বাংলাদেশ সার্বভৌমত্বে ধাক্কা লাগার মতো বিষয় অনুভব করছে

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর নানা রকম পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে। সম্প্রতি জাতীয় ঐক্য, অন্তর্বর্তী সরকার, জাতীয় সরকার, নির্বাচন, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ইত্যাদি বিষয়ে তিনি কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদকীয় বিভাগের সাঈদ জুবেরী

দেশ রূপান্তর : সম্প্রতি জাতীয় ঐক্যের বিষয় সামনে আসছে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার এ বিষয়ক মিটিংয়ে আপনিও ছিলেন। ঐক্যের ধরন বা এর কোনো রূপরেখা কি আলোচনা হয়েছে আপনাদের?

আমীর খসরু : জাতীয় ঐক্যের কোনো রূপরেখা দেওয়ার তো কোনো প্রয়োজন নেই। কোনো কোনো বিষয়ে জাতীয় ঐক্য তো সব দেশেই থাকে। যেমন যুদ্ধ লাগলে হয়।

দেশ রূপান্তর : আমরা কি তেমন অবস্থায় আছি?

আমীর খসরু : একটা বিষয়ে যেটা হলো বাংলাদেশ এখন সার্বভৌমত্বে ধাক্কা লাগার মতো বিষয় অনুভব করছে। বাংলাদেশে এই যে ধর্মকে নিয়ে পোলারাইজেশন, এটা তো কোনো জাতির জন্য কাম্য হতে পারে না। একটা জাতিকে যখন ধর্মের কারণে বিভক্তির মুখে ফেলা হয় সেটা তো দেশের জন্য বড় ধরনের একটা ধাক্কার মতো। কারণ এই বিভক্তি দেখা দিলে সেই দেশে বাকি সব কিছু আর সেভাবে কাজ করবে না, সব জায়গায় আপনি বাধাগ্রস্ত হবেন।

দেশ রূপান্তর : আমরা তো মাত্র চার মাস আগেই ফ্যাসিস্ট সরকারকে ফেলে দিতে একটা গণ-অভ্যুত্থানে ঐক্যবদ্ধ দেশ দেখতে পেলাম। সেখানে নতুন করে ঐক্যের বার্তা দিতে...

আমীর খসরু : দেশের ভেতরের একটা শক্তির সঙ্গে বাইরের শক্তি মিলে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে এটা তো একটা বড় ধরনের হুমকি। এ রকম ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সবকিছু ক্ষতিগ্রস্ত হবে। রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ সব ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং একটা বিভক্তি তৈরি হবে। যার সমাধান করা খুব কঠিন হবে। এজন্য ঐক্যবদ্ধ হয়ে সেটাকে রুখতে হবে। এই ইস্যুর ওপর ভিত্তি করে আমাদের সবার এক হয়ে কাজ করতে হবে। এই জায়গায় সবাইকে এক সুরে কথা বলতে হবে। আমাদের সবার কাজের মধ্যে এই মেসেজ দিতে হবে যে আমরা একত্র হয়ে কাজ করছি এবং যেসব প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হচ্ছে সে সবের সত্যতা নেই। বহির্বিশ^কেও এই বার্তা দিতে হবে যে জাতিগতভাবে আমরা ঐক্যবদ্ধ।

দেশ রূপান্তর : জুলাই অভ্যুত্থানে আমরা যে ঐক্য দেখেছি, পরবর্তী চার মাসে সেখানে কি কোনো ফাটল তৈরি হয়েছে?

আমীর খসরু : না। অভ্যুত্থানটা তো ছিল স্বৈরাচারকে সরিয়ে দিতে, দেশের মালিকানা ফিরে পেতে, গণতন্ত্র ফিরে পেতে ঐক্য। একটা মুক্ত বাংলাদেশ যেখানে সবাই মুক্তভাবে চলতে পারে সেই ঐক্য। ওই ঐক্য ভাঙার তো কোনো কারণ নেই। আর সেখানে যারা ছিল তারা তো সবাই এক মতাদর্শের না। বিভিন্ন দল, মানুষ সেখানে অংশ নিয়েছেন। সেখানে কোনো সমস্যা নেই।

দেশ রূপান্তর : না, আমরা দেখলাম ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ছাত্রদল পোস্টার লাগাতে গিয়ে হামলার শিকারও হয়েছে...

আমীর খসরু : মুক্ত পরিবেশে তো সবার মধ্যে একটা প্রতিযোগিতা থাকবে। আমি কোনো বিশেষ দলের ব্যাপারে বলতে চাই না। ছাত্রদলের পোস্টার প্রসঙ্গেও তাই। এটা যারা করেছে তাদেরই দায়ভার নিতে হবে। হামলার রাজনীতি বাংলাদেশের মানুষ প্রত্যাখ্যান করেছে। আবারও যারা হামলার রাজনীতি করতে চাইবে তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কোথায় যাবে, তাদের সেটা ভাবা দরকার।

দেশ রূপান্তর : সার্বভৌমত্বের বিষয়ে আপনি যে বললেন...

আমীর খসরু : দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট হলে সেখানে সবার স্বার্থ বিঘিœত হবে, কোনো দল শুধু না, জাতির উদ্দেশ্য বিঘিœত হবে। কোনো বিদেশি শক্তি আক্রমণ করলে তো সবার স্বার্থ বিঘিœত হবে। এসব ক্ষেত্রে একত্রে থেকে ঐক্য রাখতে হবে।

দেশ রূপান্তর : ওই জায়গায় যদি জাতীয় সরকারের প্রয়োজন পড়ে?

আমীর খসরু : এখানে জাতীয় সরকার গঠনের তো প্রয়োজনই নেই। ঐক্যের সঙ্গে সরকার গঠনের কোনো সম্পর্ক নেই। বিভিন্ন দেশে যখন যুদ্ধ লাগে, বিশেষ সিচুয়েশন তৈরি হয় তখন তো সরকার গঠনের বিষয় আসে না, বিষয়টা হলো রাজনৈতিক ঐক্য। আমাদের ঐক্যের মাধ্যমে এর মোকাবিলা করতে হবে। আর বর্তমানে তো অন্তর্বর্তী সরকার। মূলত সরকার গঠন করতে হবে জনগণের ভোটের মাধ্যমে, যার জন্য আমরা ১৬ বছর ধরে যুদ্ধ করছি।

দেশ রূপান্তর : ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের টানাপড়েন চলছে। বিএনপির কোনো কোনো নেতা ভারত বর্জনের ডাকও দিয়েছেন। সার্বিকভাবে আপনি এই পরিস্থিতি কীভাবে দেখছেন?

আমীর খসরু : বয়কটের ডাক হচ্ছে একটা সোশ্যাল মুভমেন্ট, এটায় কোনো রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ আছে বলে আমার জানা নেই। এটা সোশ্যাল মুভমেন্ট এবং এটা জনগণ করতেই পারে।

দেশ রূপান্তর : ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বর্তমান পরিস্থিতির পর্যবেক্ষণটা কী?

আমীর খসরু : এটা তো অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। যেখানে প্রতিবেশী দেশের কিছু রাজনীতিবিদ, সংবাদকর্মী এবং একটা সুশীল সমাজের কিছু লোকজন সবাই মিলে একটা মিথ্যাচারের মাধ্যমে ধর্মকে ব্যবহার করে আমাদের বাংলাদেশে যে বিভাজন সৃষ্টি করছে প্রতিবেশীর থেকে কেউ এটা প্রত্যাশা করে না। কোনো একটা দলকে সমর্থনের ফলে, সেই দল যদি বিতাড়িত হয় তার সেই ক্ষোভ বাংলাদেশের জনগণের বিরুদ্ধে যায়, তাহলে আগামী দিনে সম্পর্কের উন্নয়নের কোনো স্পেসই থাকে না। সুতরাং সেটা তাদের বুঝতে হবে।

দেশ রূপান্তর : আমরা দেখেছি ভারত নাগরিক আইন করার ক্ষেত্রে সরাসরি বাংলাদেশের নাম নিয়েছে। আবার বাবরি মসজিদ, জ্ঞানবাপি মসজিদ থেকে শুরু করে এখন আজমির শরিফ নিয়ে কথা বলছে। এসব জায়গায় বাংলাদেশ প্রতিক্রিয়া দেখায় না কিন্তু তার প্রভাব আমাদের ওপরে পড়ে। আপনার মন্তব্য কী?

