স্বাধীনতা পেলাম চাই মুক্তি

প্রতিটি মানুষের জীবনে ‘স্বাধীনতা’ অত্যন্ত গভীর ও হৃদয়গ্রাহী। আমাদের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হওয়ার অবকাশ নেই। বাস্তবিকই প্রতিটি মানুষের জীবনে স্বাধীনতা প্রাথমিক শর্ত। কে নিজের ভূখ-কে এবং নিজেকে পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ রাখতে চায়? সংগত কারণে স্বাধীনতা প্রতিটি মানুষের জীবনের কাক্সিক্ষত যেমন, প্রত্যাশিতও তেমনি। কে চায় পরাধীন থাকতে, শৃঙ্খলাবদ্ধ বন্দিদশায় থাকতে, শোষণ-বঞ্চনায় অহর্নিশ লাঞ্ছনার শিকার হতে। প্রত্যেক মানুষই চায় তার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ব্যক্তি ও বাক স্বাধীনতার পূর্ণ নিশ্চয়তা। একমাত্র স্বাধীন দেশেই মানুষের স্বপ্ন-আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের সুযোগ ঘটে। মানুষের চিন্তা-মননশীলতার বিকাশেও স্বাধীনতা গুরুত্ববহ বটে। চিন্তার স্বাধীনতা ছাড়া মানুষের সৃষ্টিশীলতা-সৃজনশীলতার বিকাশ যে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায় সেটা তো অতি বাস্তবিক।

পৃথিবীর অনেক দেশের মতো বাংলাদেশের স্বাধীনতাও ভোটের মাধ্যমে, আলাপ-আলোচনায় কিংবা দয়া-দাক্ষিণ্যে আসেনি। এসেছে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ জয়ে। সেই যুদ্ধকে আমরা মুক্তিযুদ্ধ বলি। কিন্তু স্বাধীনতাই শেষ কথা নয়। স্বাধীনতার পাশাপাশি মুক্তির বিষয়টি অধিক প্রাসঙ্গিক এবং তাৎপর্যপূর্ণ। তাই স্বাধীনতা পেলেই মানুষের মুক্তি নিশ্চিত হয়ে যাবে; সে কথাটি চূড়ান্ত নয়। স্বাধীনতার পাশাপাশি মুক্তি না এলে যে স্বাধীনতাও অর্থহীন হয়ে পড়ে, আমাদের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই সেটা প্রমাণিত হয়েছে।

মাত্র ৯ মাসব্যাপী যুদ্ধে আমাদের পাশে ছিল ভারতসহ বিভিন্ন রাষ্ট্র। ভারতের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা-সমর্থন ছাড়া এত অল্প সময়ে আমাদের স্বাধীনতার বিজয় লাভ সম্ভব হতো না। দীর্ঘ মেয়াদে হলেও আমরা নিশ্চিত স্বাধীনতা লাভে ব্যর্থ হতাম না। আমাদের স্বাধীনতা ছিল অবশ্যম্ভাবী। অনেকে বলেন পাকিস্তান ভাঙা ভারতের রাজনৈতিক এজেন্ডা ছিল। সেটা থাকতে পারে। কিন্তু স্বয়ং পাকিস্তানিরাই তো আমাদের ওপর অন্যায় যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছিল। পাকিস্তান ভাঙার সম্পূর্ণ দায় তো পাকিস্তানিদের ওপরই বর্তায়। ভারত যদি নিজেদের স্বার্থে সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে থাকে, তবে যে সুযোগটি স্বয়ং পাকিস্তানিরাই ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিল। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা বেলাল মোহাম্মদের ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’  বইতে এ সম্পর্কিত ঘটনার বর্ণনা রয়েছে, ঘটনাটি এরূপ :

আগরতলার মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনে বৈকালিক চায়ের নিমন্ত্রণে গিয়ে বেলাল মোহাম্মদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটে মুখ্যমন্ত্রী শচীন সিংহ, নন্দিনী সৎপথী এবং ড. ত্রিগুণা সেনের। মুখ্যমন্ত্রীর বাড়ির লনে একান্তে আলাপে ড. ত্রিগুণা সেন বলেন, ‘‘ইয়াংম্যান, কাজ করে যাও। পহেলা নভেম্বর ১৯৭১ ঢাকায় বিজয় উৎসব হবে। জানো, ১৯৪৯ সালে আমরা ‘বাংলাদেশ সেল’ প্রতিষ্ঠা করেছিলাম। তখন থেকে আমি ওই সেল-এর দায়িত্বে। এতদিন পরে দুই নদীর স্রোত মিশেছে এক মোহনায়।” সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে দাঁড়িয়ে বেলাল মোহাম্মদ বলেছেন, “স্যার আমি পাকিস্তান বেতারের স্ক্রিপ্ট রাইটারের কাজ করতাম। ‘সিগনিফিক্যান্ট’ নামে একটি কনফিডেন্সিয়াল তথ্য-পত্রিকা আমাকে দেওয়া হতো কাউন্টার প্রোগ্রামের ডাটা হিসেবে ব্যবহারের জন্য। বলা হতো পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ভারত চাচ্ছে, কী করে পাকিস্তানকে ভেঙে দেওয়া যায়। আপনারা ১৯৪৯ সালে ‘বাংলাদেশ সেল’ গঠন করেছেন। তাহলে তো ওই ডাটাটি মিথ্যা নয়।” ড. ত্রিগুণা সেন অপ্রস্তুত হয়েছিলেন। বেলাল মোহাম্মদকে চুপ করিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, “ছি, এসব বলতে নেই, খোকা।”

অক্টোবর মাসে ড. ত্রিগুণার সঙ্গে বাংলাদেশ মিশনের সামনে পুনরায় সাক্ষাৎ হলে কুশল বিনিময়ের পর বেলাল মোহাম্মদ বলেন, “আপনি বলেছিলেন পহেলা নভেম্বর ঢাকায় বিজয় উৎসব হবে। আর তো দশ-পনেরো দিন বাকি পহেলা নভেম্বরের। লক্ষণ কিছুই দেখা যাচ্ছে না।” কিছুটা হকচকিয়ে গিয়েছিলেন ড. ত্রিগুণা সেন। নিজের বক্তব্য সম্পর্কে বলেন, “হ্যাঁ, আমি তো আর জ্যোতিষীর মতো ভবিষ্যদ্বক্তা নই। সেটা ছিল পলিটিক্যাল এজাম্পশন। যুদ্ধের স্ট্র্যাটেজি পরিবর্তন হয়েই থাকে অহরহ। তবে এখন আবার বলছি, পহেলা নভেম্বরের আর বিলম্ব নেই। কিন্তু মিডল অব ডিসেম্বর? আশা করি এর মধ্যে পর্যাপ্ত সময়ের মার্জিন আছে। ওয়েট অ্যান্ড সি।”

এই ঘটনার পাশাপাশি আগরতলা মামলার অভিযুক্ত কর্নেল শওকত আলীর বইতেও তিনি বলেছেন, আগরতলা মামলা মিথ্যা ছিল না। আমাদের রাজনৈতিক স্বার্থে পাকিস্তান ভাঙা ছিল অপরিহার্য। গণহত্যা সংঘটনে সেই আকাক্সক্ষা বাস্তবায়ন করেছিল পাকিস্তানের সামরিক সরকার, জুলফিকার আলি ভুট্টোসহ সামরিক নেতারা। নির্বাচনে জয়ীদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে বাঙালি জাতি নিধনের (অপারেশন সার্চলাইট) গণহত্যা বাস্তবায়নে লেলিয়ে দেয় পাকিস্তানি হানাদার সেনাবাহিনীকে। এই গণহত্যার সহযোগী ছিল পাকিস্তানপন্থি মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামী দলসহ ক্ষুদ্র একটি অংশ। সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিরা নৃশংসতার শিকার হলো, নারীরা লাঞ্ছিত হলো। অগণিত বাড়িঘর ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগসহ মানবতাবিরোধী ঘৃণিত অপরাধ সংঘটিত করেছিল ৯ মাসব্যাপী পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী।

মুক্তিযুদ্ধের নামকরণের মধ্যেই নিহিত রয়েছে মুক্তির বিষয়টি। স্বাধীনতা ও মুক্তির প্রাথমিক শর্তটি হচ্ছে, সামাজিক বিপ্লব। সশস্ত্র বিপ্লব আমরা সম্পন্ন করলেও সমাজ বিপ্লব সংঘটনে ব্যর্থ হয়েছি। বিদ্যমান ব্যবস্থায় আমাদের স্বাধীনতা-মুক্তি নিশ্চিত হবে না। সেজন্য অতি-আবশ্যিক হচ্ছে ব্যবস্থার বদল। রাষ্ট্র বদল হলেও রাষ্ট্রের কাঠামো নিয়মনীতি অপরিবর্তিত। সেই সাবেকি রাষ্ট্রের বদল ঘটানো স্বাধীনতার পরক্ষণেই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আমাদের জাতীয়তাবাদীরা ক্ষমতা পেয়েই আত্মপ্রসাদে মগ্ন থেকেছে। মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক চেতনাকে জলাঞ্জলি যেমন দিয়েছে। তেমনি সমষ্টিগত মানুষের স্বাধীনতা ও মুক্তির স্বপ্ন-আকাক্সক্ষাকে চূর্ণবিচূর্ণ করা হয়েছে। সমষ্টিগত মানুষের স্বাধীনতা ও মুক্তি অর্জিত না-হওয়া অবধি প্রতি বছর বিজয় দিবস আসা-যাওয়া করবে, আমরা আড়ম্বর উৎসব উদযাপন করব কিন্তু আমাদের সমষ্টিগত স্বপ্ন-আকাক্সক্ষার বাস্তবায়ন ঘটবে না। একমাত্র সমাজ বিপ্লবের পথেই সব মানুষের স্বাধীনতা ও মুক্তিলাভ সম্ভব হবে। বিকল্প কোনো পথ বা উপায় কিন্তু নেই।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত