ফল পরিবর্তনে মানুষের আস্থা হারাচ্ছে বোর্ড

গত ১৫ অক্টোবর এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়। পাসের হার ৭৭.৭৮ শতাংশ। এগারোটি শিক্ষা বোর্ডে এবার জিপিএ ৫ পেয়েছেন ১ লাখ ৪৫ হাজার ৯১১ জন শিক্ষার্থী। প্রকাশিত ফলে কারও প্রত্যাশিত ফল না এলে তাকে পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন বা উত্তরপত্র চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ দেয় শিক্ষা বোর্ডগুলো।  সে অনুযায়ী গত ১৬ অক্টোবর থেকে এ কার্যক্রম শুরু হয় এবং তা চলে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত। ১৪ নভেম্বর খাতা চ্যালেঞ্জের ফল প্রকাশিত হয়, তাতে দেখা যায় প্রতি বছরের মতোই ফলাফলে বিরাট পরিবর্তন, এমনকি ফেল করা শিক্ষার্থীও জিপিএ ৫ পেয়ে গেছেন।

এইচএসসি পরীক্ষার খাতা পুনঃনিরীক্ষণে ঢাকা বোর্ডে ফেল থেকে পাস করেছেন ১৩৭ জন শিক্ষার্থী। আর নতুন জিপিএ ৫ পেয়েছেন ২০০ জন পরীক্ষার্থী। ঢাকা বোর্ডের ৫৯ হাজার ৬৭৮ জন পরীক্ষার ফল পুনঃনিরীক্ষার আবেদন করেছিলেন। তাদের মধ্যে এক হাজার ৩১৯ জনের ফল পরিবর্তন হয়েছে। এবার ফেল থেকে এ  বোর্ডে একজন পরীক্ষার্থী জিপিএ ৫ পেয়েছেন। খাতা চ্যালেঞ্জ করে চট্টগ্রাম বোর্ডে ফেল থেকে পাস করেছেন ১০১ জন শিক্ষার্থী। আর নতুন জিপিএ ৫ পেয়েছেন ৬১ জন। কুমিল্লা বোর্ডে ফেল থেকে পাস করেছেন ৯৩ জন। নতুন জিপিএ ৫ পেয়েছেন ৩৬ জন। দিনাজপুর বোর্ডে ফেল থেকে পাস করেছেন ২৪ জন। নতুন জিপিএ ৫ পেয়েছেন ১২ জন পরীক্ষার্থী। বরিশাল বোর্ডে ফেল থেকে পাস করেছেন একজন । আর নতুন জিপিএ ৫ পেয়েছেন ২৯ জন পরীক্ষার্থী। এ বোর্ডের ৭ হাজার ২১ জন পরীক্ষার্থী ফল পুনঃনিরীক্ষার আবেদন করেছিলেন। তাদের মধ্যে ৮৯ জনের ফল পরিবর্তন হয়েছে। ময়মনসিংহ বোর্ডে ফেল থেকে পাস করেছেন ৫৯৯ জন শিক্ষার্থী। আর নতুন জিপিএ ৫ পেয়েছেন ৩২৩ জন। ফেল থেকে জিপিএ ৫ পেয়েছেন একজন। যশোর বোর্ড থেকে পাস করেছেন ২৭ জন। নতুন জিপিএ ৫ পেয়েছেন ১৭ জন। রাজশাহী বোর্ডে ফেল থেকে পাস করেছেন ৯ জন, নতুন জিপিএ ৫ পেয়েছেন ১৪ জন পরীক্ষার্থী। সিলেট বোর্ডে ফেল থেকে পাস করেছেন ১৫ জন শিক্ষার্থী। আর নতুন জিপিএ ৫ পেয়েছেন ৭ জন শিক্ষার্থী। আলিম পরীক্ষার খাতা পুনঃনিরীক্ষণে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে ফেল থেকে পাস করেছেন ১০ জন শিক্ষার্থী। আর নতুন জিপিএ ৫ পেয়েছেন ৬ জন পরীক্ষার্থী। এ বোর্ডের ২ হাজার ৭১৪ জন খাতা পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করেছিলেন। তাদের মধ্যে ৩৬ জনের ফল পরিবর্তন হয়েছে। গত বছর অর্থাৎ ২০২৩ সালে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার খাতা চ্যালেঞ্জ করে পাস করেছিলেন ফেল করা ১ হাজার ৩৯৮ জন পরীক্ষার্থী। নতুন করে জিপিএ ৫ পেয়েছিলেন ৫৮৫ জন। গত বছরও ফেল করার পর জিপিএ ৫ পেয়েছিলেন ১ জন।

 বোর্ড পরীক্ষার পর ফলের পরিবর্তন প্রতি বছর যেভাবে হচ্ছে তাতে বোর্ডের ওপর শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের আস্থা দিন দিন কমতে শুরু করেছে। বিষয়টি এমন মনে হচ্ছে যে, বোর্ড পরীক্ষা মানেই এ ধরনের ভুল হবে আর দরখাস্ত করলে ফল পরিবর্তন হবে। পরীক্ষকদের খাতা মূল্যায়নে অবহেলার বিষয়টি স্বীকার করে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা বোর্ড চেয়ারম্যান বলেন, আমরা প্রত্যেক বছরই পরীক্ষকদের ত্রুটি-বিচ্যুতি পাই।

