আমি ব্যক্তিগতভাবে অধ্যাপক ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূসের একজন গুণমুগ্ধ। এ অনুরাগ অনেক আগের। তিনি নোবেল পুরস্কার পাওয়ারও আগে থেকে আমি তার গুণপনায় মুগ্ধ। এক ভয়ানক কঠিন সময়ে তিনি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নিতে রাজি হওয়ায় তার প্রতি আমার শ্রদ্ধাবোধ অনেক বেড়ে গিয়েছে। যে পরিস্থিতিতে তিনি দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছেন তাতে আমার বিবেচনায় নিশ্চিতভাবে ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা ছিল শতকরা নব্বই ভাগ। এ এক বিরাট ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব নেওয়া। ড. ইউনূস তার সারা জীবনের কর্মসাধনায় দুনিয়া জোড়া খ্যাতি অর্জন করেছেন। পরাশক্তি থেকে শুরু করে জগতের তাবৎ দেশের রাষ্ট্রীয় প্রাসাদ থেকে গরিবের পর্ণকুটির পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে তার পরিচয় ও সুনাম। অনেক কায়ক্লেশে অর্জিত এ সম্মান নিমিষেই ধুলায় লুটিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি নেওয়াটা যে কত বড় দুঃসাহসের কাজ তা আমি অনুমান করতে পারি। ড. ইউনূস সেই দুঃসাহসী বাজি ধরতে রাজি হওয়ায় আমি তার প্রতি শ্রদ্ধায় অবনত হয়ে দূর থেকে কুর্নিশ জানিয়েছিলাম।
প্রায় ষোলোটি বছর ধরে এ দেশে চলেছে এক দুর্বিনীত দুঃশাসন। একব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বেচ্ছাচারিতায় দেশ তার রাষ্ট্রীয় চরিত্র হারিয়ে মধ্যযুগীয় পারিবারিক এক সামন্ত জমিদারিতে অধঃপতিত হয়। ব্যক্তির ইচ্ছাই ছিল আইন, বিচার ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত। শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক পথে সরকার বদল ও গঠনের সব পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ছাত্র-জনতার এক দুর্নিবার গণ-অভ্যুত্থানে হাসিনা রেজিমের পতন হয়। তখন সবকিছু ছত্রখান ও তছনছ হয়ে আছে। পুলিশ, প্রশাসন, বিচার বিভাগ কিছুই কার্যকর নেই। বড় ব্যবসায়ীরা সব অলিগার্ক ও রেজিমের সিন্ডিকেটভুক্ত। মিডিয়া পুরোই পদলেহী। পেশাজীবী সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে বশংবদরা। হাসিনা পালিয়ে যাওয়ায় তার রেজিমের দোসরদের অনেকেই পলাতক। বাকিরা জটজলদি রঙ বদলে ঘাপটি মেরেছে। লুট, দুর্নীতি, অনিয়মে অর্থনীতি পুরোই বিধ্বস্ত। বড় বড় প্রকল্প হাতে নিয়ে বিপুল ব্যয় বাড়িয়ে তার অর্ধেকটাই তছরুপ করে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। বিপুল বৈদেশিক ঋণের বোঝা জাতির কাঁধে। হাসিনা তার অনুগতদের রাষ্ট্রের টাকা দু’হাতে লুটে নেওয়ার অবাধ সুযোগ করে দিয়েছেন। ভারতের আদানির কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনার অসম চুক্তি করেছেন জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে। আর রাষ্ট্রীয় টাকা উড়িয়ে উৎসব করেছেন দেশকে বিদ্যুতে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছেন বলে। রাজনীতি ও দলগুলোকে হাসিনা করেন তার ইশারার পুতুল। যারা রাজি হয়নি তাদের হত্যাযজ্ঞ, গুম, জুলুম-নির্যাতনে শেষ করে দেওয়া হয়। এ অবস্থায় চরম দুঃসাহসী কিংবা দেশপ্রেমে পরম পাগল ছাড়া কে দায়িত্ব নেবে দেশের? ড. ইউনূসের মতো যশস্বী মানুষ নিয়েছেন। তাই তাকে প্রণতি জানিয়েছি।
