আমি সে সময় সত্যিই বুঝতে পারছিলাম না যে, আমার জীবনে কী আসবে। কী করব তা না জেনে সময় পার করছি। কিন্তু যেদিন আমি মা হয়েছি সেদিন সব বদলে গেল। আর এখন এই কথাটি সত্যই বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হয় যে, এই আশ্চর্যজনক শিশুরা বিশেষ মানুষের জীবনে জন্ম নেয়। কিন্তু এ জন্ম নেওয়াটা অনেকেই ‘অভিশাপ’ বলে চাপিয়ে দিতে চেষ্টা করে। বিষয়গুলো আমি কখনোই জানতাম না আমার সন্তানকে জীবনে না আনা পর্যন্ত। আর তাকে নিয়েই আমার এবং আমাদের একসঙ্গে অবিশ্বাস্য অব্যক্ত যাত্রা শুরু। এই পথ কখনো কখনো বন্ধুর।
এটি এমন একটি লেখা, যে লেখাটির প্রতিটি অক্ষরে অক্ষরে একজন মায়ের ‘অন্তর্ঘাত’ ও কান্না নীরবতায় লুকিয়ে রয়েছে। যে কান্নাগুলোকে নিজের মনে করার মতো শক্তি অথবা সাহস অনেকের থাকে না। সময় দ্যোতনার কাছে শুধু তা নিষ্প্রভ হয়ে আসে। কেবল সেই ব্যক্তিদের জন্য নয়, যাদের শেখা-জানার অক্ষমতা সম্পর্কে প্রকৃত ধারণা নেই এবং সন্দেহ হয় যে, সম্ভবত আমাদের সমাজেও পুরো ব্যাপারটি নিয়ে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। ফলে অসুস্থ সন্তান জন্মধারণে একটি অত্যধিক ভয়াবহ ঘটনা মনে হতে পারে। এই বাস্তবতায় সব সাহস-শক্তি দিয়ে লড়াইরত একটি শিশুর বাবা-মায়ের জন্য সমাজ কতগুলো ঘটনার জন্ম দিয়ে যায়, যেটা প্রতিনিয়ত যন্ত্রণাকাতর হওয়ার অপেক্ষায় থাকে। আসলে এসব কল্পনারও বাইরে।
আমি এবং আমাদের পুরো পরিবার তৈরি থেকেছি সবসময় ওর পাশে থাকতে। ওর সুখকে আমাদের সুখ মনে করার চেষ্টা করেছি। অন্য ১০ জনের মতো করে তাকে ভাবার সুযোগ দিয়েছি। কিন্তু আমাদের পারিপার্শ্বিকতায় এটা একটা কঠিন ব্যাপার। আমরা যতটা সহজভাবে চিন্তা করতে চেয়েছিলাম, সমাজ, রাষ্ট্র কিংবা চারপাশ আমাদের সেই প্রতিবেশটা খুবই কম দিয়েছে।
তার জন্মের সময় থেকে আমি তাকে প্রায় একা বড় করেছি। সবসময় পরিবারের সদস্যরা কাছাকাছি ছিল। কিন্তু ভীতিকর সব পরিস্থিতির মুখে যখন তার ছোট্ট বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠছিল, আমি ওর যন্ত্রণাগুলো সবসময় অনুধাবন করতে পারিনি, সত্য। কিন্তু যখন ও কাতর হয়ে পড়েছে আমার বুকের ভেতরটা ফেটে গিয়েছে। তছনছ হয়ে গিয়েছে। একেকটি সময় ওর মলিন চেহারা আমাকে ভীষণভাবে অসহায় করে তুলেছে। মাঝে মাঝে মনে হয়েছে ও অনেক কিছু বলতে চায়। আবার দেখি সে নিজের থেকে চুপচাপ হয়ে যায়, বলতে পারে না। চেপে রাখে। আমিও কখনো ওকে জোর করিনি। একটা ছোট ছেলে কীভাবে আমাকে এত কিছু শেখাতে পারে? আমার সন্তান এই পৃথিবীতে তার ছোট্ট জীবন জুড়ে আমাকে যা শিখিয়েছে তার একটি অন্তহীন তালিকা লিখতে পারতাম। ওর কাছ থেকে সবচেয়ে বড় শেখাটা হচ্ছে, প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও প্রাণবন্ত থাকাটা।