শিক্ষা বোর্ডগুলোর মধ্যে এক ধরনের অসহায়ত্ব প্রতীয়মান হচ্ছে। বোর্ড পরীক্ষার খাতা যারা মূল্যায়ন করতে পারেন অর্থাৎ দেশের স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মেধাবী ও অভিজ্ঞ শিক্ষক যারা, তাদের অধিকাংশই সাধারণত বোর্ডের খাতা মূল্যায়নে অংশগ্রহণ করেন না। তার দুটি কারণ, একটি হচ্ছে বোর্ডের খাতা মূল্যায়নে যে পরিমাণ পারিশ্রমিক দেওয়া হয় সেটি তাদের ক্ষেত্রে অপ্রতুল। দ্বিতীয়ত, নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা প্রাইভেট পড়ানো, বিভিন্ন জায়গায় ক্লাস ও সেশন পরিচালনা করে ভালো অর্থ উপার্জন করেন। তারা খাতা মূল্যায়নের জন্য অতিরিক্ত সময় দিতে চান না। আবার অনেকে যারা খাতা আনেন তারাও খুব আন্তরিকতার সঙ্গে খাতা মূল্যায়ন করেন না। ফলে, শিক্ষা বোর্ডগুলোকে এমন সব পরীক্ষকের প্রতি নির্ভর করতে হয় যারা খাতা মূল্যায়ন করতে জানেন না, যাদের মধ্যে রয়েছে সততার অভাব এবং অনেক ক্ষেত্রেই অনভিজ্ঞ শিক্ষকদের দ্বারা খাতা মূল্যায়ন করাতে হয়।

শিক্ষাক্ষেত্রে, শিক্ষাদানে ও মূল্যায়নে বহু পরিবর্তন ঘটেছে গোটা বিশ্বে। কিন্তু আমাদের শিক্ষা বোর্ডগুলো সেসব পরিবর্তনের সঙ্গে কতটা পরিচিত, কতটা খাপ খাওয়াতে অভ্যস্ত সেটি প্রশ্নসাপেক্ষ। সেই মান্ধাতার আমলের মতোই খাতা মূল্যায়ন হচ্ছে, প্রশ্নপ্রত্র তৈরি হচ্ছে, শিক্ষকদের প্রস্তুতি ছাড়াই খাতা মূল্যায়ন করানো হচ্ছে। বরং রেজাল্ট তাড়াতাড়ি দেওয়ার জন্য খাতা যেনতেন প্রকারে মূল্যায়ন করার একটি ট্র্যাডিশন বেশ কয়েক বছর থেকে লক্ষ করা যাচ্ছে। আগে বোর্ড পরীক্ষার ফল দিত কমপক্ষে তিন মাস পর, আর এখন দুমাসের কম সময়ের মধ্যে ফল দেওয়ার হিড়িক যা প্রকৃতপক্ষে ভালো কোনো কিছু বয়ে আনে না।

খাতা মূল্যায়ন করা যে কোনো ধরনের কাজের চেয়ে পুরো আলাদা, এটি একটি মহত্তম দায়িত্ব, সেটি তাদের মনেপ্রাণে বুঝাতে পারা বোর্ডের কাজ। এখানে শুধু অর্থ উপার্জন আর স্বল্প সময়ে খাতা মূল্যায়ন করাটাই মূল বিষয় নয়। আর এগুলো করার জন্য বোর্ড কর্তৃপক্ষকে ইনোভেটিভ ওয়েতে প্রতি বছর চিন্তাভাবনা করতে হয়। কিন্তু তারা কি সেটি করেন? প্রতিটি সিদ্ধান্তের জন্য তারা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আমলাদের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে থাকেন, যদিও তাদের মূল্যায়ন বিষয়ে অভিজ্ঞতা নেই, থাকার কথাও নয়। শিক্ষা বোর্ডগুলো স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান কিন্তু কাজের ক্ষেত্রে স্বায়ত্তশাসনের তেমন কিছু দেখা যায় না।

একটি বিষয়ের খাতা মূল্যায়নের জন্য কমপক্ষে তিনজন পরীক্ষক থাকা প্রয়োজন। তিনজন পরীক্ষক খাতা দেখলে সবাই তটস্থ থাকবেন, সবাই সিনসিয়ারলি খাতা মূল্যায়ন করবেন এবং সে পদ্ধতির মাধ্যমে ফল তৈরি করাটা হবে জেনুইন। অর্থাৎ একজন শিক্ষার্থী যে গ্রেড পাবেন, যে নম্বর পাবেন সেটির ওপর সবাই আস্থা রাখতে পারবেন। পরবর্তী স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও বোর্ড পরীক্ষার ফলের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখতে পারবে। এখন যেটি হয়, কারোরই কোনো আস্থা নেই। ভর্তি  ও চাকরির ক্ষেত্রে কেউই ঐ ফলকে বিশ্বাস করে না, সবাই পুনরায় শিক্ষার্থীদের বাজিয়ে দেখতে চায়। বোর্ডগুলো এখানো নতুন কোনো পদ্ধতি আবিষ্কার করেনি। তারা সেই পরীক্ষক আর প্রধান পরীক্ষক ছাড়া নতুন কোনো পদ্ধতিতে উত্তরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে নতুনত্ব দেখাতে পারেনি।

লেখক : শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক

masumbillah65@gmail.com