৯০৯ খ্রিস্টাব্দে উত্তর আফ্রিকায় উবাইদ আল্লাহ আল-মাহদি বিল্লাহর হাত ধরে ফাতিমীয় খিলাফতের যাত্রা শুরু হয়, যিনি নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর কন্যা ফাতিমা (রা.)-এর বংশধর দাবি করতেন। ৯৭০ সালে নীল নদের তীরে অর্থাৎ মিসরে ফাতিমীয়দের খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়। ইসমাইলি শিয়া মতাবলম্বী ফাতিমীয়দের ষষ্ঠ সুলতান আল-হাকিম বিন আমর-আল্লাহ ছিলেন কায়রোকেন্দ্রিক এ খিলাফতের প্রধান নেতা। সুলতানের আধ্যাত্মিক গুরু ছিলেন- হামজা ইবনে আলি ইবনে আহমাদ তিনি ১০১৫-১০১৬ সালের দিকে মিসরে পৌঁছান। ফাতিমীয় সালতানাতের প্রশ্রয়ে পরবর্তী সময় এক নতুন ধর্মীয় দর্শন প্রতিষ্ঠা করেন হামজা ইবনে আলি। এ দর্শন ‘দ্রুজ ধর্মমত’ হিসেবে পরিচিতি পায়, যার মধ্যে সব সেমেটিক ধর্মের প্রভাব দৃশ্যমান ছিল। সেই থেকে দ্রুজরা ইসমাইলি শিয়াদের বাইরে স্বতন্ত্র ধারা। হামজা ইবনে আলিকে সিরিয়া ও লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের নানা জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ধর্মীয়-জাতিগত (এথনো-রিলিজিওন গ্রুপ) দ্রুজ সম্প্রদায়ের লোকজন প্রধান ধর্মগুরু মনে করেন। ইসলাম ধর্মের একত্ববাদী ধারণাকে তিনি তার অনুসারীদের মাঝে প্রচার করতেন; যার কারণে দ্রুজরা নিজেদের ‘আল-মুয়াহিদুন (একত্ববাদের সমর্থক)’ বলে পরিচয় দেন।
দ্রুজদের নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর। সম্প্রতি সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের শাসন উৎখাত করতে রাজধানী দামেস্ক উপনীত হওয়া প্রথম বাহিনীটির যোদ্ধারা ছিলেন মূলত এই দ্রুজ সম্প্রদায়ের। দ্রুজরা দামেস্ককেন্দ্রিক নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের মাঝে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার মনে করছেন। দামেস্কের অদূরে ৯০ শতাংশ দ্রুজ জনগোষ্ঠী-অধ্যুষিত সুয়েইদা অঞ্চলের শাসনব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক তারা। ভবিষ্যৎ ফেডারেল শাসনব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নে অপরাপর জাতিগোষ্ঠীর মতো তারা তাদের মতামতকে গ্রহণ করার দাবি তুলছেন। এই মুহূর্তে সিরিয়ার ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ‘হায়াত তাহরির আল-শামস (এইচটিএস)’-এর সঙ্গে তাদের বোঝাপড়ার ওপর নির্ভর করবে, আগামীর সিরিয়াতে সংখ্যালঘু দ্রুজরা কতটা নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিয়ে বসবাস করবে। সিরিয়ার বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রক্রিয়া