সরকারের খরচ কমবে জনগণের বাড়বে 

স্বাভাবিক জীবনযাপনের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ নিজস্ব আয় বৃদ্ধির সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যমূল্যের ক্রমাগত বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না। মূল্যবৃদ্ধির অস্থিরতায় ভুগছে দীর্ঘদিন। এরইমধ্যে জানা গেল, ভর্তুকি কমাতে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র সরাসরি গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করবে। এর ফলে খুব সহজেই একটি বিষয় আন্দাজ করা যায়, এমন সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার পর বিদ্যুতের দাম আবার বাড়বে। এর কারণ বিশ্লেষণ করতে গেলে, দীর্ঘ বিষয়ের অবতারণা করতে হবে। তবে সংক্ষেপে কিছু বলা যায়। আমরা জানতে পারছি, বেসরকারি খাতে নতুন করে স্বতন্ত্র বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী (আইপিপি) কেন্দ্র করা হবে না। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেছেন, বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে পুরোটাই সরকারের কাছে বিক্রির মডেল অনেক পুরনো। অন্তর্র্বর্তী সরকার এমন একটি বিধান করতে যাচ্ছে, যেখানে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র সরাসরি গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করবে। চাইলে সরকারও এসব কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনতে পারবে।

আইপিপি  কেন্দ্রের বিষয়ে তিনি বলছেন ‘আইপিপি নীতিমালা বাদ দিয়ে মার্চেন্ট পাওয়ার পলিসির (এমপিসি) খসড়া তৈরি করা হয়েছে। খুব শিগগির তা প্রকাশ করা হবে। এই বিদ্যুৎনীতির অধীনে নির্মিত বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সরকার সর্বোচ্চ ১০  থেকে ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ কিনবে। বাকি বিদ্যুৎ, মানে ৮০-৯০ ভাগ বিদ্যুৎ বিক্রি করবে সরাসরি গ্রাহকের কাছে। সরকার ভাড়ার বিনিময়ে সঞ্চালন লাইন ব্যবহারের সুযোগ দেবে। এতে সরকারের বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের চাপ কমে আসবে।’ প্রশ্ন হচ্ছে, এই চাপ কমে আসবে সরকারের। কিন্তু জনগণের ক্ষেত্রে কী হবে?

বর্তমানে দেশের বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত দামে সব বিদ্যুৎ কিনে নেয় বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। বেশি দামে কিনলেও তারা সরকার নির্ধারিত দামে বিদ্যুৎ বিক্রি করে বিতরণ সংস্থার কাছে। এতে প্রতি বছর পিডিবিকে লোকসান গুনতে হয়, যা ভর্তুকি হিসেবে দেয় সরকার। তিনি বলছেন বিদ্যুৎ খাতে বছরে ভর্তুকি ৩২ হাজার কোটি টাকা। জ্বালানিতে ভর্তুকি ২০ হাজার কোটি টাকা। এমন ভর্তুকিনির্ভর বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাত চলবে না। এখান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

তিনি জানিয়েছেন দেশে জ্বালানির প্রাথমিক চাহিদা পূরণ করাই বড় চ্যালেঞ্জ। উপদেষ্টা বলেন, ‘জ্বালানির অভাবে হাজার হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র পড়ে আছে। বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের ব্যবহার কমাতে পারলে শিল্প খাতে সরবরাহ বাড়বে। গ্যাস সংকট মোকাবিলায় দেশের অভ্যন্তরে কূপ খনন করে বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।’ এছাড়াও তার বক্তব্যে জানা গেল, ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কোনো বিকল্প নেই।’এমনটি উল্লেখ করে জ্বালানি উপদেষ্টা বলেছেন, ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের বাধ্যবাধকতা আছে সরকারের। এর জন্য জমির কোনো সমস্যা নেই। সরকারি জমি অব্যবহৃত পড়ে আছে। রেলের জমি আছে, সড়কের জমি আছে। হাজার হাজার একর জমি ইকোনমিক জোনের নামে অধিগ্রহণ করা হয়েছে। সরকারি এসব জমি নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে ব্যবহার করা হবে।’ তিনি বলেন, ‘গত আওয়ামী লীগ সরকার দুর্নীতি করার জন্য বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন করেছিল। এটি অসাংবিধানিক, তাই ইতিমধ্যে এটি বাতিল করা হয়েছে।’

