আসাদ কি বিচারের মুখোমুখি হবেন?

ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ তার পরিবারকে নিয়ে বর্তমানে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়েছেন। সিরিয়ায় বাবা-ছেলের টানা ৫৪ বছর স্বৈরাশাসন চলেছে। আসাদের পতনের মধ্য দিয়ে সিরিয়ায় দীর্ঘ ১৩ বছরের গৃহযুদ্ধের আপাত অবসান ঘটেছে বিদ্রোহীদের ঐতিহাসিক বিজয় অর্জনের মধ্য দিয়ে। 

সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে রাশিয়া ছিল আসাদের কট্টর মিত্র। দেশটিতে রাশিয়ার দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি আছে। ২০১৫ সালে আসাদের সমর্থনে বিমান হামলা চালিয়েছিল রাশিয়া যা যুদ্ধের ঢেউ সরকারের পক্ষে নিয়ে এসেছিল। 

যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি পর্যবেক্ষণ সংস্থার মতে, তখনকার ৯ বছরে রাশিয়ার সামরিক অভিযানে ২১ হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। এর মধ্যে অন্তত ৮ হাজার ৭০০ জন ছিলেন বেসামরিক নাগরিক। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়ার মনোযোগ সরে যায়। দেশটি হয়তো এবার নভেম্বরে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর অভিযান শুরুর পর আসাদ সরকারকে সহায়তায় অনিচ্ছুক কিংবা অক্ষম হয়ে পড়েছিল।

বিদ্রোহীরা দামেস্কের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রুশ সরকারি গণমাধ্যম খবর দেয়, আসাদ ও তার পরিবার মস্কোয় এসে পৌঁছেছে এবং 'মানবিক বিবেচনা'য় তাদের রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া হবে। আর এই সিদ্ধান্ত স্বয়ং পুতিনের বলে জানায় ক্রেমলিন। 

এদিকে মানবাধিকার সংস্থা সিরিয়ান নেটওয়ার্ক ফর হিউম্যান রাইটসের এক প্রতিবেদনের বলা হয়, আসাদের ‘আয়নাঘর’ থেকে মুক্তি পেয়েছেন ১ লাখ ৩৭ হাজারের বেশি বন্দী। বাশারের শাসনামলে কারাগারগুলো নির্মম নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতীক ছিল বলে।

২০১১ সাল থেকে একের পর এক গুম-খুন এবং অমানবিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে সিরিয়ার এই কারাগারে। ইংল্যান্ডের সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইট্‌স-এর ২০২১ সালের একটি রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, সিরিয়ার জেলগুলোতে এক লক্ষেরও বেশি বন্দির মৃত্যুদণ্ড কিংবা হেফাজতে মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ৩০,০০০-রও বেশি বন্দি সৈদনায়ার!

সাইদিনায়ার চৌহদ্দির মধ্যে রয়েছে দুটি পৃথক জেল। একটি লাল এবং একটি সাদা রঙের ভবন। লাল রঙের ভবনে রাখা হত সাধারণ নাগরিকদের। আর সাদা রঙের ভবনে থাকতেন সামরিক ও রাজনৈতিক বন্দিরা। আল-কাবুনের মিলিটারি ফিল্ড কোর্টে নামমাত্র বিচারের পর ফাঁসির সাজা শোনানো হত লাল ভবনের বন্দিদের। 

‘বিচারপ্রক্রিয়া’ শেষ হয়ে যেত মাত্র এক থেকে তিন মিনিটের মধ্যেই। যে দিন এক এক জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হত, সেই দিনটিকে ‘পার্টি’ বলে অভিহিত করতেন কারারক্ষীরা। কখনও কখনও আবার ‘গণফাঁসি’-রও আয়োজন করা হত। তালিকায় নাম থাকা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের এক এক করে নিয়ে আসা হত লাল ভবনের বেসমেন্টের একটি গোপন কক্ষে। সেখানে দু-তিন ঘণ্টা ধরে চলত অকথ্য অত্যাচার, মারধর। তার পর গভীর রাতে চোখ বেঁধে বন্দিদের নিয়ে যাওয়া হত সাদা ভবনের একটি নির্দিষ্ট কক্ষে। সেখানেই একসঙ্গে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেওয়া হত তাদের।

প্রতি সপ্তাহে এক কিংবা দুইবার এই ‘পার্টি’ হত। প্রতি ‘পার্টি’-র রাতে ফাঁসি হত ২০ থেকে ৫০ জন কয়েদির। তবে এই ‘পার্টি’-র বিষয়ে ঘুণাক্ষরেও জানতে পারতেন না বন্দিদের কেউ। ফাঁসির মাত্র মিনিটখানেক আগে তাদের জানানো হত, মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে তাদের। এমনকি, লাল ভবনের কারারক্ষীরাও জানতে পারতেন না, গভীর রাতে সাদা ভবনে নিয়ে যাওয়ার পর বন্দিদের সঙ্গে কী হয়। 

ফাঁসির পর মৃতদেহগুলো ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়া হত তিশরিন হাসপাতালে। সেখানে নামপরিচয় নথিভুক্তকরণের পর গণকবর দেওয়া হত লাশগুলোকে। অ্যামনেস্টির দাবি, ২০১১ সাল থেকে ২০১৫ পর্যন্ত প্রায় ১৩ হাজার বন্দিকে বিনা বিচারে এ ভাবেই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে সৈদনায়ায়।

সাইদিনায়ায় বন্দিদের উপর অত্যাচারের ইতিহাসও কম নয়। বন্দিদের নির্বিচারে মারধরের পাশাপাশি চলত যৌন নির্যাতনও। কখনও কখনও এক বন্দিকে দিয়ে আর এক বন্দিকে ধর্ষণ করানো হত। এর পাশাপাশি, পর্যাপ্ত খাবার, পানি, ওষুধ— কিছুই জুটত না। অত্যাচারের সময় মুখ বেঁধে রাখা হত বন্দিদের। অকথ্য অত্যাচারের ফলে কোনও কোনও বন্দি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলতেন। বাশারের কারাগারগুলোতে বন্দিদের ব্যাপক নির্যাতন, অনাহার, এবং শারীরিক-মানসিক অত্যাচারের প্রমাণ রয়েছে। 

এসব বিষয়ে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব বলেছেন, সিরিয়ার মানুষ ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছে এবং এর ফলে বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় হয়েছে। এর মধ্যে আছে "রাসায়নিক অস্ত্র ও ব্যারেল বোমা হামলাসহ বিভিন্ন ধরনের যুদ্ধাপরাধ। এর সাথে ছিল হত্যা, নির্যাতন, গুম, খুনের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ"।

তিনি আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের মারাত্মক লঙ্ঘনের তদন্ত ও বিচার নিশ্চিতের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। 

সিরিয়ার ইসলামপন্থী বিদ্রোহীদের নেতা বলেছেন রাজনৈতিক বন্দিদের যারা নির্যাতন করেছে তাদের নাম তারা প্রকাশ করবেন।

আবু মোহাম্মেদ আল-জোলানি বলেছেন, অন্য দেশে পালিয়ে যাওয়া কর্মকর্তাদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করবেন তারা।

ফ্রান্সে আসাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দিয়েছেন একজন বিচারক। ২০১৩ সালে রাসায়নিক হামলার ঘটনার জন্য এ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।

রাশিয়া নিজের নাগরিকদের কখনো প্রত্যর্পণ করে না। তবে অন্য দেশের নাগরিকদের জন্য আইনি প্রক্রিয়া আছে। আসাদ রাশিয়া ছেড়ে অন্য কোনও দেশে যাবেন না, সেখান থেকে তাকে সিরিয়ায় ফেরত পাঠানোর সুযোগ আছে বা তাকে অপরাধের জন্য অভিযুক্ত করার সুযোগ হতে পারে। আর এটা যদি সম্ভব হয় তাহলে তাকে বিচারের মুখোমুখি করার সুযোগ তৈরি হবে। 

সূত্র: বিবিসি বাংলা।