পুলিশের মনোবল ফেরানো জরুরি

আপডেট : ১২ ডিসেম্বর ২০২৪, ০২:৪৮ এএম

জুলাই গণআন্দোলনের সময় বাংলাদেশের পুলিশ সরাসরি ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। দেশের মানুষের করের টাকায় বেতন পাওয়া এবং অস্ত্রশস্ত্র কেনা পুলিশ সেই অস্ত্র চালিয়ে জনতাকে হত্যা করে, আন্দোলন দমিয়ে দিতে চায়। স্বৈরাচারী সরকারের নির্দেশ মানতে গিয়ে খুনি বাহিনীতে পরিণত হয় পুলিশ। যাদের জনগণের রক্ষক ও বন্ধু হওয়ার কথা তারাই জনতার চোখে ঘাতক ও শত্রু হয়ে ওঠে। ক্রোধ এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে, সরকার পতনের সঙ্গে সঙ্গে দেশের বেশিরভাগ থানা আক্রমণ হয়। খোদ পুলিশই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ে। সেই সময়ের পর নতুন সরকারের চার মাসের বেশি পেরিয়ে গেলেও এখনো সেই ঝুঁকি কাটেনি। তাই পুলিশ সদস্যদের মনোবল ফেরাতে স্থানীয় নাগরিকদের মতামত নিয়ে কাজ করছেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। বিশেষ করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) জোন বা বিভাগভিত্তিক সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন পদমর্যাদার কর্মকর্তা, বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, পেশাজীবী, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নেতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান ও ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত মতবিনিময় সভা করছেন তারা। সেই সভায় নাগরিকদের চাওয়া-পাওয়া, পরামর্শ জানতে চাওয়া হচ্ছে। নাগরিকদের সঙ্গে এমন সভা করায় পুলিশ আত্মবিশ্বাস ফিরে পাবে ও আরও উদ্যমী হবে বলে আশা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ডিএমপি সূত্র জানায়, এখানো অনেক পুলিশ কর্মকর্তা কাজে যোগ দেননি। আবার ডিএমপির পুলিশ সদস্যরা নতুন হওয়ায় নগরীর মানুষদের বুঝে উঠতেও সময় নিচ্ছেন। কেউ কেউ শহরের পুলিশিং কাজে বিরক্তও হচ্ছেন। এমন অবস্থায় পুলিশের মনোবল ফেরাতে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এলাকায় থানাভিত্তিক নাগরিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেছেন কর্মকর্তারা। সভায় থানার নাগরিকদের কাছে জানতে চাওয়া হচ্ছে তাদের প্রয়োজন ও পরামর্শ। চলতি সপ্তাহে ডিএমপির মিরপুর ও রমনা বিভাগে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এমন মতবিনিময় সভা ডিএমপির ৫০টি থানা এলাকায় হবে। এই মতবিনিময় সভার মধ্য দিয়ে পুলিশের মনোবল ও স্থানীয়দের মধ্যে একটি ভালো সম্পর্ক তৈরি হবে বলেও জানান ডিএমপির মিডিয়া বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মোহাম্মাদ তালেবুর রহমান।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে সরকারি বা বেসরকারি যত চাকরি আছে, সবচেয়ে কঠিন, কষ্টকর ও বিব্রতকর হলো পুলিশের চাকরি। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশ মানতে হবে, না হলে চাকরি থাকবে না। আবার কর্মকর্তাদের নির্দেশ মানলে অনেক সময় জনগণের বিরাগভাজন হতে হয়। কখনো কখনো কিছু না করলেও পুলিশে চাকরি করার কারণেই লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়। বিশেষ করে গণ-অভ্যুত্থানের পর পুলিশের চাকরিই যেন কলঙ্কিত পেশার নাম হয়ে দাঁড়ায়। সেই অস্থিরতা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা, ট্রমার মধ্য দিয়ে অনেকেই জীবনযাপন করছেন। আতঙ্ক ও ভয়ে অনেকেই পূর্ণরূপে কাজে শামিল হতে পারছেন না। যার পরিপ্রেক্ষিতে সাধারণ মানুষও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলা, ভাঙচুর ও হতাহতের ঘটনা ঘটছে।

বিশেষজ্ঞরাও এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও সভাপতি মো. সাখাওয়াত হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পুলিশ যে কালচারের মধ্যে ছিল সেখান থেকে বের হয়ে নতুন কালচারে পড়েছে। পুলিশ নতুন করে চিন্তা করছে, কাজের গতি বাড়াতে কর্মকর্তারা মাঠ পর্যায়ের সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করছেন। এটি পুলিশকে পুরোপুরি সক্রিয় হতে সহায়তা করবে। এর আগে পুলিশের নতুন মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেছিলেন, তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ পুলিশের মনোবল ফেরানো। পুলিশ যাতে জনগণের কাছে যায়, জনগণের সমস্যা বা অভিযোগ শোনে, সে অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া। পুলিশ সব সময় জনগণের বন্ধু। সমাজটাকে ভালো রাখতে পুলিশের বিকল্প নেই। তাই সবাইকে দোষারোপ করে অপরাধীর কাতারে নেওয়া ঠিক নয়। যারা অপরাধ করবে, তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে পুলিশে যারা নিরপরাধ, তাদের কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। পুলিশ দেশের ও জনগণের জন্য অপরিহার্য। এই বাহিনী ছাড়া দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা অসম্ভব। পুলিশকে জনগণের রক্ষক হতে যা যা করা দরকার, সব পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত