রাষ্ট্রপতির আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান ছাত্র আন্দোলনের

মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। রাষ্ট্রপতিকে ফ্যাসিবাদের সহযোগী আখ্যা দিয়ে তার পদত্যাগ দাবি করে তারা এ আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছে। গতকাল সোমবার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দপ্তর সেল সম্পাদক জাহিদ হাসানের পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

এতে বলা হয়, ‘মহান বিজয় দিবসে ফ্যাসিবাদী শাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পু কর্তৃক বঙ্গভবনে দিবস উদযাপনের আমন্ত্রণ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন প্রত্যাখ্যান করছে। নির্বাহী কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে সাংগঠনিকভাবে যুক্ত কোনো নেতাকর্মী আজ (গতকাল) বঙ্গভবনে মহান বিজয় দিবস উদযাপনের অনুষ্ঠানে যাবে না।’ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ‘মহান বিজয় দিবসের মতো জাতীয় গৌরবের দিন ফ্যাসিবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রপতির আমন্ত্রণ গ্রহণ করাকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানের অভিপ্রায়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ মনে করে।’

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিজয় শোভাযাত্রা : মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে বিজয় শোভাযাত্রা করেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। এতে ১৯৪৭ সালের দেশ ভাগ, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানকে স্মরণ করা হয়েছে। গতকাল দুপুর ১২টার দিকে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে বিজয় শোভাযাত্রা শুরু হয়। এর আগে সকাল ১০টা থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা জড়ো হতে শুরু করেন। বেলা পৌনে ১২টায় শুরু হয় শোভাযাত্রা। টিএসসি, শাহবাগ, মৎস্য ভবন প্রদক্ষিণ শেষে শহীদ মিনারে এসে তা শেষ হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ এবং সদস্য সচিব আরিফ সোহেলসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের নেতৃত্বে হাতে জাতীয় পতাকা আর কণ্ঠে বাংলাদেশ স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে শহীদ মিনার এলাকা। শোভাযাত্রায় যোগ দেয় শিশু, তরুণ, তরুণী ও বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ। যোগ দেন আহতরাও। কেউ আসেন সারা মুখে-মাথায় ব্যান্ডেজ নিয়ে। কেউ ভাঙা হাতে প্লাস্টার নিয়ে। কেউবা ক্র্যাচে ভর দিয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এতে যোগ দেন। শহীদ মিনারে অবস্থান নিয়ে তারা বিভিন্ন স্লোগান দেন। ‘তোমার দেশ আমার দেশ, বাংলাদেশ বাংলাদেশ’; ‘দিয়েছি তো রক্ত, আরও দেব রক্ত; দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’সহ নানা স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ।

এ সময় সদস্য সচিব আরিফ সোহেল বলেন, ‘যুদ্ধের সময় ভারতে পালিয়ে গিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ নেতারা। বিদেশি প্রেসক্রিপশনে ৭২-এর সংবিধান রচনা করা হয়। ৭৫ সালে বাকশাল কায়েম করে পরাধীন করা হয় দেশের মানুষকে।’ ২৪-এর আন্দোলনকারীরা মুক্তিযোদ্ধাদের উত্তরসূরি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতার প্রয়োজনে সংখ্যালঘু কার্ড খেলেছে : হাসনাত

আওয়ামী লীগ ক্ষমতার প্রয়োজনে সংখ্যালঘু কার্ড খেলেছে বলে মন্তব্য করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে কোনো সংখ্যালঘু নেই। সংখ্যালঘু তারাই, যারা বাংলাদেশ ধারণায় বিশ্বাস করে না। দেশে কেউ ধর্মীয় বা জাতিগত কারণে সংখ্যালঘু হতে পারে না।’

গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মোজাফফর আহমদ চৌধুরী অডিটরিয়ামে ‘সাতচল্লিশ-একাত্তর-চব্বিশ : আমাদের বিজয় পরিক্রমা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা এ আয়োজন করে।

হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘সাতচল্লিশে যদি বিজয় হতো, তাহলে একাত্তর হতো না, একাত্তরে বিজয় হলে চব্বিশ হতো না। এটা হলো আমাদের বিজয় পরিক্রমা। এটা আসলে বিজয়ের পরিক্রমা না, প্রতারণার পরিক্রমা। আমরা যে জাতি হিসেবে প্রতারিত হয়েছি, সেই পরিক্রমা।’

বিজয় দিবস নিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির স্ট্যাটাসের বিষয় উল্লেখ করে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘তিনি ইন্ডিয়ার বিজয় বলে দাবি করছেন। যদি এটা ভারতের বিজয় হয়ে থাকে, তাহলে একাত্তরে যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান করেছে তারা সঠিক ছিল? যদি তা না হয়, তাহলে ভারত মিথ্যাচার করছে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা এর আগের বিজয় দিবসগুলোতে রাহুল গান্ধী, নরেন্দ্র মোদির স্ট্যাটাস দেখেছি। তারা সবসময়ই বাংলাদেশের বিজয় দিবসকে তাদের বিজয় দিবস বলে দাবি করেছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকতে এর কোনো প্রতিবাদ জানায়নি। তারা নিজেরাই আমাদের বিজয়ের ট্রফি ভারতের হাতে তুলে দিয়ে এসেছে। একাত্তর যে আমাদের, এই দাবি করতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। ভারত আন্তর্জাতিকভাবে আমাদের স্বাধীনতার যুদ্ধকে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ বলে প্রতিষ্ঠা করছে।’

হাসনাত বলেন, ‘৫ আগস্টের পর থেকেই সংবিধান নেই, রাষ্ট্রপতি নেই। যে রাষ্ট্রপতির বৈধতা নেই, সেই রাষ্ট্রপতির দাওয়াতে আমার যাওয়া মানে নিজের সঙ্গে প্রতারণা। যারা আজ রাষ্ট্রপতির দাওয়াতে গেছেন, তারা হয়তো এই বিপ্লবের চেতনায় বিশ্বাস করেন না।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি মানুষের কলম মগজকে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছে মন্তব্য করে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘যখনই মানুষ কথা বলতে চেয়েছে, তারা বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

ঢাবি শিবির সভাপতি সাদিক কায়েমের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক এসএম ফরহাদের সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য রাখেন জার্মানির হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ড. মির্জা গালিব, জাতীয় নাগরিক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক আলী আহসান জোনায়েদ, ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কমিটির দপ্তর সম্পাদক নুরুল ইসলাম সাদ্দাম, সাবেক সমন্বয়ক মাহিন সরকার।

সভাপতির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিবিরের সভাপতি মো. আবু সাদিক বলেন, ‘ক্যাম্পাসে শিবির সন্দেহে কাউকে পাওয়া গেলে সবার আগে পেটানো হতো। শিবির মারা জায়েজ। আবরার ফাহাদ শহীদ হলো তখন একটু পরিবর্তন হলো। সেই থেকে আর শিবির সন্দেহে মারা হতো না। তবে শিবির প্রমাণিত হলে মারা জায়েজ ছিল। ২৪-এর আন্দোলনে আমরা মাঠ পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। আমরা গিয়েছিলাম শহীদ হতে কিন্তু আল্লাহ কবুল করেননি। সামনে প্রয়োজন হলে ফের বুক পেতে দেব।’