ধ্বংসস্তূপ থেকে ফের উঠবে গাজার লাইব্রেরি

আমার বয়স তখন মাত্র পাঁচ বছর। প্রথমবারের মতো আমি পা রাখি মাগাজি লাইব্রেরির দরজায়। আমার বাবা-মা আমাকে ভর্তি করিয়েছিলেন কাছের একটি কিন্ডারগার্টেনে, কারণ সেই স্কুলের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল লাইব্রেরিতে নিয়মিত যাওয়ার ব্যবস্থা। বাবা-মা জানতেন, বই কেবল শিক্ষার মাধ্যম নয়, বরং তা মানুষকে বদলে দেওয়ার শক্তি রাখে। তাদের আশা ছিল, আমি যেন ছোট থেকেই সেই জ্ঞানের বিশাল সমুদ্রে ডুব দিতে পারি, কল্পনাশক্তির অসীম শক্তিকে ছুঁতে পারি।

মাগাজি লাইব্রেরি শুধু একটি ভবন ছিল না, সেটি ছিল এক অন্যরকম পৃথিবীর প্রবেশদ্বার। কাঠের তৈরি সেই দরজার ভেতর পা রাখতেই মনে হতো যেন অন্য এক জগতে চলে যাচ্ছি। চারপাশের মোটা কাঠের তাকগুলোতে সাজানো ছিল অসংখ্য বই। প্রতিটি বই যেন অজানা কোনো গল্পের পাতা খুলে আমাকে আহ্বান জানাচ্ছে। ছোট্ট আমি তাকিয়ে থাকতাম সেই অসীম সম্ভাবনার দিকে একেকটি বই যেন একেকটি খোলা জানালা, যেখান দিয়ে পৃথিবীটাকে নতুন করে দেখা যায়।

যদিও লাইব্রেরিটির পরিসর খুব যে বড় ছিল তা নয়, তবুও আমার শৈশবের চোখে তা ছিল বিশাল। ঘরের মাঝখানে রাখা হলুদ-সবুজ রঙের ছোট্ট একটি সোফা যেন ছিল আমাদের জন্য রাজকীয় আসন। তার চারপাশে ছড়ানো নরম গালিচায় আমরা শিশুরা গোল হয়ে বসতাম। সেখানেই শিক্ষিকা আমাদের নিয়ে যেতেন এক নতুন জগতে। একটি রঙিন ছবি আঁকা বই খুলে আমাদের সামনে পাতা উল্টাতেন। শব্দগুলো পড়তে পারতাম না, কিন্তু ছবির প্রতিটি রেখা আর রঙ আমার কল্পনার জগতে গল্প বলে যেত। সেই মুহূর্তগুলো যেন আমার শৈশবের সবচেয়ে উজ্জ্বল স্মৃতি হয়ে আজও জেগে আছে।

মাগাজি লাইব্রেরিতে কাটানো সময় আমাকে বইয়ের প্রতি এক অমোঘ ভালোবাসায় বাঁধতে পেরেছিল। সেই ভালোবাসা শুধু বিনোদনের জন্য ছিল না, বরং বইগুলো আমার অস্তিত্বের ভিত্তি হয়ে উঠেছিল। আমি শিখেছিলাম কীভাবে একটি বই হতে পারে আশ্রয়স্থল যেখানে কল্পনার ডানা মেলে সব সীমা পেরিয়ে যাওয়া যায়।

কিন্তু আজ সেই স্মৃতি বেদনার ভারে নুয়ে পড়েছে। গাজা উপত্যকার লাইব্রেরিগুলো একে একে ধ্বংস হয়েছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, গত ৪০০ দিনের টানা হামলায় ১৩টি পাবলিক লাইব্রেরি পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়েছে। আরও কতগুলো লাইব্রেরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তার কোনো সঠিক হিসাব নেই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, এমনকি ব্যক্তিগত সংগ্রহের লাইব্রেরিগুলোও মাটির সঙ্গে মিশে গেছে।

গাজার সবচেয়ে বড় লাইব্রেরিগুলোর একটি ছিল আল-আকসা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি। সেই লাইব্রেরির বইগুলোর পুড়ে যাওয়ার ছবি দেখে মনে হয়েছিল যেন আমার নিজের বুকেই আগুন লেগেছে। আমার নিজের বিশ্ববিদ্যালয় গাজার ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি, যেখানে আমি দিনের পর দিন কাটিয়েছি পড়াশোনা আর স্বপ্ন বুনতে সেটিও আজ আর অক্ষত নেই।

এডওয়ার্ড সাঈদ লাইব্রেরি, গাজার প্রথম ইংরেজি ভাষার লাইব্রেরি, সেটিও ধ্বংস হয়ে গেছে। ২০১৪ সালের ইসরায়েলি যুদ্ধের পর এটি গড়ে উঠেছিল। স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তির উদ্যোগে এবং ব্যক্তিগত বই দান সংগ্রহ করে এটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। বই আমদানি করতে নানা প্রতিবন্ধকতা পেরোতে হয়েছে, কারণ ইসরায়েল প্রায়ই আনুষ্ঠানিক বই পাঠানোর পথ বন্ধ করে দিত। তবুও এই লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার পেছনে ছিল ফিলিস্তিনিদের বইয়ের প্রতি অগাধ ভালোবাসা আর সমাজে শিক্ষার আলো ছড়ানোর প্রচেষ্টা।

এই লাইব্রেরিগুলোর ওপর আঘাত কেবল কিছু ভবন ধ্বংসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি গাজার আত্মা, আমাদের ইতিহাস ও ভবিষ্যৎকে নিশ্চিহ্ন করার চক্রান্ত। প্রতিটি ধ্বংস হওয়া বইয়ের পাতায় লেখা ছিল আমাদের জাতিসত্তার গল্প, আমাদের পরিচয়। এই বইগুলোর মাধ্যমে আমরা আমাদের অধিকারের কথা জানতাম, আমাদের ইতিহাস সম্পর্কে সচেতন হতাম। লাইব্রেরিগুলো ধ্বংসের মানে হলো আমাদের শিক্ষার চেতনাকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া।

ফিলিস্তিনি সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে মুছে ফেলা দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের যুদ্ধ ও দখলদারিত্বের একটি কৌশল। এটি ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণ আরও সীমিত করার একটি উপায়। ১৯৪৮ সালে নাকবার সময় ফিলিস্তিনি বাড়িঘর থেকে ৩০,০০০ বই ও পা-ুলিপি লুট করা হয়েছিল। ১৯৮২ সালে লেবাননে ইসরায়েলি আক্রমণের সময়, তারা প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনের লাইব্রেরি ও সংরক্ষণাগার লুট করে। দ্বিতীয় ইন্তিফাদার সময় গ্রন্থাগার ও সংরক্ষণাগারগুলোর ওপর হামলা হয় এবং গাজায় বারবার এগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।

শিক্ষা আর জ্ঞানের প্রতি অগাধ ভালোবাসা ফিলিস্তিনি সংস্কৃতির শেকড়ে গভীরভাবে প্রোথিত। ফিলিস্তিনিদের কাছে বই পড়া এবং শেখার অভ্যাস কেবল জ্ঞানের পথ নয়; এটি তাদের সংগ্রামের প্রতীক, ইতিহাসের সঙ্গে অটুট এক যোগসূত্র। যুগের পর যুগ তারা বিশ্বাস করেছে শিক্ষাই শক্তি।

বই সবসময়ই ছিল ফিলিস্তিনিদের কাছে অমূল্য সম্পদ। ইসরায়েলি অবরোধ আর বইয়ের চড়া মূল্যের কারণে সেই প্রাপ্তি ছিল সীমিত, কিন্তু বইয়ের প্রতি শ্রদ্ধা কখনো কমেনি। ফিলিস্তিনের প্রতিটি পরিবার ধনী হোক বা গরিব্য শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। গল্প বলার মাধ্যমে তারা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে দিয়েছে বইয়ের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা। কিন্তু আজ সেই ভালোবাসার ওপরও নেমে এসেছে ধ্বংসের গাঢ় অন্ধকার। গত ৪০০ দিনের অবিরাম ধ্বংসযজ্ঞ, অনাহার, অর্ধাহার আর শারীরিক-মানসিক আঘাত ফিলিস্তিনের সমাজ-সংস্কৃতিতে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে।

গাজা শহরের কেন্দ্রীয় আর্কাইভ এবং রাফাহ জাদুঘরের মতো প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের ফলে অমূল্য ঐতিহাসিক উপকরণ চিরতরে হারিয়ে গেছে। একটি গ্রন্থাগার ধ্বংসের অর্থ শুধু বইয়ের সংগ্রহের ক্ষতি নয়; বরং এর অর্থ গাজার গ্রন্থাগারিকদের সেই নিরলস চেষ্টার অপচয় যারা ইসরায়েলি অবরোধের মধ্যেও বই সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও মানুষের জন্য সহজলভ্য করার চেষ্টা করেছিলেন।