আমীর খসরু : এখানে হচ্ছে বাংলাদেশের শক্তি। এই যে বাংলাদেশ নিয়ে তাদের এত প্রভোকেশন বা উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড; তারপর বাবরি মসজিদ, জ্ঞানবাপি মসজিদসহ বিভিন্ন স্থাপনা নিয়ে তারা যা করছে... ভয়ানক অবস্থা। এটা সরাসরি ধর্মীয় বিভাজনের পথ খুলে দিচ্ছে। কিন্তু সৌভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশ থেকে এটার কোনো প্রতিক্রিয়া দেওয়া হয় না। বাংলাদেশের মানুষ এখানে অত্যন্ত পরিপক্বতা, ম্যাচিউরিটির পরিচয় দিয়েছে এবং টলারেন্সের পরিচয় দিয়েছে। এটা কিন্তু একটা জাতির জন্য অনেক বড় শক্তি। আমরা এখানে জাতি হিসেবে নৈতিকভাবে অবস্থান সমুন্নত রাখতে পেরেছি। এটা সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য অনেক বড় শক্তি। যেটাতে আমিও বিস্মিত হয়েছি, এটা বাংলাদেশকে অনেক বড় জায়গায় নিয়ে যাবে।

দেশ রূপান্তর : এর আগে আপনারা ৩১ দফা দিয়েছিলেন। সম্প্রতি সংবিধান সংস্কার কমিশনে আপনারা ৬২ প্রস্তাব দিয়েছেন। প্রশ্ন উঠেছে যেমন উপরাষ্ট্রপতি এবং উপপ্রধানমন্ত্রীর বিষয়টি, যেটা বিএনপিই বাতিল করেছিল। দ্বাদশ সংশোধনীর কথা বলেন অনেকে...

আমীর খসরু : কারণ তো একেবারে পরিষ্কার। আমরা যে আপার হাউজের কথা বলেছি, তাহলে আপার হাউজের স্পিকার কে হবে? আপার হাউজের স্পিকার তো ভাইস প্রেসিডেন্ট। তাহলে আপনার ওই জায়গাটা পূরণ করতে হবে। স্পিকার হিসেবে আমেরিকাতে যেমন ভাইস প্রেসিডেন্ট হয় এখানেও তো সেখানে স্পেস রাখতে হবে। উপরাষ্ট্রপতি বিএনপির আগের সরকারেও ছিল।

দেশ রূপান্তর : নব্বইয়ের দশকে ৩ দলের রূপরেখা তো বিএনপি-আওয়ামী লীগ কেউই মানেনি। এবার যে মানা হবে সেটা কীভাবে আমরা বিশ্বাস করব?

আমীর খসরু : বিশ্বাস-অবিশ্বাসের বিষয়টি যাচাই করে জনগণ। সংস্কার বলেন বা কারেকশন সেটা একটা প্রসেস। ডেমোক্র্যাসি হচ্ছে কারেকশন প্রসেস, ফিল্টারিং প্রসেস। না মানলে জনগণ সেটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। এটা এক নম্বর। দু নম্বর হচ্ছে ৩১ দফা কিন্তু বিএনপি একা করেনি। আমরা যারা যুগপৎ আন্দোলন করেছি- সবাই মিলে এটা করেছি। এখানে বামরা যেমন আছেন, ইসলামিস্টরাও আছেন। সব মিলিয়ে ৫০-এর মতো দল মিলে ৩১ পয়েন্টের কথা বলেছি, এটা বিএনপি একা করেনি। এখানে বলতে পারেন জাতীয় ঐক্যের মতো হয়ে গেছে ৩১ দফার মাধ্যমে। এখন সংস্কার কতটুকু হবে না হবে সেটা সামনে দেখার বিষয়। কিন্তু আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।

দেশ রূপান্তর : এখনো তো জাতীয় সরকারের একটা আলোচনা আছে...।

আমীর খসরু : আমরা গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকার দেখতে চাই। অন্য ধরনের বাকশালি চিন্তা করে তো হবে না। এখন জাতীয় সরকারের চিন্তা যারা করে তারা এ ধরনের ভাবনা করে।

দেশ রূপান্তর : কথা উঠছে আপনারা আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে চান। আবার আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধের প্রশ্নে চিফ অ্যাডভাইজর বিএনপিকে সামনের দিকে ঠেলে দিয়েছেন যে ‘বিএনপি চায় না’। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?

আমীর খসরু : কোনো দলকে চাই বা চাই না এটা আমরা বলিনি। কেউ তো মনগড়া কথা বলতেই পারে। আমরা বলেছি যদি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন তাহলে সবারই নির্বাচনে অংশগ্রহণ দরকার। যেহেতু আমরা গত ফ্যাসিস্ট সরকারের সমালোচনা করেছি, তারা এটা বন্ধ করে দিত, সেটা বন্ধ করে দিত। এই বন্ধ করার বা ক্যান্সেলের রাজনীতিতে আমরা বিশ্বাসী নই। সুতরাং আওয়ামী লীগ যে অপকর্ম করেছে সেটার বিচার বাংলাদেশের জনগণকেই করতে দিতে হবে। তারা যে অন্যায়, অবিচার করেছে সেটার শাস্তি হোক, বিচার হোক। সেই জিনিসটা সুষ্ঠুভাবে করা দরকার বেশি। ইনডাইরেক্টলি যারা সমর্থন দিয়েছে তাদের জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া দরকার। এ কাজগুলো করা দরকার। এ কাজ না করে আপনি এরে ব্যান করা দরকার ওরে ব্যান করা দরকার এসব করে তো লাভ নেই। আমরা তো একটা গণতন্ত্রের কথা বলছি তাই না! আমরা কিন্তু কোনো দলের কথা বলিনি। উনি যে কথাটা বলছেন সেটা সঠিক বলেননি। সুতরাং ওনারা কী করতে চান বা না চান সেটা তো সরকারের সিদ্ধান্ত।

দেশ রূপান্তর : আমাদের রাজনীতিতে তো সমস্যা ও সংকট জিইয়ে রাখা হয়। প্রজন্মের পর প্রজন্মকে তার জের টানতে হয়। যেমন ৭১-এর ঘটনাতেও হয়েছে। আবার ২৪-এর এটাতেও সন্দেহের মধ্যে পড়ছি। আমাদের রাজনীতি কি ক্ষমা চাইবার মতো পরিপক্ব হবে না? 

আমীর খসরু : আসলে এই চ্যাপ্টারটা ক্লোজ করতে হবে। শেখ হাসিনাসহ যাদের নির্দেশে এই গুম, হত্যাকাণ্ড হয়েছে, লুটপাট হয়েছে, যারা বাস্তবায়ন করেছে, যারা সহযোগিতা করেছে তারা আছে, তারপর যারা সরাসরি করেনি কিন্তু ইন্ডাইরেক্টলি সমর্থন দিয়েছে তারা আছে। এখানে তো বিভিন্ন শেড আছে। এখন আপনাকে তো এসব নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতেই হবে একটি জাতি হিসেবে।

দেশ রূপান্তর : নির্বাচন প্রসঙ্গে আসি। সরকারের কাছ থেকে বলা হয় যৌক্তিক সময়। আবার বিএনপি থেকে বলা হয় যে ইনিশিয়ালি কিছু সংস্কার শেষে নির্বাচন। কিন্তু এই শব্দগুলোয় তো ফাঁকফোকর থেকেই যায়। সেক্ষেত্রে নির্বাচনের টাইমফ্রেমটা একটা ধোঁয়াশার মধ্যে পড়ে যায় না?

