ভাগিয়ে নিয়ে রোগী জিম্মি

নড়াইলের বাসিন্দা সাচ্চু মোল্লা (৫৪) হার্টের চিকিৎসা করাতে চলতি বছরের ২৩ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) আসেন। প্রতিষ্ঠানটির কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগের চেয়ারম্যন অধ্যাপক ডা. মো. আসলাম হোসেন রোগীকে বিএসএমএমইউতে ভর্তি না করে সাশ্রয়ী মূল্যে উন্নত চিকিৎসার কথা বলে উত্তরার লুবানা প্রাইভেট হাসপাতালে নিয়ে যান। তাদের সঙ্গে ৪ লাখ টাকার একটি প্যাকেজে রোগীকে চিকিৎসা দেওয়ার মৌখিক চুক্তি করেন তিনি।

কিন্তু অস্ত্রোপচার শেষে রোগীর স্বজনের কাছে অতিরিক্ত ১ লাখ ৩০ হাজার দাবি করেন; পরে কমিয়ে ৭৫ হাজার টাকা চান। এ টাকা না দিলে রোগীর ফলোআপ ট্রিটমেন্ট বন্ধ করার পাশাপাশি টাকা আদায়ের জন্য রোগী ও তার স্বজনের বিরুদ্ধে মামলার হুমকি দেন। এ অভিযোগ করেছেন রোগীর বোন হীরা খাতুন। 

হীরা খাতুন বলেন, তার ভাই সাচ্চু মোল্লার হার্টের সমস্যা। তার বাড়ি নড়াইল সদরের বাহির গ্রামে। পূর্বপরিচিত বিএসএমএমইউয়ের এমএস কোর্সের শিক্ষার্থী ডা. সাইফুল্লাহ চলতি বছরের ২২ অক্টোবর ফোন করে রোগীকে নিয়ে ঢাকায় আসতে বলেন। পরদিন ২৩ অক্টোবর সকাল ১০টায় রোগীকে নিয়ে তিনি নড়াইল থেকে বিএসএমএমইউতে এসে পৌঁছান। হাসপাতালে এসে ডা. সাইফুল্লাহকে না পেয়ে তাকে ফোন দেন। ডা. সাইফুল্লাহ রোগীকে নিয়ে বিএসএমএমইউয়ের কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. আসলাম হোসেনের কক্ষে যেতে বলেন।

ডা. রোগী দেখার পর হীরা খাতুনকে বলেন, ‘এখানে একটা সিট খালি ছিল, এখন সেটি খালি নেই। এখানে সিট পেতে সময় লাগবে, আবার সিট পেলেও অস্ত্রোপচারের সিরিয়াল পেতে এক মাস লেগে যাবে। সব মিলিয়ে ২/৩ মাস লেগে যাবে। এতে রোগীর অবস্থা খারাপ হয়ে যেতে পারে।’ তাই তিনি রোগীকে একটি প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তি করতে বলেন। হীরা খাতুন প্রাইভেট হাসপাতালের চিকিৎসার খরচ বহন করা সম্ভব নয় বলে জানান। চিকিৎসক তাদের বলেন, ভাল্বের দাম ১ লাখ ১০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে এখানে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ টাকা খরচ হবে, আর প্রাইভেটে গেলে ৫০ হাজার টাকার কিছু বেশি লাগতে পারে। 

ডা. আসলাম হোসেন সাশ্রয়ী মূল্যে ৪ লাখ টাকার একটি প্যাকেজে চিকিৎসা প্রদানের হিসাব দেন। তারা ডাক্তারের কথামতো গত ২৩ অক্টোবরই বিকালে উত্তরার লুবানা জেনারেল হাসপাতাল এন্ড কার্ডিয়াক সেন্টারে রোগী ভর্তি করান। সেখানে ২৫ অক্টোবর রোগীর অস্ত্রোপচার করা হয়। রোগী কিছুটা সুস্থ হলে ২ নভেম্বর হাসপাতাল থেকে তাকে রিলিজ দেওয়া হয়। 

হীরা খাতুন বলেন, ‘রোগী ভর্তির আগে হাসপাতালে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা জমা দেওয়া হয়। অস্ত্রোপচারের আগে বিভিন্ন সময়ে প্রায় ৫০ হাজার এবং মেডিসিনের জন্য ২০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। রিলিজের দিন ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়।’ সব টাকা পরিশোধ করে রোগী নিয়ে বাড়ি যাওয়ার ৩ দিন পর লুবানা হাসপাতালের ক্যাশিয়ার নাসরিন ফোন করে তার কাছে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা পাওনা রয়েছে বলে জানান। ভাল্বের জন্য এ টাকা চাওয়া হয়।

হীরা খাতুন বলেন, ‘সাচ্চু মোল্লার হার্টে যে ভাল্ব লাগানো হয়েছে, প্যাকেটের গায়ে তার মূল্য লেখা ছিল ৯০ হাজার। সেই ভাল্বের জন্যই লুবনা হাসপাতাল থেকে চাওয়া হয় ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা! পরে ডা. আসলাম হোসেনের সঙ্গে কথা বললে তিনি ভাল্বের জন্য ৭৫ হাজার টাকা চেয়েছেন বলে জানান। চুক্তি অনুযায়ী আর কোনো টাকা দেওয়া হবে না জানালে ডা. আসলাম হোসেন ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, ‘টাকা না পেলে রোগীর ফালো-আপ ট্রিটমেন্ট করা হবে না, রোগীকে অন্য কোনো ডাক্তারও দেখবেন না।’ তিনি টাকার জন্য রোগী ও তার স্বজনের বিরুদ্ধে মামলার হুমকি দেন।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক ডা. আসলাম হোসেন এ সংক্রান্ত রেকর্ডপত্র দেখার জন্য উত্তরার লুবানা হাসপাতালে যেতে বলেন। এ প্রতিবেদক বিএসএমএমইউতে কথা বলতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিএসএমএমইউতে কথা বললে হবে না। আপনাকে লুবানায় বিকাল সাড়ে ৫টা পর আসতে হবে।’