দেশ থেকে প্রতি বছর বিভিন্ন দেশে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হচ্ছে। প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এসব অর্থপাচারে জড়িত। এছাড়াও দেশের সরকারি ও বেসরকারি দুই খাতেই দুর্নীতি বেড়েই চলছে। যদিও দুর্নীতি রোধে ২০০৪ সালে গঠন করা হয় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। কিন্তু আইন অনুযায়ী স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হয়েও প্রতিষ্ঠার পর থেকে ক্ষমতাসীন দল সমর্থক সংসদ সদস্য, মন্ত্রী, ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সাহস দেখায়নি দুদক। শুধুমাত্র কিছু দুর্বল প্রকৃতির ও বিরোধীদলীয় ব্যক্তির দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দেখা গেছে সংস্থাটিকে। এতে দুদকের কার্যক্রম নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্ন রয়েছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও আজ সোমবার নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালিত হতে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস। দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধে জনসচেতনতা বাড়াতে প্রতি বছর ৯ ডিসেম্বর এই দিবসটি পালিত হয়।
দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য হচ্ছেÑ ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে তারুণ্যের একতা, গড়বে আগামীর শুদ্ধতা’। দুর্নীতিবিরোধী দিবস উপলক্ষে বেশ কিছু কর্মসূচি হাতে নিয়েছে দুদক।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুদকের মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) মো. আক্তার হোসেন বলেন, দেশে দুর্নীতি দমনে কাজ করছে দুদক। একই সঙ্গে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনসচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন কর্মসূচি চলমান আছে। এরই অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস পালন করা হবে। দিবসটির কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে মানববন্ধন, মিট দ্য প্রেস ও আলোচনা সভা। আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। অনুষ্ঠানে দুদক সচিব খোরশেদা ইয়াসমিন এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানসহ আরও অনেকে বক্তব্য রাখবেন। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল। তথ্য-উপাত্ত বলছে, টানা ১৫ বছরের বেশি সময় ক্ষমতায় থাকাকালে গণআন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত ওই সরকারের একাধিক মন্ত্রী-এমপির বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ গ্রহণ, দুর্নীতি, অর্থপাচার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ ওঠে। কিন্তু দুদক তাদের কারও বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ আমলে নেয়নি। যদিও গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এরই মধ্যে আওয়ামী লীগ সমর্থক এমপি, মন্ত্রী, ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদসহ আড়াইশোর বেশি মানুষের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানে নেমেছে সংস্থাটি। যেসব প্রভাবশালীর বিরুদ্ধে এখন অনুসন্ধান চলছে, তাদের বিষয়ে এর আগে খোঁজ করার সাহস দেখাননি দুদকের শীর্ষ কর্মকর্তারা।
দেশে দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধে দুদকসহ বিভিন্ন সংস্থা কাজ করছে। তারপরও দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না। ঘুষ, দুর্নীতি, নিয়োগ বাণিজ্য, জমি দখল, ঋণ জালিয়াতি, অর্থপাচার ও অর্থ আত্মসাৎসহ নানা ধরনের দুর্নীতির ঘটনা ঘটেই চলছে। দুদকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি বছর সংস্থাটিতে দুর্নীতির ১৪ থেকে ১৫ হাজার অভিযোগ জমা পড়ে। এর মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে ৮০০ থেকে ১ হাজার অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য গৃহীত হয়। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু হয় তারা সাধারণত ক্ষমতার বলয়ের আশপাশের নন। আর যারা বড় বড় দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরুর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। যদিওবা সমালোচনার মুখে কালেভদ্রে হাতেগোনা দু-একজন ক্ষমতাবানের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু হয়, তাও একপর্যায়ে তাদের দুর্নীতির অভিযোগ থেকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়।
এ প্রসঙ্গে দুদকের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুদক স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হলেও কাজের ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এসব সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়ে কাজ করতে হয়। তারপরও দুদক দুর্নীতি প্রতিরোধে অনেক কাজ করে। এখন অনেক প্রভাবশালীর বিরুদ্ধে কাজ হচ্ছে। তবে কমিশনকে আরও সাহস নিয়ে কাজ করতে হবে।’
দুদকের কার্যক্রম নিয়ে ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে টিআইবি। তাতে অনুসন্ধান, তদন্ত ও মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে দুদকের দক্ষতার ঘাটতির বিষয়টি উঠে আসে। এসব ঘাটতি পূরণে ১৬টি সুপারিশ করে টিআইবি।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, দুদকের প্রতিরোধ, শিক্ষা ও আউটরিচ কার্যক্রম সন্তোষজনক হলেও অনুসন্ধান, তদন্ত ও মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে অগ্রগতি আশাব্যঞ্জক নয়। অনুসন্ধান, তদন্ত এবং মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, দুর্নীতির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দুদকের সাড়া প্রদানের হার কম হওয়ার একটি কারণ হচ্ছে অভিযোগ বাছাই ব্যবস্থা।
গবেষণা অনুযায়ী, স্বাধীনতা ও মর্যাদার প্রশ্নে দুদককে পর্যাপ্ত স্বাধীনতা দেওয়া আছে এবং আইনে কার্যক্রম সম্পর্কে বিশদভাবে বলা হয়েছে। তবে কার্যক্রম ও ক্ষমতার ব্যবহারের ক্ষেত্রে এর স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। টিআইবি মনে করে বিরোধী রাজনৈতিক দলের সদস্যদের বিরুদ্ধে বেশিরভাগই তদন্ত চলে বলে সাধারণের মধ্যে ধারণা রয়েছে। এর পাশাপাশি বিভিন্ন দুর্নীতিপ্রবণ প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রতিবেদন তৈরি ও সুপারিশ করলেও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার ক্ষমতা দুদকের নেই। এছাড়া কিছু ক্ষেত্রে সরকারের বিরূপ প্রতিক্রিয়া এড়ানোর জন্য দুদক নিজস্ব ধারণাপ্রসূত হয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করা থেকে বিরত থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে।