‘মূল্যস্ফীতি’ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কথা হচ্ছে। বিগত সরকারের সময় থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম যে হারে বাড়তে থাকে, তাতে শ্রমজীবী মানুষ তো বটেই, মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষও গলদঘর্ম হয়ে উঠেছিলেন। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সেই পাগলা ঘোড়াকে লাগাম টানা যায়নি। বলা ভালো, বিগত সরকারের পক্ষ থেকে লাগাম টানার তেমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। কখনো করোনা, কখনো হরতাল-ধর্মঘট, কখনো ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, কখনো আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি, কখনো বলা হয়েছে উৎপাদন ঘাটতির কথা। আবার এমনও বলা হয়েছে, বিশ্ববাজারে পণ্যমূল্য বৃদ্ধির ফলে আমদানি ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু বেমালুম চেপে যাওয়া হয়েছে, মুনাফাখোর-মজুদদারদের কারসাজির কথা। মূল্যস্ফীতি হলে স্বাভাবিকভাবেই খাদ্যদ্রব্য, পোশাক, বাড়ি ভাড়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বেড়ে যাবে। তখন মানুষকে এসব সেবা বা পণ্য কিনতে আগের চেয়ে বেশি টাকা খরচ করতে হয়। একই সঙ্গে সঞ্চয় কমে যায় এবং অন্যান্য খাতের খরচ কমাতে হয়। তাতে মূল্যস্ফীতির বেশি প্রভাব পড়ে নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর ওপর।
এক সময় বড় মূল্যস্ফীতির ঘটনা দেখা গেছে আফ্রিকার দেশ জিম্বাবুয়েতে। সেখানে আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হলে সরকার অতিরিক্ত টাকা ছাপিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে। ফলে, বাজারে পণ্যের চেয়ে টাকার জোগান বেশি হয়ে যায়। মূল্যস্ফীতি তখন দাঁড়ায় ৩৭০০ শতাংশে! আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর হাঙ্গেরিতে মূল্যস্ফীতি হয়েছিল প্রায় ১৯০০০ শতাংশ। বিভিন্ন অর্থনীতিবিদ বলছেন যেসব দেশে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা দুর্বল, বাজারে নজরদারি কম, সেখানে মূল্যস্ফীতি প্রবল হয়ে ওঠে। বাজারে পণ্যের মজুদ এবং মুদ্রার পরিমাণের মধ্যে ভারসাম্য থাকতে হয়। যদি পণ্যের তুলনায় মুদ্রার সরবরাহ অনেক বেড়ে যায় অর্থাৎ দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক অতিরিক্ত মাত্রায় টাকা ছাপায় তখনই মুদ্রাস্ফীতি ঘটে। সাধারণত ২ থেকে ৫ শতাংশ মুদ্রাস্ফীতি থাকলে সেটাকে ‘সহনীয়’ বলা যায়। ৭ থেকে ১০ শতাংশ হলে মধ্য ও নিম্নবিত্ত আয়ের মানুষের কষ্ট বাড়ে। এর চেয়ে বেশি মুদ্রাস্ফীতি দেশের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরে শুক্রবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। জানা যাচ্ছে- দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশে। বাজার তদারকিতে দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট। নভেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে ১১ দশমিক ৩৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আর শঙ্কার জায়গায় পৌঁছে গেছে খাদ্য মূল্যস্ফীতি, ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ। সম্প্রতি দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব দেশ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সফলতার মুখ দেখলেও, এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যতিক্রম। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত নভেম্বর মাসের ভোক্তা মূল্যসূচকে (সিপিআই) এসব তথ্য উঠে এসেছে। দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ ভারতকে ২০২২ সালের পর মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অস্বস্তিতে পড়তে হয়েছিল। কিন্তু তারাও নিয়ন্ত্রণে এনেছে।
বিবিএসের সিপিআই তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বরে শহর এলাকায় খাদ্য মূল্যস্ফীতি নাগালের বাইরে গিয়ে ১৪ দশমিক ৬৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে চলতি অর্থবছর মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। ইতিমধ্যে কয়েকবার নীতি সুদহারও বাড়িয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাজার নিয়ন্ত্রণে জেলায় জেলায় টাস্কফোর্সও গঠন করা হয়েছে। কিন্তু কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না গড় মূল্যস্ফীতি। মূল্যস্ফীতি আগামী জুন মাসের মধ্যে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। চলতি বছরের অক্টোবরে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশ ছাড়িয়ে ৮ দশমিক শূন্য সাত শতাংশ হয়। নভেম্বরে আরও কিছুটা বেড়ে ৮ দশমিক ১০ শতাংশ হয়েছে। ডিসেম্বর এবং নতুন বছরে বর্তমান গতিতে মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকলে, পরিণতি কী হবে!
মনে রাখতে হবে, অধিক মূল্যস্ফীতির সঙ্গে প্রকৃত মজুরির একটি বিরোধ রয়েছে। এই বিরোধ যদি দীর্ঘদিন চলতে থাকে তবে স্বল্প আয়ের মানুষের ওপর এর ভয়ংকর প্রভাব পড়বে। প্রকৃতপক্ষে বাজার ব্যবস্থাপনাকে মনিটরিং করার ব্যাপারে আরও আন্তরিক হতে হবে। পণ্য আমদানিতে দেরি হলে সেই সুযোগে দাম বাড়িয়ে মুনাফা অর্জন যাতে না করা যায় সেজন্য আমদানি সময়মতো করতে হবে। পাশাপাশি টাকার অবমূল্যায়ন কমাতে বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। ক্রমাগত মূল্যস্ফীতির চাপে কোন পক্ষ স্ফীত হচ্ছে, জনগণ তা জানে সরকার কি জানে! সবচেয়ে বড় কথা, জনজীবন থেকে মূল্যস্ফীতির ফাঁড়া কাটুক।