আমীর খসরু : ব্যাপারটা আমি একদম ক্লিয়ার করে দিচ্ছি। এখানে একটা জিনিস আমি বলতে চাই, আপনি বুঝেও না বোঝার ভান করলে আপনাকে কেউ বোঝাতে পারবে না। যৌক্তিক সময়টা না বোঝার কোনো কারণ নেই। যেকোনো মানুষ সাধারণভাবে যার কিছুটা বুদ্ধি আছে সে যৌক্তিক সময় বুঝে না এটা আমরা কেউ বিশ্বাস করতে রাজি না। দু নম্বর হচ্ছে, আমরা যেটা বলছি, সংস্কারটা অ্যাজ এ হোপ এটা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত সরকারের মাধ্যমে নির্বাচিত পার্লামেন্টের মাধ্যমে সংস্কার করতে হবে। ক্লিয়ার। ইন জেনারেল সংস্কার ইজ অলসো আ প্রসেস অব কারেকশন, ফিল্টারেশন। সুতরাং এটা নির্বাচিত সরকার ছাড়া এটার সুযোগ নেই। স্বচ্ছভাবে নির্বাচন আয়োজনে আমার মনে হয় না কোনো দ্বিমত আছে। এগুলো যত দ্রুত সম্ভব করা যায়। আর অন্য যে বিষয়গুলোতে সংস্কারের ব্যাপারে ঐকমত্য হয়ে গেছে। সেটা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকার কোনো কারণ নেই। তবে অনেকগুলো বিষয়ে ঐকমত্য না হওয়াই স্বাভাবিক। কারণ বিভিন্ন দলের বিভিন্ন চিন্তা আছে, দর্শন আছে, ভাবনা আছে। এখানে তো ঐকমত্য হবে না। সেটা আপনাকে ছেড়ে দিতে হবে জনগণের কাছে। আগামী নির্বাচনে প্রত্যেকটি দলের মধ্যে কে সঠিক তা জনগণই ঠিক করবে।

দেশ রূপান্তর : নির্বাচিত সরকার তো একটি রাজনৈতিক দল হবে। সেক্ষেত্রে বিভিন্ন মতাদর্শের মানুষ আছেন দেশে। ইসলামিস্টরা আছেন, বামেরা ক্ষয়িষ্ণু হলেও আছেন, লিবারেলরা আছেন, সেক্যুলারও আছেন। কিন্তু ভোটের রাজনীতির কারণে গণতান্ত্রিক দল হিসেবে বিএনপি কি এমন কোনো সংস্কার করবে যাতে সে কিছু ভোট হারাতে পারে? এটা তো খুবই জটিল। এই জটিলতা নিয়ে রাজনীতি করেই তো আওয়ামী লীগ বিভাজন বাড়িয়েছে।

আমীর খসরু : আপনি দ্বিমতের কথা বলছেন। এই দ্বিমত রেখে আপনি সংস্কার করতে পারেন না। এর জন্য একমাত্র পথ হচ্ছে গণতন্ত্র। আপনি তো ম্যান্ডেট ছাড়া সংস্কার করতে পারেন না। সংস্কার করতে গেলে তো ম্যান্ডেট লাগবে। কোনো সংস্কারই শতভাগ ঐকমত্যের ভিত্তিতে হবে না। এজন্যই আমরা জনগণের ম্যান্ডেটের কথা বলছি। এ কারণেই আমরা বারবার জাতীয় সরকারের কথা বলছি যেন কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব না থাকে। যেটা আমরা সবাই মিলে তৈরি করেছি, সেটা আমরা সবাই মিলে বাস্তবায়ন করব।

দেশ রূপান্তর : তারেক রহমানের বক্তৃতা বিশেষত তরুণদের মধ্যে বেশ গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। পাশাপাশি আপনাদের দলের নেতৃস্থানীয়রা পজিটিভ কথা বলছেন, যা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের প্রতিচ্ছবির মতো। কিন্তু সংকটের বিষয় হলো প্রান্তিক পর্যায়ে আমরা বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দখলের অভিযোগ পাচ্ছি। দলীয় শৃঙ্খলা ও নিয়ম রক্ষায় কি বিএনপির কোনো সংকট তৈরি হয়েছে অথবা দলের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ যা বলছেন তা কি প্রান্তিক পর্যায়ের নেতাকর্মীরা বুঝতে পারছেন না?