আসলে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র সরাসরি গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করলে বিদ্যুতের দাম দীর্ঘ সময়ের জন্য বাড়বে। কারণ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন হলেও, দেখা যাবে যেহেতু বিষয়টি অপারেট করবে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং যখনই তারা সরাসরি বিদ্যুৎ বিক্রি করবে, তখনই বিদ্যুতের দাম বেড়ে যাবে। এতে সরকারের খরচ কমবে, কিন্তু জনগণের খরচ বহুগুণে বাড়বে। কারণ সরকার যে বিশাল অঙ্কের অর্থ ভর্তুকি দিচ্ছে, সেই ভর্তুকি থেকে বের হতে চাইলে, সেই পরিমাণ অর্থ নিয়ে আসা হবে গ্রাহকের কাছ থেকে। ঠিক তখনই বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে সমন্বয় করতে হবে। আর যদি তা না হয়, তাহলে বিকল্প কী চিন্তা রয়েছে তা আমাদের জানা নেই।

পিডিবির তথ্য অনুযায়ী ২০২২-২৩ অর্থবছরে সংস্থাটির ঘাটতি হয়েছে ৩৯ হাজার ৫৩৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের কাছ থেকে ভর্তুকি বাবদ পেয়েছে ২৯ হাজার ৫১০ কোটি টাকা। বিগত সরকার গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ধাপে ধাপে বাড়িয়ে উৎপাদন মূল্যের সঙ্গে সমন্বয়ের নীতি নিয়েছিল। ফলে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম আরও বাড়ে। এবার যেহেতু ভর্তুকি প্রত্যাহারের ফলে নতুন পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ পাবে জনগণ, তখন বাস্তবে কী দেখা যাবে তা সময়ই বলে দেবে। বলার অপেক্ষা রাখে না, নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বা ভর্তুকি প্রত্যাহারের কথা বলে, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর দিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছে সরকার। মনে রাখতে হবে, গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি মানে নিত্যপণ্য ও ভোগ্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়া। পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়া। একইসঙ্গে বাড়িভাড়াসহ আনুষঙ্গিক সব খরচ বেড়ে যাওয়া। এর ফলে সাধারণ মানুষের কী পরিমাণ ব্যয় বৃদ্ধি পাবে, তা বিস্তারিত বলা নিষ্প্রয়োজন।

অনেকবার বিদ্যুৎসহ জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। এমনিতেই উচ্চমূল্যস্ফীতির চাপে আছে সাধারণ মানুষ। এমন পরিস্থিতিতে যদি বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয় তাহলে সেই চাপ ভোক্তারা নিতে পারবেন না। অথচ দাম না বাড়িয়েও বিদ্যুৎ খাতের অনিয়ম-অপচয় রোধ করে উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনার মাধ্যমে ভর্তুকি কমানো কিংবা সমন্বয় করা সম্ভব। কিন্তু তার জন্য সিংহভাগ বিদ্যুৎ বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের হাত তুলে দেওয়া ঠিক হবে না। এর ফলে বিদ্যুতের দাম বাড়বেই।

জনগণের মৌলিক অধিকার পূরণের দায়বদ্ধতা রয়েছে সরকারের। সেই বিষয়টি মাথায় রেখে যে কোনো নীতিনির্ধারণ করা দরকার। আমরা বিশ্বাস করি, বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকার যেসমস্ত সিদ্ধান্ত কার্যকর করবে তা জনবান্ধব। কিন্তু কোনোভাবেই তারা যেন বিভ্রান্ত না হন। কারণ বিদ্যুতে ভর্তুকি প্রত্যাহার করার এই পদ্ধতি কার্যকর হলে বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় জনকল্যাণের চেয়ে, জনদুর্ভোগ বাড়বে। গ্রাহকরা পড়বেন ভয়ংকর আর্থিক চাপের মধ্যে। এর ফলে সমাজে বিভিন্ন ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে বাধ্য।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

rajibbd07@yahoo.com