সব প্রতিপক্ষকে চুরমার করে দিয়ে হাসিনা কল্পিত প্রতিপক্ষ করেছিলেন ড. ইউনূসকে। তার বৈশি^ক খ্যাতি ও প্রভাবে হাসিনা ঈর্ষান্বিত ছিলেন। তাই তাকে প্রতিপক্ষে স্থাপন করে তার বিরুদ্ধে একতরফা কুৎসা রটাতে শুরু করেন তিনি। কেবল তাই নয়, ড. ইউনূসকে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে হটিয়ে দেন এবং অজস্র মামলায় তাকে জর্জরিত করেন। শেষ পর্যন্ত অনুগত আদালতের মাধ্যমে ড. ইউনূসকে ফাটকে পোরার আয়োজনও সম্পন্ন করেছিলেন হাসিনা। এসব অপপ্রচার ও তৎপরতায় হাসিনার চ্যালা চামুণ্ডারাও প্রভাবিত হয়েছে। তারাও ইউনূস-বিরোধী কুৎসা রটনায় পিছিয়ে ছিল না মোটেও। এমন একটি প্রতিকূল অবস্থায় হাসিনার পালিয়ে যাওয়া রেজিমের স্থলাভিষিক্ত হতে রাজি হওয়াটাকে সহজ সিদ্ধান্ত বলার উপায় নেই কোনোক্রমেই। আর এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারার কারণে ড. ইউনূসের প্রতি আমার ভক্তি স্বভাবতই বেড়ে গেছে।
এখন আমার মুশকিল হয়েছে সাংবাদিক হিসেবে। কেবল ড. ইউনূস নন, সবার প্রতিই সাংবাদিককে থাকতে হয় নির্মোহ ও নিরাসক্ত। বিশেষ করে কারও মূল্যায়ন করার সময়। কারও প্রতি ব্যক্তিগত মোহ, ভক্তি ও আবেগ কিংবা বিরাগ-বিদ্বেষ থাকলে তো তার নিরপেক্ষ মূল্যায়ন কঠিন হয়ে যায়। এখন আমাকে সেই কঠিন কাজটিই করতে হচ্ছে পেশার প্রতি দায়বদ্ধতার কারণে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে বিজয় দিবস উপলক্ষে গত ১৬ ডিসেম্বর মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন। সাংবাদিকতার বীক্ষণে সে ভাষণকে এখন আমি ব্যবচ্ছেদ করার চেষ্টা করব। এ ভাষণে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান নির্বাহী হিসেবে তিনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে ঘোষণাটি দিয়েছেন সেটা হলো, জাতীয় নির্বাচনের দিনক্ষণ নিয়ে মোটামুটি একটা আভাস। তিনি সর্বোচ্চ দেড় বছরের মধ্যে কিংবা তারও আগে এ নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনার কথা বলেছেন। এতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নির্বাচন নিয়ে যে সংশয় দেখা দিয়েছিল এবং নির্বাচনের একটা রোডম্যাপ চেয়ে তারা যে ব্যাকুলতা প্রকাশ করছিলেন তা কিছুটা প্রশমিত হবে বলে আমার ধারণা।
প্রধান উপদেষ্টার এ ভাষণের পর হাইকোর্ট এক রায়ে জাতীয় নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি ফিরিয়ে এনেছে। ফিরিয়ে এনেছে সংবিধানের মৌলিক সংশোধনীর ব্যাপারে গণভোটের বাধ্যবাধকতা। হাসিনা রেজিম তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি ও গণভোট বাতিল করে দিয়ে রাজনৈতিক যে সংকটের সূচনা করে তার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার সর্বশেষ ধাপে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্বে এসেছে। এখন নির্বাচনকালে এই সরকারই থাকবে নাকি নতুন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করতে হবে সেই প্রশ্নেরও জবাব পেতে হবে। গণভোটও এ সরকারের আমলে নাকি পরে প্রয়োজন হবে সে প্রশ্নই শিগগিরই উঠবে।
