অযাচিত এবং অতিরিক্ত ব্যয় কমবে

নতুন বিদ্যুৎ নীতিতে সরাসরি গ্রাহকের কাছে বিক্রির জন্য বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের যে পরিকল্পনা, নিঃসন্দেহে একটি ভালো উদ্যোগ। ফলে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির চাপ যেমন কমবে, তেমনি দুর্নীতিও কমে আসবে। তবে গ্রাহক স্বার্থ যাতে অক্ষুণœ থাকে সেই বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে সরকারকে।

বর্তমানে দেশের সব বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে চুক্তি অনুসারে নির্ধারিত দামে সব বিদ্যুৎ কিনে নেয় বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। এক্ষেত্রে বেশি দামে কিনে সরকার নির্ধারিত কম দামে বিদ্যুৎ বিক্রি করে বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার কাছে। বিতরণ সংস্থাগুলো তাদের ব্যয় ও মুনাফা যোগ করে সরকার নির্ধারিত দামে গ্রাহকের কাছে বিক্রি করে। বেশি দামে কিনে কম দামে বিদ্যুৎ বিক্রির ফলে পিডিবিকে লোকসান গুনতে হয়, যা ভর্তুকি হিসেবে দেয় সরকার। বছর শেষে নতুন বছর আসে আর এই ভর্তুকির পরিমাণও বাড়তে থাকে। এই অবস্থা থেকে বের হতে সম্প্রতি এক সেমিনারে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেছেন, বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে তার পুরোটা সরকারের কাছে বিক্রির মডেল অনেক পুরনো। বেসরকারি খাতে নতুন করে ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার (আইপিপি) বিদ্যুৎকেন্দ্র করা হবে না। মার্চেন্ট বিদ্যুৎ নীতি করা হচ্ছে। এতে সরাসরি গ্রাহকের কাছে বিক্রির জন্য বিদ্যুৎকেন্দ্র হবে। সরকারের এমন উদ্যোগে ভর্তুকি কমলেও গ্রাহকের বিদ্যুৎ ব্যবহারের ব্যয় বাড়বে বলে অনেকে ধারণা করছেন। প্রকৃত হিসাব না করে এটি বলা আসলেই মুশকিল। এই বিতর্কের আগে পিডিবির লোকসান এবং সরকারের ভর্তুকির বিষয় নিয়ে পর্যালোচনা করা জরুরি।

বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের পেছনে পিডিবির ব্যয় হচ্ছে গড়ে প্রায় ১১ টাকা। বিতরণ সংস্থাগুলোর কাছে এই বিদ্যুৎ ৭ টাকা ২ পয়সায় বিক্রি হচ্ছে। তার মানে ইউনিট ঘাটতি প্রায় ৪ টাকার মতো। এই যে ৪ টাকা লোকসান তার পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। বেশ কয়েক বছর ধরেই দেশে চাহিদার অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। ফলে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র অলস বসে থাকছে লম্বা সময় ধরে। বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেও চুক্তি অনুযায়ী এসব কেন্দ্রে নিয়মিত ক্যাপাসিটি চার্জ বা কেন্দ্র ভাড়া দিতে হচ্ছে। এ বাবদ গত দেড় দশকে দেড় লাখ কোটি টাকারও বেশি ব্যয় হয়েছে। শুরুর দিকে কিছুটা কম ব্যয় হলেও এখন বছরে অন্তত ৩০ হাজার কোটি টাকা চলে যাচ্ছে কেন্দ্র ভাড়ার পেছনে। বিপরীতে বিদ্যুতে এখন প্রতি বছর সরকারকে ভর্তুকি দিতে হয় প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা।

প্রয়োজন নেই জেনেই সক্ষমতার অতিরিক্ত এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে মূলত রাজনৈতিক, ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থ রক্ষায়। এখানে গ্রাহক স্বার্থ বিবেচনা করা হয়নি। গ্রাহকের কাছে সরাসরি বিদ্যুৎ বিক্রি করা হলে বিপুল পরিমাণ লোকসান কমে আসবে। কারণ এখানে গ্রাহক নিজেই তার স্বার্থকে প্রাধান্য দেবে। ফলে কেন্দ্রের মালিককে বিদ্যুৎ উৎপাদন করেই গ্রাহকের কাছ থেকে টাকা নিতে হবে। এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পরিমাণ বিদ্যুৎ বেচাকেনার শর্ত থাকতে পারে দুপক্ষের মধ্যে। তাতেও পিডিবির মতো এত অস্বাভাবিক লোকসান হবে না।

