প্রশ্নের মুখে সিরিয়ার অন্তর্বর্তী সরকার, অস্থিতিশীলতার শঙ্কা বিশ্লেষকদের

আসাদ সরকারের পতনের পর বিদ্রোহীদের সমর্থন নিয়ে সিরিয়ার নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আগামী বছরের ১ মার্চ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবে। মঙ্গলবার (১২ ডিসেম্বর) বিদায়ী সরকারের সঙ্গে বৈঠকের পর এ কথা জানান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান মোহাম্মদ আল-বশির। তবে এরই মধ্যে সিরিয়ার অন্তর্বর্তী সরকার প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সিরিয়া একটি বিভিন্ন উপদল, গোষ্ঠীতে বিভক্ত একটি দেশ। যদি নবগঠিত অন্তর্বর্তী সরকারে সব পক্ষের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত না হয় তবে হুমকির মুখে পড়তে পারে দেশটির স্থিতিশীলতা।

মঙ্গলবার বৈঠক শেষে আল-বশির সাংবাদিকদের বলেন, মন্ত্রীরা মার্চের শুরু পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের বিষয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি বলেন, আগামী দিনে নতুন সরকার প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।

নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা, লাখ লাখ সিরীয় শরণার্থীকে দেশে ফিরিয়ে আনা এবং প্রয়োজনীয় পরিষেবা সরবরাহ করাই অগ্রাধিকার বলে জানান বশির।

এর আগে সোমবার (৯ ডিসেম্বর) দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এইচটিএসের (হায়াত তাহরির আল-শাম) আঞ্চলিক সরকারের প্রধান মোহাম্মদ আল-বশিরকে নিযুক্ত করা হয়। এর ফলে দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে আসাদের লৌহশাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে এইচটিএসের মর্যাদা অনেকটা বেড়েছে।

তবে বিভিন্ন সূত্রের বরাতে রয়টার্স বলছে, ইদলিব থেকে প্রশাসক এনে এইচটিএস যেভাবে নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনে এগিয়েছে, তা অনেকের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চারটি বিরোধী সূত্র এবং তিন কূটনীতিক রয়টার্সকে বলেছেন, তারা এখন পর্যন্ত প্রক্রিয়াটির অন্তর্ভুক্তি নিয়ে উদ্বিগ্ন।

কেননা যুদ্ধের সময়, বিদ্রোহী দলগুলো প্রায়ই একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হতো। প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং শত্রুতার এমন সম্পর্ক এখনো রয়ে গেছে, যা আসাদ-পরবর্তী সিরিয়ায় স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।

এইচটিএসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিরোধী দলের একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারে সিরিয়ার সব সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব থাকবে। সূত্রটি জানিয়েছে, আগামী তিন মাসের মধ্যে সিরিয়ায় প্রেসিডেন্ট বা সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা থাকবে কিনা তা নির্ধারণ করা হবে।

সিরিয়ান ন্যাশনাল মুভমেন্টের সেক্রেটারি জেনারেল জাকারিয়া মালাহিফজি, যিনি একসময় আলেপ্পোতে বিদ্রোহীদের রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, তিনি বলেন, ‘আপনারা একই ছাতা থেকে (মন্ত্রীদের) নিয়ে এসেছেন, অন্যদের অংশগ্রহণ করা উচিত। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনে পরামর্শের অভাব একটি ভুল পদক্ষেপ। তার মতে, সংস্কৃতি ও জাতিগত দিক থেকে সিরিয়ার সমাজ বৈচিত্র্যময়, তাই সত্যি বলতে বিষয়টি উদ্বেগজনক।

কার্নেগি মিডল ইস্ট সেন্টারের সিনিয়র ফেলো ইয়েজিদ সাইঘ বলেন, এইচটিএস সব স্তরে গতি বজায় রাখার চেষ্টা করছে। তাদের অবস্থানে থাকা যেকোনো গোষ্ঠী, একটি ভেঙে পড়া শাসনব্যবস্থা পরিচালনার ক্ষমতা গ্রহণ করে একই আচরণ করবে।

তিনি বলেন, এইচটিএস অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং পরবর্তীতে যা আসবে তার গতি নিয়ে একাধিক ঝুঁকি রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো ইসলামি ধারায় নতুন ধরনের কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রতিষ্ঠা করা।

তবে তিনি সিরিয়ার বিরোধীপক্ষ ও সমাজের বৈচিত্র্যের মূল্যায়ন করে বলেন, একটি গোষ্ঠীর পক্ষে একচেটিয়া প্রভাব বিস্তার করা কঠিন হয়ে পড়বে।

দামেস্কে এক কূটনীতিক বলেন, ‘আমরা উদ্বিগ্ন— বিরোধী রাজনৈতিক দলের সব প্রধান কোথায়? তাদের এখানে থাকাটা একটি বড় সংকেত হবে এবং কিন্তু তারা এখানে নেই।

দ্বিতীয় আরেকজন কূটনীতিক বলেন, এইচটিএস জনগণকে ভালো বার্তা দিয়েছে, কিন্তু সাম্প্রতিক দিনগুলোতে যে মাত্রায় অন্তর্ভুক্তি দেখানো হয়েছে তা বিরক্তিকর। বিশেষ করে সাংবিধানিক সংস্কার অবশ্যই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রক্রিয়া হতে হবে এবং এটি হবে সত্যিকার অর্থেই একটি বড় পরীক্ষা।

কূটনীতিবিদ উল্লেখ করেছেন, আরও অনেক উপদলের উপস্থিতি রয়েছে, যা এখনও নিরস্ত্র বা নিষ্ক্রিয় করা হয়নি। যদি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রক্রিয়া না ঘটে, তবে তা সম্ভাব্য অস্থিতিশীলতার কারণ হবে।

ওকলাহোমা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর মিডল ইস্ট স্টাডিজের প্রধান ও সিরিয়া বিশেষজ্ঞ জশুয়া ল্যান্ডিস বলেন, ‘শারাকে অবশ্যই দ্রুত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তবে তাকে অবশ্যই টেকনোক্র্যাট এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের এনে তার প্রশাসনিক ক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করতে হবে।’