আমাদের জাতীয় ইতিহাসে পিলখানা হত্যাযজ্ঞ এক নারকীয় শোকাবহ ঘটনা। এর প্রকৃত কুচক্রী ও অপরাধীদের বাঁচাতে অনেক কিছুই রহস্যের আড়ালে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি দেশপ্রেমিক নাগরিকের রক্তক্ষরিত হৃদয়ের দাবি সুষ্ঠু তদন্তে উদঘাটিত হোক সবকিছু, উপযুক্ত সাজা হোক সব অপরাধীর। এর পুনঃতদন্ত হবে না বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক এক কাণ্ডজ্ঞানহীন হঠকারী ঘোষণা দেশবাসীকে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ করে। পরে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেছেন পুনঃতদন্ত কমিটি হবে শিগগিরই। এ ঘোষণাও জাতির উদ্দেশে ড. ইউনূসের দেওয়া ভাষণের পর এলো। কেন? ঘোষণাটি জাতির উদ্দেশে প্রধান উপদেষ্টার ভাষণে আসা উচিত ছিল। সেটাই সব দিক থেকে যৌক্তিক ও শোভন হতো বলে মনে করি।
সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের জাতির উদ্দেশে ভাষণ সন্ধ্যায় সম্প্রচারের যে রেওয়াজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেটা ভেঙে ড. ইউনূসের ভাষণ এবার সকাল ১০টায় প্রচারিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, তিনি চিরাচরিত গুরুগম্ভীর ফরমেট ভেঙে তার ভাষণে নতুন ফর্ম বা অবয়ব এনেছেন। সহজ ভাষায় কথা বলার সোজাসাপ্টা ঢংয়ে অশীতিপর একজন মানুষের ভাষণে যে আধুনিকতার ছোঁয়া পাওয়া যায় তা বিস্ময়কর। বিজয় দিবসের ভাষণে তিনি মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। এই শ্রদ্ধা নিবেদনটা মুক্তিযোদ্ধাদের পর্যন্ত প্রসারিত হলে আরও নিখুঁত হতো। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের লড়াকুদের প্রতি সশ্রদ্ধ সালাম জানালেও মুক্তিযোদ্ধাদের কথা তার ভাষণে বাদ পড়েছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বিশ্বজনমতের সমর্থনের কথাটাও স্মরণ করলে ভালো হতো বলে মনে করি।
এর বাইরে তার ভাষণে আর যা যা থাকা উচিত তার সবটাই রয়েছে। নির্বাচনের আগে যে সংস্কারগুলোর প্রস্তাব ও সুপারিশ গঠিত কমিশনগুলো থেকে আসবে সেগুলোর ব্যাপারে ঐকমত্য গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রধান উপদেষ্টা তার নেতৃত্বে একটি ঐকমত্য কমিশন গঠনের কথা ঘোষণা করেছেন ভাষণে। এটি একটি উদ্ভাবনী উদ্যোগ এবং ভাষণের এক গুরুত্বপূর্ণ দিক। চমকও বলা যায়। তরুণ ও নতুন ভোটাদের ভোট দেওয়ার হার যাতে শতভাগের কাছাকাছি হয় এবং প্রবাসীদের ভোটাধিকার যাতে নিশ্চিত হয়, এ দুটি বিষয়ের ওপর তিনি জোর দিয়েছেন। ভুয়া ভোট মুক্ত করে ভোটার তালিকায় প্রতিটি ভোটারের অন্তর্ভুক্তির কথাও তিনি জোর দিয়ে বলেছেন। হাসিনা রেজিমে ভোটাধিকার হারানো মানুষের অধিকার ফেরানো এবং প্রহসনের অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়ে নির্বাচনকে গণশক্তি প্রয়োগের প্রকৃত মাধ্যমে পরিণত করার ব্যাপারে ড. ইউনূস তার অঙ্গীকার ও আন্তরিকতা জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রতিফলিত করতে পেরেছেন।