সবচেয়ে বেদনাদায়ক সত্য হলো, জীবনের তাগিদে আজ অনেক ফিলিস্তিনি বই ব্যবহার করছে আগুন জ্বালানোর জন্য। রান্না করার তীব্র প্রয়োজন বা শীতের কষ্ট থেকে বাঁচার জন্য কাঠ ও গ্যাসের মূল্য আকাশচুম্বী হয়ে যাওয়ায় মানুষ বাধ্য হচ্ছে বই পোড়াতে। এটি শুধু একটি বাস্তবতার গল্প নয়; এটি সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের মৃত্যুঘণ্টা। টিকে থাকার জন্য দিতে হচ্ছে অতীতের সেই গৌরবময় জ্ঞানের মাশুল। তবুও, এই ধ্বংসের মধ্যেও আশার আলো নিভে যায়নি। গাজার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বাকি যেটুকু অবশিষ্ট আছে, তাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য এখনো প্রচেষ্টা চলছে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ মাগাজি লাইব্রেরি।

মাগাজি লাইব্রেরি আমার শৈশবের সেই বইয়ের স্বর্গ আজও দাঁড়িয়ে আছে। স্থানীয় মানুষদের নিরলস চেষ্টায় ভবনটি অক্ষত এবং এর বইগুলো সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়েছে। সেই লাইব্রেরিতে বহু বছর পর ফিরে গিয়ে আমি অনুভব করলাম যেন সময় থেমে আছে। দরজা পেরোতেই শৈশবের স্মৃতি আমাকে ঘিরে ধরল। মনে হলো, ছোট্ট আমি বইয়ের তাকের সারির মধ্যে দৌড়ে বেড়াচ্ছি।

আমি যেন শুনতে পেলাম আমার সেই সহপাঠীদের হাসির শব্দ। মনে পড়ল সেই গালিচার ওপর বসে গল্প শোনার উষ্ণ মুহূর্তগুলো। মাগাজি লাইব্রেরি শুধু একটি ভবন নয়; এটি ছিল আমার শৈশবের সেই নিরাপদ আশ্রয়, সেখানে আমি শিখেছিলাম কল্পনা হতে পারে প্রতিরোধের এক বিশাল শক্তি। বই পড়া মানে হলো অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর এক অনন্য হাতিয়ার।

মাগাজি লাইব্রেরির দেয়াল আর বইগুলো শুধু আমার নয়, হাজারও মানুষের স্মৃতি বহন করে চলছে। এই লাইব্রেরি আমাদের পরিচয়ের অংশ, আমাদের প্রতিরোধের প্রতীক। আজ দখলদাররা আমাদের মন আর দেহকে আক্রমণ করছে, কিন্তু তারা ভুলে গেছে চিন্তা কখনো নিঃশেষ হয় না। তারা যতই চেষ্টা করুক, বই আর লাইব্রেরির মধ্যে যে জ্ঞান আর সংস্কৃতি লুকিয়ে আছে, তা ধ্বংস করা যায় না। আমাদের ইতিহাস, আমাদের আত্মপরিচয়কে মুছে ফেলা অসম্ভব। যতবার আমাদের ওপর আঘাত আসে, আমরা আরও শক্তিশালী হয়ে দাঁড়াই। কারণ জ্ঞান আর শিক্ষা আমাদের অস্তিত্বের ভিত্তি।

এই অন্ধকারের মধ্যেও আমি আশার আলো দেখতে পাই। একদিন এই গণহত্যা থেমে যাবে। ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে গাজার লাইব্রেরিগুলো আবার মাথা তুলে দাঁড়াবে। বইয়ের পাতায় আবারও প্রাণ ফিরে আসবে। জ্ঞানের এই আশ্রয়স্থলগুলো পরিণত হবে প্রতিরোধের প্রতীক ও নতুন প্রজন্মের জন্য আলোকবর্তিকায়। বইগুলো আবারও আশ্রয় দেবে হাজারো শিশুকে, যারা শিখবে স্বপ্ন কীভাবে দেখতে হয়, আর জানবে প্রতিরোধের ভাষা। তাদের হাতে থাকবে বই, চোখে থাকবে কল্পনা আর হৃদয়ে থাকবে প্রতিরোধের চেতনা। গাজা আবারও দেখাবে যে, জ্ঞান আর শিক্ষা কখনোই পরাজিত হয় না।

আলজাজিরা থেকে ভাষান্তর : মনযূরুল হক

লেখক: গাজাবাসী ফিলিস্তিনি লেখক