সিভিল এভিয়েশন কর্মচারী ওসমান হত্যা মামলা

রাতে চট্টগ্রামে খুন করে দুপুরে দুবাইয়ে প্রধান আসামি!

চট্টগ্রামে সিভিল এভিয়েশন কর্মচারী মো. ওসমান সিকদার (৪০) ‘কিলিং মিশনে’চারজন। এর মধ্যে চোরাচালান চক্রের সদস্য মো. রাসেলকে শনাক্ত করা গেলেও বাকি তিনজনের পরিচয় ঘটনার ছয়দিনেও নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ। ঘটনার দিন গ্রেপ্তার হওয়া সিভিল এভিয়েশনের দুই কর্মচারীসহ তিনজন ওসমান খুনের সহযোগী। তবে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি তারা অংশ নেয়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ। 

মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানাচ্ছে, ওসমান হত্যাকাণ্ডটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহার করে ভুয়া রেজিস্ট্রেশন নম্বরের ‘ফিল্ডার’কোম্পানির স্টেশন ওয়াগন গাড়ি। হত্যাকাণ্ডের এটির নিবন্ধন নম্বর দেওয়া হয় চট্টমেট্রো-ঘ-১২-৬০৯৩। বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) চট্টগ্রাম অফিস জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত গাড়ির নম্বরটি ছিল ভুয়া। ঘটনার মূলহোতা রাসেলের জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর (এনআইডি) ৬০১৫০৮১০৩১।   

সূত্রগুলো জানায়, ১১ ডিসেম্বর দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরের সিভিল এভিয়েশনের ‘চৈতালি’নামের সরকারি কোয়ার্টারের প্রধান ফটক (জাপানি গেইট) দিয়ে গাড়ি নিয়ে ঢুকে রাসেলসহ চারজন। ওসমানের কক্ষে ঢুকে তাকে মারধরের এক পর্যায়ে মাথায় ধারালো অস্ত্রের আঘাত দিয়ে খুন করা হয়। ১০ থেকে ১২ মিনিটের ব্যবধানে হত্যাকাণ্ড ঘটান তারা। এরপর ওসামানের লাশ গাড়িতে তুলে নিয়ে বিমানবন্দরের অদূরে চরপাড়া আউটার রিং রোডের পাশে ফেলে দেয় খুনিরা। 

ইমিগ্রেশন পুলিশ সূত্র জানায়, হত্যাকাণ্ড ঘটানোর পর ৩ থেকে ৪ ঘণ্টার মধ্যে চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দর দিয়ে দুবাই পালিয়ে যান মামলার প্রধান আসামি মো. রাসেল।

গ্রামের বাড়ির সূত্র জানায়, আনুমানিক সাত থেকে আট বছর আগে দুবাই পাড়ি দেন রাসেল। সেখানে ব্যবসার আড়ালে হুন্ডি, মুদ্রা পাচার ও স্বর্ণ চোরাচালানে জড়িয়ে পড়েন তিনি। রাসেল চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলা নানুপুর মধ্য গামরিতলা গ্রামের মৃত আবুল কাসেমের ছেলে। তারা দুই ভাই। কয়েকবছর আগে দুবাইতে রাসেলের নির্যাতন সইতে না পেরে আরমান হোসেন নামের এক যুবক আত্মহত্যা করেছেন। হতভাগ্য ওই যুবকের গ্রামের হাটহাজারী উপজেলার গুমানমর্দ্দন এলাকায়। প্রতিমাসেই তিনি দেশে আসা-যাওয়া করেন। গ্রামের বাড়িতে গড়ে তুলেছেন দোতলা বিশিষ্ট বিলাসবহুল বাড়ি। 

পুলিশ জানায়, ৩৭ হাজার সৌদি রিয়াল পাচার নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে ১১ ডিসেম্বর দিবাগত আড়াইটার দিকে খুন করা হয় সিভিল এভিয়েশন কর্মচারী ওসমান সিকদারকে। এ ঘটনায় সিভিল এভিয়েশন কর্মচারী মো. ইব্রাহিম খলিল, বাদল মজুমদার এবং মো. আরিফ নামের তিনজনকে ঘটনার দিন গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ওসমান খুনের ঘটনায় মো. রাসেলসহ তিনজনকে আসামি করে পতেঙ্গা থানায় মামলা দায়ের করেন ভিকটিম ওসমানের বড়ভাই এমরান সিকদার। তবে এজাহারে আসামি করা হয়নি আরিফকে।

এই প্রসঙ্গে মামলার বাদী এমরান সিকদার বলেন, ‘মামলা দায়েরের আগে হত্যাকাণ্ডে আরিফের সম্পৃক্ততা টের পাইনি। পরে জানতে পেরেছি আমার ভাইকে খুনের পেছনে আরিফের যোগসাজশ আছে।’

এ দিকে গ্রেপ্তার তিনজনের মধ্যে আসামি ইব্রাহিম খলিল গত শুক্রবার বিকেলে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সরকার হাসান শাহরিয়ারের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

পতেঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহফুজুর রহমান জানান, বিমানবন্দর দিয়ে সৌদি আরবের মুদ্রা ৩৭ হাজার রিয়াল পাচার ও ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে  দ্বন্দ্ব থেকে ওসমান সিকদারকে  খুন করা হয়।

গ্রেপ্তার হওয়া আসামি ইব্রাহিম খলিল ওরফে মাসুদ (৪৪) ভোলা জেলার লালমোহন থানাধীন গজারিয়া ইউনিয়নের শিপু মাতবর বাড়ির মৃত মোফাজ্জল হোসেন ছেলে। আসামি মোহাম্মদ বাদল মজুমদার (৪২) বান্দরবান পার্বত্য জেলার সদর থানাধীন ৬ নং ইউনিয়নের আর্মিপাড়া বিধু বালার বাড়ির দুলাল মজুমদারের ছেলে। এ ছাড়া গ্রেপ্তার হওয়া আরিফের গ্রামের বাড়ি হাটহাজারীর মেখল ইউনিয়নের কাছিয়া বটতল এলাকায়। তার বাবার নাম মোহাম্মদ জুনু। ভিকটিম মো. ওসমান সিকদার (৪০) চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার মেখল ফকিরহাট এলাকার রুহুল্লা সিকাদার বাড়ির মো. শাহা আলম সিকদারের ছেলে।

বিমানবন্দর সূত্র জানায়, ১১ ডিসেম্বর দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে একটি প্রাইভেটকার (স্টেশন ওয়াগন) নিয়ে আসে দুর্বৃত্তরা। এ সময় বিমানবন্দর কর্মচারীদের সরকারি কোয়ার্টারে ঢোকার প্রধান ফটকে (জাপানি গেইট) ওই প্রাইভেট কারটি আটকান কর্তব্যরত এক আনসার সদস্য। এ সময় জাপানি গেইট থেকে আনুমানিক ৩০০ গজ অদূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন সিভিল এভিয়েশনের কর্মচারী (ইলেকট্রিশিয়ান) ইব্রাহিম খলিল তিনি (খলিল) দূর থেকে গেইটে দায়িত্বরত আনসার সদস্যকে দুর্বৃত্তদের বহন করা কারটি কোয়ার্টারে ঢুকতে দেওয়ার জন্য হাতের ইশারা দেন। গাড়িটি  কোয়ার্টারে ঢোকার ১৫ থেকে ১৭ মিনিটের মধ্যে জাপানি গেইট ত্যাগ করে। এ সময় ইব্রাহিম খলিল নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করলেও ধরা পড়ে যান সিসিটিভি ক্যামেরায়।