ড. ইউনূস তার সাড়ে চার মাসেরও কম বয়সী সরকারের কিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ ও সাফল্যের কথা তার ভাষণে তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে কিছু সাফল্য উদযাপনযোগ্য। কিন্তু এগুলোর তেমন প্রচার হয়নি এবং সরকারের বিভিন্ন অর্গান থেকে বারবার উল্লেখ করাও হয় না। সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণা ও সমস্যাই বেশি প্রাধান্য পেতে দেখি। এই সামান্য সময়ের মধ্যে শ্বেতপত্র কমিটি রিপোর্ট পেশ করেছে। সেই রিপোর্টে লুট, লোপাট, তছরুপ, পাচারের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী রেজিম জাতীয় অর্থনীতিকে কীভাবে ধ্বংস করে গেছে তার হিসাব তুলে ধরা হয়েছে। ড. ইউনূস সে কথা বলেছেন। গুম কমিশন রিপোর্টের লোমহর্ষক ও অবিশ্বাস্য নির্যাতনের বর্ণনার কথাও এসেছে তার ভাষণে। তিনি সংস্কার কমিশনগুলোর কাজের অগ্রগতি, অর্থনীতি, রিজার্ভ, বাজার সিন্ডিকেট, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, দেশবিরোধী অপপ্রচার ও চক্রান্ত এবং আগামী দিনে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলার সংকল্প ও নানা পরিকল্পনা তুলে ধরেন। ভাষণে তিনি নিজেকে প্রবল আত্মপ্রত্যয়ী ও অটল দৃঢ়তায় বলিষ্ঠ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তিনি কতকগুলো দুর্দান্ত বাক্য উচ্চারণ করে জাতির অন্তরে প্রেরণা সঞ্চারের চেষ্টা করেছেন। যেমন : ১. নিজের লক্ষ্যকে জাতির লক্ষ্যের সঙ্গে একীভূত করুন। ২. অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সত্যই হোক হাতিয়ার। ৩. পাচারের টাকা ফিরিয়ে আনা কঠিন হলেও তিনি তার ক্ষমতার মেয়াদে আংশিক হলেও ফিরিয়ে আনার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
ড. ইউনূস মূল্যস্ফীতি শিগগির কমিয়ে আনা এবং রমজানে জিনিসপত্রের দাম স্থিতিশীল রাখার প্রতিশ্রুতিও ব্যক্ত করেছেন। তিনি মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে মামলা দায়েরের অঙ্গীকারও ব্যক্ত করেছেন। খুব অল্পকথায় তিনি ইউরোপীয় দেশগুলোর কূটনীতিকদের কাছ থেকে পাওয়া সহযোগিতার আশ্বাস এবং দিল্লি থেকে তাদের ভিসা সেন্টার ঢাকায় স্থানান্তরের ব্যাপারে তার বলিষ্ঠ আহ্বানের কথাও তুলে ধরেছেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতে আমাদের নাগরিকদের স্বার্থে তার নিজের নেওয়া কূটনৈতিক উদ্যোগের সাফল্যের কথাও তুলে ধরেছেন। জাতীয় ঐক্য গড়ার মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক বিভেদ ও অন্যান্য বিভাজনের চক্রান্ত রুখে দেওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। রাজনীতিবিদ না হয়েও তিনি এই ভাষণে রাষ্ট্রনায়কোচিত প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন। তবে কোনো মানুষই একশ ভাগ নিখুঁত হতে পারে না। আমরা তার ভাষণে সামান্য যেটুকু স্খলন ও বিচ্যুতি পেয়েছি তাকে চাঁদের কলঙ্ক হিসেবেই মেনে নেওয়া যায় বলে মনে করি।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও লেখক, বিএনপি চেয়ারপারসনের সাবেক প্রেস সচিব
mrfshl@gmail.com