একটি গণতান্ত্রিক দেশে মূলত তিনটি শক্তিশালী কাঠামো থাকতে হয়। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং আইনশৃঙ্খলা। এই তিন কাঠামোই তার সামাজিক স্বরূপ উন্মোচন করে। এর মধ্যে যদি কোনো কাঠামো ভেঙে পড়ে, তাহলে তা দ্রুত সমাধানে আনতে হয়। না হলে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হবেই। তখন কেঁপে উঠতে পারে সমস্ত কাঠামো। ফলে আবির্ভূত হতে পারে অগণতান্ত্রিক শক্তি। রাজধানী ঢাকাসহ দেশ জুড়ে বেড়েছে খুন, ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা। প্রশ্ন উঠেছে হঠাৎ করেই কি সারা দেশে অপরাধ বেড়ে গেছে, নাকি দীর্ঘদিন ধরে বাড়তে থাকা পরিস্থিতির চলমান দৃশ্য এটি? আইনশৃঙ্খলা অবনতির এই চিত্রে রীতিমতো আতঙ্কগ্রস্ত দেশের মানুষ। চলমান পরিস্থিতিকে কোনোভাবেই সামলাতে পারছেন না আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। ছিনতাইকারীদের হাতে নিহত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। সন্ধ্যা হলেই ডাকাত আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে মানুষের মধ্যে। চুরি-ডাকাতির ঘটনা নৈমিত্তিক বিষয়। খুনের ঘটনা বাড়ছে। লেক, নদী বা খোলা মাঠ থেকে উদ্ধার হচ্ছে লাশ। পুলিশ অবশ্য বলছে, গত ৫ আগস্ট হাসিনা সরকারের বিদায়ের পর ব্যাপক হামলা, অনাস্থা আর আন্দোলনের সময় বিতর্কিত ভূমিকার জন্য তারা কিছুটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ায় কেউ কেউ সুযোগ নিয়ে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটাচ্ছে। পাশাপাশি তারা এও মনে করছেন, পুলিশ বাহিনী আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে এবং ঢাকাসহ সারা দেশে পুলিশি কার্যক্রম স্থিতিশীল হওয়ায় পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
বাস্তবতা হচ্ছে, দেশের প্রায় সব জেলাতেই অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। সন্ধ্যার পরই পাল্টে যাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। রাত যত বাড়ে, মানুষের মধ্যে তত বাড়তে থাকে আতঙ্ক। এই আতঙ্ক রাজধানী ছাড়িয়ে দেশের প্রায় সব জেলাতেই। এক খুলনাতেই গত চার মাসে ২৩ জন খুন হয়েছেন। বাকি মেট্রোপলিটন এলাকা, শহর, উপজেলা এবং গ্রামের চিত্র কেমন হতে পারে তা সহজেই আন্দাজ করা যায়। এ ব্যাপারে দেশ রূপান্তরে শুক্রবার প্রকাশিত হয়েছে একটি প্রতিবেদন। বলা হচ্ছে খুলনা যেন সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। প্রায় প্রতি রাতেই নগরীসহ জেলার কোথাও না কোথাও ঘটছে অস্ত্রের মহড়া, পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, গোলাগুলি, খুনসহ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। সাধারণ মানুষের অভিযোগ, গত ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর চার মাস পেরিয়ে গেলেও খুলনায় পুরোপুরি সক্রিয় হয়নি পুলিশ। আগের মতো পুলিশের টহল ও অভিযান দেখা যাচ্ছে না। এ ছাড়া কারাগারে থাকা বেশ কয়েকজন সন্ত্রাসী জামিনে বেরিয়ে এসেছে। একই সঙ্গে পালিয়ে থাকা সন্ত্রাসীরাও এলাকায় ফিরেছে। সক্রিয় হয়ে উঠেছে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য ও বখাটেরা। অধিকাংশের বয়স ১৮ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। তারা ব্যবসায়ীদের কাছে চাঁদা দাবি করছে। বেড়েছে মাদক বেচাকেনা । ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। তবে এ রকম পরিস্থিতির মধ্যে, একজন পুলিশ কর্মকর্তা অনেকটা হাস্যকর যুক্তি উপস্থাপন করেছেন। কেএমপির উপকমিশনার (মিডিয়া) আহসান হাবিব বলেছেন, ‘সন্ত্রাসীরা অতর্কিতে মহানগরী এলাকায় প্রবেশ করে অনাকাক্সিক্ষত কিছু ঘটনা ঘটিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। তারা পুলিশের চোখ ফাঁকি দেওয়ার জন্য কৌশল অবলম্বন করছে। তবে প্রতিটি ঘটনাতেই সন্ত্রাসীদের চিহ্নিত করে তাদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। আমরা আশা করছি, শিগগিরই জনজীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে পারব।’
অদ্ভুত কথা! অপরাধী তো সবসময়ই চাইবে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে! তারা অবশ্যই বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করবে। এসব অতিক্রম করাই তো পুলিশের কাজ। দায়িত্ব এবং কর্তব্যের প্রতি দায়বদ্ধ থাকলে, বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা জটিল কিছু নয়। শুধু খুলনা না, রাজধানীসহ পুরো দেশে কীভাবে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা যায়, তার জন্য সর্বোচ্চ পর্যায়ে জরুরি ভিত্তিতে সমন্বিত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একই সঙ্গে একটি বিষয় জানা দরকার, পুলিশ সদর দপ্তরের ওয়েবসাইটে কি নিয়মিতভাবে দেশের অপরাধের তথ্য প্রকাশ হচ্ছে, না বন্ধ রয়েছে? যদি প্রকাশিত হয়, ভালো। পৃথিবীর প্রায় সব গণতান্ত্রিক দেশে অপরাধ তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে। তা ছাড়া তথ্য অধিকার আইনেও তথ্য পাওয়ার অধিকার রয়েছে। এর ফলে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়। কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরে আসে। জনমনে আতঙ্ক রেখে, কোনো ডঙ্কাধ্বনি দেশবাসীর কানে বাজবে না। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে কেউ যেন কোনো ধরনের আশঙ্কা না করেন।