দ্বিতীয়ত, একটি নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন পাওয়া থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পরিচালনায় ব্যাপক ঘুষ-দুর্নীতি ও অর্থের তছরুপ হওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এর প্রমাণও মিলেছে। এমনকি উৎপাদিত বিদ্যুতের ট্যারিফ বা পিডিবির কাছে বিক্রির দরও বাড়িয়ে দেওয়া হয় তথাকথিত কমিশনের বিনিময়ে। এসব ঘুষ-দুর্নীতি আর কমিশন বাণিজ্যের কারণেও পিডিবির লোকসান বাড়ছে। সরকারি গ্রাহক বিদ্যুৎ কিনলে এই অনিয়ম-দুর্নীতি যে অনেকখানি কমে আসবে তা জোর দিয়ে বলা যায়।

তৃতীয়ত, পিডিবি বিদ্যুৎ বিক্রি করে লোকসান করলেও রাষ্ট্রায়ত্ত বিতরণ কোম্পানিগুলো কিন্তু তাদের মুনাফা যোগ করেই গ্রাহকের কাছে তা বিক্রি করছে। সরকারি বিদ্যুৎ বিক্রির সুযোগ মিললে বিতরণ কোম্পানির এই মুনাফার আর প্রয়োজন পড়বে না।

চতুর্থত, পিডিবির সঙ্গে বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকদের বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির সময় গ্রাহক স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে নানাজনের স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার ফলেও কিন্তু উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। কিন্তু একজন গ্রাহক যখন সরাসরি কোনো কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনবেন তখন তিনি দরদাম ভালোভাবে যাচাই করেই কিনবেন। এখানে তৃতীয় পক্ষের স্বার্থ না থাকায় তিনি তুলনামূলক সাশ্রয়ী দামেই বিদ্যুৎ কিনতে পারবেন।

পঞ্চমত, একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে বিনিয়োগের ওপর বিনিয়োগকারীর নির্ধারিত মুনাফার পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত জ্বালানি, ব্যাংক ঋণের ওপর সুদ, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, কর্মীদের বেতন-ভাতা ও আনুষঙ্গিত ব্যয় যোগ করে বিদ্যুতের প্রকৃত ট্যারিফ বা দর নির্ধারিত হয়। মুনাফার বাইরে যেসব খাত রয়েছে সেখানে প্রকৃত ব্যয় যোগ করার নিয়ম থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব ব্যয় বেশি করে দেখিয়ে পিডিবির কাছ থেকে বাড়তি মুনাফা আদায় করে থাকে কেন্দ্রের মালিকরা। কিন্তু সরাসরি গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করা হলে অযাচিত ও অতিরিক্ত ব্যয় কমে আসবে।

ষষ্ঠত, বিদ্যুৎ খাতে লোকসান সামাল দিতে সরকার পিডিবিকে যে ভর্তুকি দেয় তা কিন্তু সাধারণ মানুষের পকেট থেকেই কোনো না কোনোভাবে নেওয়া হয়। আবার ভর্তুকি কমাতে প্রায় প্রতি বছরই বিদ্যুতের যে মূল্য বৃদ্ধি করে সরকার সেই ব্যয়ের চাপও কিন্তু ভোক্তাকেই বহন করতে হয়। এর পাশাপাশি পিডিবির অনেক পুরনো বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে সেগুলোও এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে সরকারের। কারণ অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকে আবার অনেক কেন্দ্রের সক্ষমতা কমেছে। পুরনো এসব কেন্দ্র ধাপে ধাপে বন্ধ করে দিলেও কিন্তু পিডিবির অনেক লোকসান কমে আসবে।

সরাসরি বিদ্যুৎ বিক্রির সুযোগ ভোক্তার জন্য যে মঙ্গলজনক তার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো সৌরবিদ্যুৎ। বর্তমানে বিভিন্ন কারখানার ছাদে বেসরকারি উদ্যোগে দুপক্ষের চুক্তির ভিত্তিতে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করে যে বিদ্যুৎ বিক্রি হচ্ছে সেখানে গ্রিড বিদ্যুতের চেয়ে প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কম দামে বিদ্যুৎ পাচ্ছেন গ্রাহক। তাতেও কিন্তু কেন্দ্রের মালিক মুনাফা করছে। ফলে সরাসরি বিদ্যুৎ বিক্রি করা হলে ভোক্তা-উদ্যোগক্তা দুপক্ষই লাভবান হবেন। তবে এক্ষেত্রে সরকারের কঠোর মনিটরিং দরকার, যাতে কেউ কারও কাছে জিম্মি না হয়ে পড়েন কিংবা কোনোভাবে ক্ষতির শিকার না হন।

লেখক: সাংবাদিক ও প্রকৌশলী

likhon.duet@gmail.com