কতটা উদার হবে, তাতে নজর থাকবে সবার। ২০১১ সালের পর থেকে সিরিয়া গৃহযুদ্ধের বহুপক্ষীয় লড়াইয়ে দ্রুজরা নিজেদের গুটিয়ে রেখেছিল। তারপরও ইসলামিক স্টেট (আইএস) এবং আরও নানা সুন্নিপন্থি গোষ্ঠী দ্রুজদের জনপদে গণহত্যা চালিয়েছে। আসাদ সরকার সংখ্যালঘুর রক্ষক, সিরীয় সমাজে প্রোথিত এমন ধারণা দ্রুজদের প্রতি বাকিদের সহিংস করে তোলে। এ ছাড়া আইএস, আল-কায়েদার মতো সুন্নিপন্থি জিহাদি মতাদর্শধারীদের কাছে দ্রুজদের ‘রহস্যজনক’ ধর্মীয় বিশ্বাস এসব নিপীড়নের বড় কারণ ছিল। তবে বাস্তবতা হলো আসাদের প্রশাসন সুয়েইদা অঞ্চলেও ভিন্নমত দমনের নামে নিপীড়ন-নির্যাতনের জাল ছড়িয়েছিল।
১৯৮১ সালের ছয় দিনব্যাপী আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের মধ্য দিয়ে সিরিয়া গোলান মালভূমির দুই-তৃতীয়াংশের নিয়ন্ত্রণ হারায়; সেই মালভূমির অন্যতম প্রধান অধিবাসী দ্রুজরা। বর্তমানে সিরিয়ার হাতে মালভূমির যতটা নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, তা নিয়েও নতুন করে রাজনৈতিক খেলা শুরু হয়েছে। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, আসাদের পতনের পর মালভূমির দ্রুজরা ইসরায়েলের সঙ্গে সংযুক্তির দাবি তুলছেন। ইসরায়েলি দ্রুজদের প্রতি ভ্রাতৃবন্ধনের আবেগে মালভূমির দ্রুজরা ইসরায়েলি শাসনকে স্বাগত জানাতে চাইছেন। আন্তর্জাতিকভাবে গোলান মালভূমি ইসরায়েলের ভূমি হিসেবে স্বীকৃত না হলেও আগামী দিনে অঞ্চলটির দ্রুজ বাসিন্দাদের মনোভাব তেলআবিবের নতুন কোনো ভূমিদখলের অজুহাত হয়ে উঠতে পারে। ইতিমধ্যে ইসরায়েলি বাহিনী সেদিকেই অগ্রসর হচ্ছে। সম্প্রতি গোলান মালভূমিতে একটি রকেটের আঘাতে বেশ কয়েকজন দ্রুজ নিহত হয়। দ্রুজরা এ জন্য হিজবুল্লাহকে দায়ী করেছে। এ ঘটনা মালভূমির দ্রুজদের ইসরায়েল প্রশ্নে আরও নমনীয় করেছে। কারণ এসব দ্রুজদের মনে শিয়া ও সুন্নিদের দিক থেকে নানা অত্যাচার-নিপীড়নের স্মৃতি রয়েছে। এদিকে সুয়েইদাকেন্দ্রিক দ্রুজরা ইসরায়েলি আগ্রাসনের প্রতিবাদে মুখর। দ্রুজদের ধর্মীয় নেতা শেখ আল-হিজরি কড়া ভাষায় ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বিবৃতি দিয়েছেন। সিরিয়ার পর দ্বিতীয় বৃহত্তম দ্রুজ জনগোষ্ঠী বাস করছে লেবাননে; তারাও সুয়েইদার দ্রুজদের রাজনৈতিক জাগরণে বেশ উৎফুল্ল। সত্যিকার অর্থে, দ্রুজরা যেখানেই রয়েছেন, তারা স্বস্তিতে নেই কোথাও। কোনো ধর্মমতের মূলস্রোত তাদের আপন করে নেয়নি, কোনো দেশ তাদের স্বস্তিতে বসতি গড়তে দেয়নি। অথচ মধ্যপ্রাচ্যে তাদের শত বছরের নাড়িপোতা।