আমার ছেলে প্রতিদিন অনেক কিছু করে এবং প্রতিদিন সকালে তার ছোট্ট মুখে হাসি নিয়ে জেগে ওঠে। কিছুদিন আমি নিজেকে দোষ দেই, কিছুদিন অন্যকে দোষারোপ করি। আমি প্রশ্ন করি কেন এবং কী। আমি একা, এটাই কেবল অনুভব করতে পারি। আমি আমার সন্তানকে অন্যদের সঙ্গে তুলনা করি। আমি ওর ভবিষ্যতের জন্য ভয় পাই। আমি আমার কয়েক বছরের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে পেয়েছি যে কখনো কখনো, সবচেয়ে খারাপ দিন, বা এমনকি সেরা দিনগুলোতেও একটি অন্ধকার ঘরে বসে কান্নাকাটি করা ঠিক আছে এবং যখন আমি শেষ হয়ে যাই, ওর চোখের দিকে তাকিয়ে নিজেকে আবার তুলে নিয়ে আমার চোখের জল মুছে ফেলি। সে হয়তো জানে না তার লড়াইটাও আমার প্রেরণা। আমার বারবার মনে হয়েছে, ও যদি পারে, তাহলে আমিও পারব। আমি কখনোই ওকে চোখের আড়াল হতে দেইনি। সেও কখনো তার মায়ের আড়াল হয়নি। তার জন্মের পর কেউ কেউ তাকে বিদেশে নিয়ে যেতে চেয়েছিল, দত্তক চেয়েছিল এমন ঘটনা পিজি হাসপাতালে থাকাকালীন প্রায়ই হয়েছে, আমি কখনো তাতে রাজি হইনি। আজ ওর ভাইয়েরা ওকে অস্ট্রেলিয়ায় নিয়ে যেতে চায়, কিংবা ওর বন্ধুরা বিদেশে পাঠিয়ে দিতে বলে, সে রাজি হয় না। এর পেছনে রয়েছে দেশের প্রতি তার একটি গভীর মমত্ববোধ।
ও যখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ত, তখন এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, তার পড়তে অসুবিধা হচ্ছে। কালো বোর্ডের লেখাগুলো পড়তে ওর কাছে অস্বস্তি লাগছে, ঝাপসা লাগছে। তখন বুঝলাম ওর লড়াইটা আরও কঠিন হয়ে উঠছে। অনেক ঘটনার ভেতরে তাকে যেতে হয়েছে। সে যেন বইয়ের সংস্পর্শে আসে, আমি তাকে পড়তে বলি। সাহায্য করি। তাকে বিজ্ঞানমনস্ক হয়ে উঠতে বলি, সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে সে যেন সৃজনশীল হয়ে ওঠে, ঘরবন্দি জীবন থেকে তাকে বের করে ছেড়ে দিয়েছি, তার সামনে খুলে দেওয়ার চেষ্টা করেছি একটি উন্মুক্ত চর্চার পরিবেশ। যেখান থেকে সে নিজেকে গড়ার নির্যাস নিতে পারে। ওর মধ্যে যেন একটা স্বাধীনসত্তা গড়ে ওঠে, যেন ওর মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। তার সামনে একটা বিশাল দ্বার খুলে যায়। প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক শিক্ষার মাধ্যমে, সে একটি চিন্তাশীল, মিষ্টভাষী ছেলে হয়ে ওঠে, যে বেশিরভাগ ‘বিশেষত্ব’ অর্জন করেছিল, কিন্তু কোথাও কোথাও তার ভেতরে জড়তা ছিল। এগুলো পুরোপুরি কাটানো কখনো সম্ভব নয়। ওর কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যেগুলো থেকে বের হওয়ার চেষ্টা আমরা করেছি, সে নিজেও অনেক চেষ্টা করেছে, কিন্তু