী নিয়ে আবার স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। আর্থিক অনটন,  ছাত্রী জোগাড় করতে সামাজিক বাধা, অপবাদ মোকাবিলা করে তিনি অবিচল ছিলেন শিক্ষা বিস্তারের কাজে। সমাজের অর্ধেক অংশ নারীকে উপেক্ষা করে, পিছিয়ে রেখে সমাজের অগ্রগতি যে সম্ভব নয়, সারাজীবন ধরে লেখার মাধ্যমে এই কথাটি তিনি প্রচার করে গেছেন। তার জিজ্ঞাসা ছিল নারীরা কেন পিছিয়ে থাকবে? তাদের কি হাত নেই, পা নেই, চিন্তা শক্তি নেই? তার স্বপ্ন ছিল একদিন নারীরাও সমাজের সব ক্ষেত্রে পুরুষদের সমান যোগ্যতা ও অধিকার অর্জন করবে। ১৯০৪ সালে মতিচুর বইয়ে লিখেছিলেন, ‘আমরা সমাজেরই অর্ধঅঙ্গ। আমরা পড়িয়া থাকিলে সমাজ উঠিবে কীরূপে? কোনো ব্যক্তির এক পা বাঁধিয়া রাখিলে সে খোঁড়াইয়া কতদূর চলিবে?’ সেই লেখাতেই বলেছিলেন, ‘জগতের যে সকল সমাজের পুরুষেরা সঙ্গিনীসহ অগ্রসর হইতেছে, তাঁহারা উন্নতির চরম সীমায় উপনীত হইতে চলিয়াছেন।’ আর তার খেদ ছিল, ভারতের মুসলমানদের মধ্যেই কি এর ব্যতিক্রম হবে? তাই নারীদের মধ্যে মর্যাদাপূর্ণ জীবন গড়ে তোলার আকুতি নিয়ে লিখছেন, ‘তুই জীবন সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হ! মুষ্টিমেয় অন্নের জন্য যেন কোনো দুরাচার পুরুষের গলগ্রহ হইতে না হয়, আমি তোকে সেই রূপ শিক্ষা দিয়া প্রস্তুত করিব।’

১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর মাত্র ৫২ বছর বয়সে বেগম রোকেয়ার কর্মময় সংগ্রামী জীবনের অবসান ঘটে। ব্রিটিশ, পাকিস্তানি শাসনের অবসান হয়েছে। দেশ স্বাধীনের ৫৩ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। নারীরা তাদের যোগ্যতা, শিক্ষা ও কাজে অনেক দূর এগিয়ে এসেছে। সমাজের প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে লড়াই করছেন। কিন্তু ঘরে-বাইরে তার কাজ ও সংগ্রামের স্বীকৃতি মেলেনি এখনো। স্বাধীনতা সংগ্রামে জীবন ও সম্ভ্রম দিয়েছে, ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে হাজার হাজার নারী অংশ নিয়েছেন কারণ পরাধীনতা ও বৈষম্যের যন্ত্রণা নারীদের চাইতে আর বেশি কেউ অনুভব করে না। তারা দেখছে বাসে, ট্রেনে অফিসে, বিশ্ববিদ্যালয়ে তো বটেই নিজের ঘরেও নারীর নিরাপত্তা নেই। পৈতৃক সম্পত্তিতে সমান অধিকার, ঘরের কাজের স্বীকৃতি, সমান কাজে সমান মজুরি এখনো মেলেনি। নারীকে নিয়ে অরুচিকর কথা, সিনেমা নাটকে বিজ্ঞাপনে নারীকে হেয় করা, পথে চলতে লাঞ্ছনা এমনকি বিশ^বিদ্যালয়েও সান্ধ্য আইনের মতো বিধান জারি করা থেকে  বোঝা যায় নারীর পথচলা কত কঠিন। যে নারীরা কৃষি, গার্মেন্টসসহ শিল্প, প্রবাসী শ্রমিক হিসেবে অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখছে, সামাজিক, রাজনৈতিক সমস্ত সংগ্রামে অংশ নিচ্ছে তাদের ঘরে বন্দি রাখার জন্য মৌলবাদী প্রচারণা চালানো হচ্ছে। আজ সমাজের অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি সব ক্ষেত্রে শ্রমজীবী মানুষের এত অবদান সত্ত্বেও ঘরে-বাইরে এত অপমান দেখে হতাশ যারা তাদের প্রতি বেগম রোকেয়ার উপদেশ, ‘যদি সমাজের কাজ করিতে চাও, তবে গায়ের চামড়াকে এতখানি পুরু করিয়া লইতে হইবে; যেন নিন্দা- গ্লানি, উপেক্ষা-অপমান কিছুতেই তাহাকে আঘাত করিতে না পারে; মাথার খুলিকে এমন মজবুত করিয়া লইতে হবে; যেন ঝড়-ঝঞ্ঝা, বজ্র-বিদ্যুৎ সবই তাহাতে প্রতিহত হইয়া ফিরিয়া আসে।’

তার নিজের জীবন এর এক জ্বলন্ত উদাহরণ। সমাজের দেওয়া আঘাত ও অপমানে তার হৃদয় বিদীর্ণ হয়েছিল বলে তিনি লিখেছিলেন ‘আমি কারসিয়াং ও মধুপুরে বেড়াইতে গিয়া সুন্দর সুদর্শন পাথর কুড়াইয়াছি, উড়িষ্যা ও মাদ্রাজে সাগর তীরে বেড়াইতে গিয়া বিচিত্র বর্ণের বিচিত্র আকারের ঝিনুক কুড়াইয়া আনিয়াছি। আর পঁচিশ বছর ধরিয়া সমাজসেবা করিয়া কাঠমোল্লাদের অভিসম্পাত কুড়াইয়াছি।’ আজ নারীদের ওপর অভিসম্পাত শুধু নয়, আক্রমণও বেড়েছে। বাইরে বিপদ ঘরেও নিরাপত্তা নেই। ফলে যারা নারী মুক্তির কথা ভাবেন তাদের দায়ীত্ব বেড়েছে বহুগুণ। বৈষম্যমূলক সমাজে আর্থিক, ধর্মীয়, জাতিগত, লৈঙ্গিক নানা ধরনের বৈষম্য বিরাজ করে। পুঁজিবাদ ক্রমাগত অর্থনৈতিক বৈষম্য সৃষ্টি করছে আর নারীরা হচ্ছে এর চরম শিকার। জন্মের পর থেকেই বৈষম্যের বেদনা বহন করে নারীরা। এর কবল থেকে মুক্তি পেতে গণতান্ত্রিক চেতনা ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই। বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বেগম রোকেয়ার সেই আহ্বান, জাগো ভগিনীগণ! এখনো গণতান্ত্রিক অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে এক সাহসী আহ্বান।

লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক

rratan.spb@gmail.com