আমীর খসরু : দেখেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে একটা কথা বলত। তারা ক্ষমতা থেকে চলে যাওয়ার পর তাদের সবকিছু দখল হয়ে যাবে। কিন্তু তাদের ক্ষমতা হারানোর পর চারদিন দেশে কোনো সরকার ছিল না। এই সময়ে আওয়ামী লীগের কয়জন মারা গেছেন? যা-ও গেছেন তা ধর্তব্যের মধ্যে নয়। এর জন্য বিএনপিকে কৃতিত্ব দেওয়া উচিত। কারণ বিএনপি একটা বৃহত্তম রাজনৈতিক দল। বিএনপি সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী। ৬০ লাখ মানুষকে যাদের নামে মামলা দেওয়া হয়েছিল আমাদের তারা চুপ করে ছিল। আমাদের নেতাকর্মীদের তারা গুম করেছে, খুন করেছে, পঙ্গু করেছে। বহু লোক পুলিশের হেফাজতেও মৃত্যুবরণ করেছে। জেলখানায় চিকিৎসার অভাবেও অনেকে মারা গেছেন। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া নিজেও মৃত্যুশয্যায় চলে গেছেন। এরপরও বিএনপি যা করেছে, তার জন্য বিএনপিকে কৃতিত্ব দেন না কেন? তবুও যে অভিযোগগুলো আসছে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। বিএনপি এসব অভিযোগে ৫০০-এর ওপরে বহিষ্কার করেছে। সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং বিষয় হলো এগুলো কোনোরকম তদন্ত ছাড়াই করা হয়েছে। এতে বেশকিছু ইনোসেন্ট ছেলেও বাদ পড়েছে। তারেক রহমানকেও বিষয়টি বলা হয়েছে। বিএনপির কিছু কর্মীর দোকান আগে আওয়ামী লীগের নেতারা দখল করে নিয়েছিল। এখন তা ফেরত নিতে গিয়ে তারা ফেঁসে গেছে। এটা যেমন হচ্ছে, আবার কিছু সন্ত্রাসী বিএনপির নাম ব্যবহার করে এগুলো করছে। কিন্তু বিএনপি এ ধরনের সবাইকেই এক্সপেল করেছে। কারণ বিএনপি এখন একটি মেসেজই দিচ্ছে যে, এ ধরনের কোনো খবর পেলেই বহিষ্কার করা হবে। তারেক রহমান সাহেব বলছেন, কেউ যদি নির্দোষ হয়, সেক্ষেত্রে পরে তদন্ত করে আমি তাদের আবার ফিরিয়ে আনব। কিন্তু এখন আমাকে বহিষ্কার করতে হবে।

দেশ রূপান্তর : তারেক রহমান কবে নাগাদ দেশে ফিরবেন। সে বিষয়ে যদি কিছু বলতেন।

আমীর খসরু : সত্যিই গোটা জাতি তারেক রহমানের দেশে ফেরার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। শুধু আমাদের দলের নেতাকর্মীরা নন। অনেকে ওনাকে বলছেন যেভাবে শেখ হাসিনা ওনার সব মামলা প্রত্যাহার করে ফেলেছেন নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে এবং ড. ইউনূসের মামলাও প্রত্যাহার হয়েছে, কিন্তু আপনি সেটা করছেন না কেন? সেক্ষেত্রে উনি বলছেন, আমি তো এত বছর আইনের শাসনের কথা বলেছি। ডিউ প্রসেস অব লয়ের কথা বলেছি। এরপরও যদি আমি ওদের মতো করি, তবে কিছুদিন পর তো মানুষ আমার দিকেও আঙুল তুলে বলবে আমিও অন্যদের মতো করেছি। তাই ওনার কিছু কিছু মামলা নিয়ে কাজ চলছে। ইতিমধ্যে কিছু কাজ শেষও হয়েছে। সব কাজ শেষ হলেই উনি চলে আসবেন।

দেশ রূপান্তর : আপনাকে ধন্যবাদ, স্যার।

আমীর খসরু : আপনাকেও ধন্যবাদ।

অনুলিখন : মোজাম্মেল হৃদয়