বের হতে পারেনি। এই সীমাবদ্ধতাগুলো ওকে বেশি আঘাত করে। ওর চাওয়া-পাওয়াগুলো খুবই পবিত্র। বরং আমরা তার দাম দিতে পারিনি। ঘরে-বাইরে ওকে অনেকটা সময় একা একাই লড়াই করতে হয়েছে। আজ ওর যা কিছু অর্জন, পরিচিত মহলে ওর যতটা নামযশ, তাতে আমরা কিছুটা আশ^স্ত হই। এর পুরোপুরি কৃতিত্ব তারই। ওর একাগ্রতা, ওর নিষ্ঠা, ওর স্বাধীনচেতা মনোভাব ওকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। কারোর সাহায্য ছাড়াই নিজের কাজটা শেষ করতে পারা তার বড় দিক। কেউ তাকে এগিয়ে দেয়নি।
অন্য কেউ না জানলেও আমি এটি জানি যে, ওর ভেতরে একটা চমৎকার মন রয়েছে। কিন্তু একটা অভিমান আছে, একটা একাকিত্ব আছে ওর মাঝে। আমি মেনে নিয়েছিলাম এটা। কিন্তু মা হিসেবে আসলে মেনে নেওয়াটা অনেক কঠিন। চোখের সামনে সন্তানের এমন শূন্যতা, চুপচাপ দেখাটা পাহাড়সম দুঃখ। কাজের চাপ এত বড় হয়ে গেল যে, আমি তার সবকিছু পড়তে পারছিলাম না। কিন্তু সেও আমাকে চাইবার জন্য খুব স্বাধীন হয়ে উঠছিল। অনেক সময়ে সে আমার উপলব্ধির চেয়েও বেশি উপায়ে ব্যর্থ হতে শুরু করেছে। আমি জানতাম যে সে আমার সাহায্য খুঁজছে, আমি ছাড়া সে একদমই নিঃস্ব। কিন্তু তবুও আমি ছেড়ে দিয়েছি, স্বাধীন হওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে সময় দিয়েছি। কিন্তু বাস্তবতা খুব ভয়ংকর। এটা কখনো স্বাধীন হতে দেয় না। নিজের মতো করে ভাবতে ঠিক ততটা প্রস্তুত হতে পারে না। আমি তখনো নিজেকে তার অক্ষমতার গভীরতা দেখার অনুমতি দেইনি।
আমি যে জিনিসগুলো শিখেছি এবং পথে চলার লড়াইগুলোতে এমন কিছু আছে, যা কখনই শেখানো যায় না, যদি না আপনি তার জুতা পরে একদিন হাঁটতে না পারেন। ওর এবং আমার মধ্যে একটি ভিন্ন স্তরের ভালোবাসা রয়েছে। আমি কখনোই জানতাম না মানবিকভাবে সম্ভব এমন একটি জীবনের পাঠ, আমরা আমাদের জীবনীতে খুঁজে পাব, যা চিরকাল লালিত থাকবে। আমরা দুজনেই বন্ধুর মতো থাকার চেষ্টা করি। অনেক কিছু নিজেদের মধ্যে শেয়ার করি। অনেক সময় আমরা দুজন একসঙ্গে নাটক দেখি, সিনেমা দেখি। আবৃত্তি করি। গুনগুন করে গানও গাই। কিংবা একটা বই ভাগাভাগি করে পড়ি। বন্ধু হিসেবে ও চমৎকার। ওকে আমি আত্মবিশ্বাসী একজন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চেষ্টা করেছি। কিন্তু ওর মধ্যে ভয় কাজ করে, সংকোচ কাজ করে। প্রচন্ড রকম শূন্যতা ওকে গ্রাস করে ফেলে।
যখন চিকিৎসকের সামনে আমি ওর রোগ নির্ণয়ের কথা বলছিলাম, তখন তাকে দুঃখিত বা বিভ্রান্ত দেখাচ্ছিল না। হয়তো তখনো সে বুঝতে পারেনি। যখন বুঝতে পারল, তার মুখটা শীতল এবং সে চিৎকার করে বলল, ‘আমি বোকা নই?’ যেদিন সে জানতে পারল, তার সামনে একটা কার্ড দেওয়া হলো, এটাই তার পরিচয়, এ পরিচয়টা তার কাছে অনেক কষ্টকর। আমি তার মুখের দিকে তাকাতে পারিনি। নিজেকে তখন অপরাধী মনে হয়েছে। আমি এতটাই অবাক হয়ে গেলাম যে, আমি কাঁদতে শুরু করলাম। সে বাহ্যিকভাবে অনেক শক্ত থাকার চেষ্টা করে। খুব স্বস্তি নিয়ে বলে, ‘তুমিও কি চিন্তিত? আমি ভালো আছি।’ আমি আরও জোরে কাঁদলাম। ওর মধ্যে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য আছে, যেগুলো খুবই মায়াবী। ওখান থেকে চোখ ফেরানো কঠিন। এটা আরও সত্য, আমার সন্তানদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর ও মেধাবী ছিল। হয়তোবা সন্তান হিসেবে ওর সম্পর্কে বেশি বলা হয়ে যায়। ওর কাছাকাছি যারা গেছে বা যারা আছে, তারা নিশ্চয় আমার এ কথাগুলো বাড়াবাড়ি মনে করবে না। সে সবার সঙ্গে মিশে না। মিশতেও চায় না। কিন্তু যার সঙ্গে আন্তরিকভাবে মেশে, তাকে খুব ভালোভাবে চাইবে, তার একজন হয়ে উঠবেই। সে সবসময় সম্পর্কের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে চায়। সব সময় তার ভালোটাই চায়।
কয়েক বছরে ওর কয়েকটি বড় অপারেশন হয়েছে। এ অপারেশনগুলো সহজ বা হালকা কিছু ছিল না। একেকটি অপারেশন ১৪-১৫ ঘণ্টা ধরে হয়েছে। কোনো কোনো সময়ে আমরাও হাল ছেড়ে দিয়েছিলাম। ও হাল ছেড়ে দেয়নি। অসীম ধৈর্য আর কষ্ট সহ্য করে সে নিজেকে সামনে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে।
এখন আমার বয়স হয়েছে, ওকে নিয়ে আমার প্রতিনিয়ত চিন্তা, আমার মধ্যে শঙ্কা কাজ করে, আমার অবর্তমানে ওর কী হবে! ওর তো সাহায্য দরকার। যারা ওকে ভালোবাসে, সত্যি ওকে নিজেদের একজন মনে করে, তাদের আমি প্রায়ই বলি, ওকে দেখে রেখো। জানি না আমি, ওরা আমার আকুতিগুলো বুঝতে পারে কি না। তার প্রতি অন্যদের মিথস্ক্রিয়া আমাকে কৃতজ্ঞ করে তোলে। আমরা তার জন্য লজ্জিত নই, কারোর সহানুভূতিও চাই না। আমরা শুধু ওর পাশে থাকার সমর্থনটা চাই এবং সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে চেয়েছি। ওর প্রতি কেউ করুণা দেখালে, এটা সে বেশ বুঝতে পারে। এই করুণা তার কাছে সবচেয়ে বড় ঘৃণার; সবচাইতে বড় ভয়েরও!
ওর খুব ইচ্ছা আছে, এমন কিছু করা, যেটা আমাকে প্রায়ই বলে, ও এমন একটা আশ্রম করতে চায়, যেখানে অনাবিল শান্তি আর শান্তি থাকবে সবসময়। একটি চমৎকার নির্মল আবহ থাকবে। সম্পর্কের মধ্যে কোনো প্রশ্ন-ট্রশ্ন থাকবে না। সবচেয়ে পবিত্রতম ভালোবাসা ছড়াবে। সাম্য আর মানবতা হাত ধরাধরি করে অনন্ত পথ চলবে। আমি বিশ্বাস করি, কাঠামোগত আশ্রম করতে না পারলেও ওর স্বপ্নটা ছড়িয়ে দিতে পারবে।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত সহ-প্রধান শিক্ষক খিলগাঁও সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়
tanjilatani1@gmail.com