বাণিজ্য উপদেষ্টা সেখ বশির উদ্দিন বলেছেন, ১৫ বছরে ২৮ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে বলে শে^তপত্রে উঠে এসেছে। পাচারের নিয়ামক হিসেবে দেশের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগুলো ধ্বংস করা হয়েছে। বিগত সরকারের আমলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে যেভাবে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে, তার একটা প্রকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে সরকারি প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর পল্টনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) কার্যালয়ে আয়োজিত ইআরএফ-প্রাণ মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড ২০২৪ প্রদান অনুষ্ঠানে উপদেষ্টা এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে আরও অতিথি ছিলেন প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী আহসান খান চৌধুরী এবং অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।
টিসিবি কার্ডে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে উল্লেখ করে বাণিজ্য উপদেষ্টা আরও বলেন, টিসিবি সারা দেশে যে কার্ডের মাধ্যমে এক কোটি পরিবারের মধ্যে ভর্তুকিমূল্যে খাদ্যপণ্য বিতরণ করে, সেটি সুন্দর একটি প্রকল্প। তবে বিগত সরকারের সময়ে এই কার্ড বিতরণ এবং ডিলার নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। বর্তমান সরকার এসব অনিয়মকে চিহ্নিত করতে কাজ করছে। তিনি বলেন, টিসিবির জন্য বছরে সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকার একটি বাজেট রয়েছে। টিসিবিকে সরকার সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি ভর্তুকি দিয়ে থাকে।
টিসিবির ধ্বংসের পেছনে অসংগতি আছে উল্লেখ করে উপদেষ্টা সেখ বশির আরও বলেন, ‘আপনারা শুনে অবাক হবেন, সারা দেশে টিসিবির ১৬টি অফিস রয়েছে; যাতে ড্রাইভার-দারোয়ানসহ সব মিলিয়ে ১৪২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। এ জনবল ও কার্যক্রমের জন্য ১১ হাজার কোটি টাকার বাজেট থাকার বিষয়টি হাস্যকর।’
তিনি জানান, ইতিমধ্যে এক কোটি পরিবারের কার্ডের মধ্যে ৫৬ থেকে ৫৭ লাখ কার্ডধারীকে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। বাকি কার্ডগুলো বাদ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পুরনো কার্ডের পরিবর্তে নতুন স্মার্ট কার্ড আনা হয়েছে।
বিগত সরকারের সময়ে ‘সাগর চুরি’ করতে গিয়ে সব প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন বাণিজ্য উপদেষ্টা। তিনি বলেন, এর হাত থেকে কিছুই বাদ রাখা হয়নি। প্রতিটি জায়গায় গুটিকয় মানুষের একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরি করা হয়েছিল। কৃষিতে গর্ব করার মতো আমাদের অনেক অর্জন রয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের ফলে এখন কৃষি বা অন্যান্য খাতের তথ্যে অসামঞ্জস্যতার কারণে সিদ্ধান্ত গ্রহণে জটিলতা হয়।
বাণিজ্য উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘তেল বা চিনির বাজারে মুষ্টিমেয় কয়েকজন স্থানীয় আমদানিকারক রয়েছেন। এর মধ্যে একজন তেল আমদানির সর্ববৃহৎ লোক দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন, যিনি বাজারের একটা বৃহৎ অংশ এবং আট-দশটা ব্যাংকও নিজে ম্যানেজ করতেন। এই যে দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার ফলে একটা সরবরাহ-ঘাটতি তৈরি হয়েছে, ওই তুলনায় কিন্তু আপনারা বাজারে রি-অ্যাকশন টের পাচ্ছেন না।’
বর্তমান বাস্তবতা মেনে তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আগামী রমজানে খেজুর, ছোলা, তেলসহ অন্যান্য পণ্যের দাম স্থিতিশীল থেকে নিম্নগামী থাকবে বলে আশা করছি। আলুর ক্ষেত্রে আমাদের একটু ব্যর্থতা আছে। তবে আগামী বছর যেন এমন পরিস্থিত না হয়, সেজন্য বর্তমান থেকে শিক্ষা নিয়ে কাজ করছি।’
বর্তমানে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে প্রতিবেশী দেশের কিছু গণমাধ্যম প্রচারণা চালাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, ‘ভুল তথ্য শুধু বাইরে থেকে আসছে তা নয়, দেশের সাংবাদিকরাও অনেক ক্ষেত্রে সঠিক তথ্য তুলে ধরতে ব্যর্থ হচ্ছেন। দেশে এখনো দুই ডিজিটের মূল্যস্ফীতি রয়েছে, এটা ঠিক। কিন্তু অনেক জিনিসপত্রের দাম আগের তুলনায় কমছেও। প্রতি রাতে যে টক শো হয়, যে নিউজ হয়, সেখানে কিন্তু এ বিষয়গুলো দেখছি না। এসব ক্ষেত্রে এক ধরনের সরলীকরণ করা হচ্ছে।’
অনুষ্ঠানে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আহসান খান চৌধুরী বলেন, ‘পণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে অবশ্যই উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়াতে হবে। ডিমের দাম কমিয়ে আনার একমাত্র উপায় হচ্ছে উৎপাদন বাড়ানো। প্রাণিখাদ্যের দাম কমানো গেলে ফার্মের মুরগি ও ডিমের দাম আরও কমবে।’ ফসল উৎপাদন ও রপ্তানিতেও বাংলাদেশের অনেক সম্ভাবনা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘রপ্তানি বাড়াতে হলে আমাদের মূল্য সংযোজনকারী ফসলের দিকে নজর দিতে হবে।’
দেশের অর্থনীতি খাতের প্রতিবেদকদের সংগঠন ইআরএফ এ বছর তিনটি ক্যাটাগরিতে পুরস্কার দিয়েছে। এর মধ্যে প্রিন্ট ক্যাটাগরিতে পাঁচজন, অনলাইনে দুজন এবং টেলিভিশন ক্যাটাগরি থেকে তিনজন পুরস্কার পেয়েছেন।
প্রিন্ট ক্যাটাগরিতে যৌথভাবে প্রথম হয়েছেন আমাদের সময়ের সিনিয়র রিপোর্টার জিয়াদুল ইসলাম ও সময়ের আলোর বিজনেস এডিটর আলমগীর হোসেন। এই ক্যাটাগরিতে যৌথভাবে দ্বিতীয় হয়েছেন দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের দুই বিশেষ প্রতিনিধি জসিম উদ্দিন হারুন ও এফএইচএম হুমায়ূন কবির। তৃতীয় পুরস্কার পেয়েছেন কালের কণ্ঠের সিনিয়র রিপোর্টার সাহানোয়ার সাইদ শাহীন। অনলাইন ক্যাটাগরিতে প্রথম হয়েছেন জাগোনিউজ২৪.কম-এর চিফ রিপোর্টার ইব্রাহিম হোসেন অভি এবং দ্বিতীয় হয়েছেন যুগান্তরের সিনিয়র রিপোর্টার মিজানুর রহমান চৌধুরী। এ ছাড়া টেলিভিশন ক্যাটাগরিতে প্রথম হয়েছেন যমুনা টেলিভিশনের সিনিয়র রিপোর্টার তৌহিদ হোসেন পাপন এবং দ্বিতীয় হয়েছেন যৌথভাবে একুশে টিভির সিনিয়র রিপোর্টার তৌহিদুর রহমান ও ইনডিপেনডেন্ট টিভির সিনিয়র রিপোর্টার হরিপদ সাহা।