‘কালো মেঘ’ সরে যাক

বাংলাদেশ ও ভারত কেবল প্রতিবেশীই নয়, দেশ দুটির মধ্যে দীর্ঘদিনের গভীর সম্পর্কের ইতিহাস রয়েছে। দেশভাগের ফলে বাংলাভাষীরা সীমান্তের দুই পাড়ে ভাগ হয়ে গেলেও ভাষা, সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের কারণে তাদের বিভাজন করা কঠিন। মহান মুক্তিযুদ্ধেও ভারতের ভূমিকা আমরা জানি। অন্যদিকে, বাংলাদেশ ভারতের জন্য বিশাল এক বাজার। তদুপরি, চিকিৎসা ও পর্যটন বাবদ বড় অংশের বাংলাদেশি প্রতি বছর ভারতে যায়, যা দেশটির অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অবশ্য, ভারতের সম্প্রসারণবাদ নীতি, ধর্মীয় রাজনীতি, সীমান্তের হত্যাকান্ড, অভিন্ন নদীর ন্যায্য পানিবণ্টন না করার মতো বিষয় অনেকদিন ধরেই দেশ দুটির সম্পর্কের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করেছে। প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশ মাঝে মাঝেই ভারতের আচরণে এক ধরনের অস্বস্তিকর কর্র্তৃত্ববাদ টের পেয়েছে, যা কাক্সিক্ষত নয়।

তবে, অবস্থার মারাত্মক অবনতি হয়েছে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর। হাসিনাকে ভারত আশ্রয় দিয়েছে, বাংলাদেশের মানুষকে ভারতের ভিসা দেওয়া প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে, ভারতের গণমাধ্যমগুলো বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ব্যাপক আকারে অপতথ্য প্রচার করে যাচ্ছে এবং সম্প্রতি এসব অপতথ্যের জেরে বাংলাদেশকে নিয়ে সে দেশের রাজনীতিবিদরা নানা রকম হুমকি-ধমকি দিয়েছে। উগ্র জনতার দাবিতে বাংলাদেশের সঙ্গে থাকা কিছু বন্দরের কার্যক্রম স্থগিত রেখেছে এবং এমনকি আগরতলায় বাংলাদেশের হাইকমিশনেও হামলা করা হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে, বাংলাদেশ সফরে এসেছেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি। তিনি জানিয়েছেন তার দেশ বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে গভীরভাবে কাজ করতে আগ্রহী। দুদেশের সম্পর্ক ইতিবাচক ও গঠনমূলক দিকে যাবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তিনি। অন্যদিকে ভারতের গণমাধ্যমের অপতথ্য নিয়ে ভারত সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব জসীম উদ্দিন বলেছেন, ‘বাংলাদেশে বসবাসরত সব মানুষ স্বাধীনভাবে ধর্মচর্চা করে আসছে এবং এ বিষয়ে কোনো ধরনের বিভ্রান্তি এবং অপপ্রচারের সুযোগ নেই।’ এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার সরেজমিনে বাস্তব অবস্থা দেখার ও পর্যবেক্ষণ করতে বিদেশি সাংবাদিকদেরও আহ্বান জানিয়েছে। জসীম উদ্দিনের কথাতে মৈত্রীর আহ্বান থাকলেও তাতে কড়া বার্তারও ইঙ্গিত ছিল। তিনি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অন্য দেশের মন্তব্য করা সমীচীন নয় বলে বার্তা দিয়েছেন। ভারতে অবস্থানরত হাসিনার উসকানিমূলক বার্তা বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার পছন্দ করছে না বলেও তিনি স্পষ্টভাবে ভারতের সচিবকে জানিয়ে দিয়েছেন।

সীমান্তে হত্যা, অভিন্ন নদীগুলোর পানি, বিশেষত তিস্তা চুক্তি নিয়ে আলাপ করেছেন দুদেশের সচিব। আন্তঃসীমান্ত অপরাধ, মাদক পাচারসহ অন্যান্য অপরাধমূলক কার্যক্রম নির্মূলে সহযোগিতাসহ সীমান্ত সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা সমাধানের কথা উঠেছে। ভারতে বাংলাদেশিদের ভিসাপ্রাপ্তি আরও সহজ করার জন্য ভারত সরকারকে অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ। প্রায় তিন ঘণ্টার বৈঠকে দুদেশের বাণিজ্য, আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে বাধাগুলো দূরীকরণ, ভারতসহ নেপাল ও ভুটান থেকে জলবিদ্যুৎ আনার বিষয়েও ভারতের ভূমিকার কথা উঠে আসে। এ অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় এবং রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে ভারতকে সহযোগিতার আহ্বান জানানো হয়। সাম্প্রতিক সময়ে দুদেশের মধ্যে কিছু দুঃখজনক ঘটনার কথা জানিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ‘ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক এবং কূটনীতি নিয়ে আক্রমণের বিষয়ে আমরা আলোচনা করেছি। আমরা সার্বিকভাবে উভয়পক্ষের মধ্যে গঠনমূলক মনোভাব চাই। আমরা অপেক্ষায় আছি, আমাদের সম্পর্ক একটা ইতিবাচক দিকে এগিয়ে যাবে।’ ভারতের গণমাধ্যমে বাংলাদেশ বিষয়ক অপপ্রচারে ভারত সরকারের কোনো হাত নেই এবং তারা তা ধারণও করেন না।

এ ছাড়াও প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে এক ৪০ মিনিটের বৈঠকে ভারতীয় সচিব সংখ্যালঘু ইস্যু, অপতথ্য প্রচার, ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে আলোচনা করেন। ইউনূস বলেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে দুই প্রতিবেশীর সম্পর্কে কিছু মেঘ জমে ছায়া তৈরি করেছে। এই ‘কালো মেঘ’ মুছে ফেলতে ভারতের সাহায্য চেয়েছেন তিনি। আমরা মনে করি, বাংলাদেশ ও ভারতের যে সম্পর্ক, তাতে এই কালো মেঘ দীর্ঘস্থায়ী হওয়া খুবই শঙ্কাজনক। পারস্পরিক উষ্ণ ও কার্যকর আলোচনার মাধ্যমে এই মেঘ অতিসত্বর সরিয়ে ফেলা অত্যাবশ্যক।