সিরীয় দ্রুজদের সঙ্গে বাশার আল-আসাদের প্রশাসনের সম্পর্কের গ্রাফটি ওঠা-নামার। আসাদবিরোধী বিদ্রোহে টালমাটাল দেশে দ্রুজরা ‘বাফার গ্রুপ (নিরপেক্ষ গোষ্ঠী)’-এর মতো বিরাজ করেছিল। নিজেদের দুর্বলতার কারণেই দ্রুজরা এই সংঘাতে জড়াতে চায়নি। শেষমেষ সুয়েইদার দ্রুজ যোদ্ধাদের সঙ্গে তার মুখোমুখি চলে আসাটা বড় এক পরিবর্তন। সুয়েইদা সিরিয়া তো বটেই, সারা পৃথিবীর দ্রুজদের প্রাণকেন্দ্র। এখানে গত বছরের মাঝামাঝিতে আসাদের বিরুদ্ধে জনরোষ প্রবল হতে থাকে। এ সময় আসাদের রোষানলে পড়ে দ্রুজদের অনেকে। তারা আসাদের দিক থেকে যেমন রেহাই পায়নি, একইভাবে সুন্নিপন্থিদের থেকেও রক্ষা পায়নি। গৃহযুদ্ধের শুরুতে বা কিছু সময় পরে নিজেদের নিরাপত্তা টিকিয়ে রাখতে দ্রুজদের মধ্যে বেশ কয়েকটি সংগঠন তৈরি হয়েছিল, যারা কি না শেষ পর্যন্ত অস্ত্র ধারণ করেছে। চলতি ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে সুয়েইদাসহ দক্ষিণ সিরিয়ায় সুন্নি-দ্রুজ নির্বিশেষে নানা মতাদর্শের সংগঠন ‘সাউদার্ন অপারেশন রুম (এসওআর)’ নামে একটি সম্মিলিত জোটে সমবেত হয়ে আসাদের বিরুদ্ধে লড়াই সূচনার ঘোষণা দেয়। এতে দ্রুজরাই ভরকেন্দ্র।
২০১৪ সালে সুয়েদাভিত্তিক দ্রুজ নেতারা নিরপেক্ষ অবস্থান ধরে রেখে ‘হরকত রিজাল আল-কারামা’ নামের সংগঠন গড়ে তোলেন। তাদের ভাষ্য, জাতিগত-ধর্মীয় অস্তিত্ব ধরে রাখতে সাংগঠনিক কাঠামোর বিকল্প ছিল না। শেখ ইয়াহিয়া আল-হাজ্জর নামের এক দ্রুজ নেতা এখন এর নেতৃত্বে। ২০১৫ সালে শীর্ষনেতা ওয়াহিদ বালাউসের হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিরোধের জেরে ওই সংগঠন ভেঙে ‘কাওয়াজ শেইখ আল-কারামা’ নামের আরেক গোষ্ঠীর আত্মপ্রকাশ ঘটে। বর্তমানে সংগঠনটি ওয়াহিদ বালাউসের ছেলে ফাহাদ বালাউসের প্রভাবাধীনে রয়েছে। আসাদবিরোধী এসওআর জোটে এই দুই সংগঠনই রয়েছে। দ্রুজদের মধ্যে ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘লিওয়া আল-জাবেল’ নামের সংগঠনটি গৃহযুদ্ধের শুরু থেকে আইএস, হিজবুল্লাহ, ইরানি মদদপুষ্ট নানা শিয়াপন্থি উপদলের বিরুদ্ধে লড়াই করার পাশাপাশি সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। চলতি বছরের জুলাইয়ে তাদের নেতা মুরহিজ হুসেইন আল-জারমানি প্রতিপক্ষের হামলায় নিহত হন। চূড়ান্ত লড়াইয়ে তারাও আসাদকে উৎখাত করতে নামে। প্রকৃতপক্ষে, দ্রুজদের প্রধান প্রধান জনপদে সিরিয়ার রাজনৈতিক প্রশ্নগুলো যতটা প্রাসঙ্গিক ছিল, তার চেয়ে বেশি ছিল অস্তিত্বের প্রশ্নে অস্ত্র হাতে তোলা।
দ্রুজদের কেন্দ্র করে ইসলাম ধর্মের দুটি প্রধানতম শাখা সুন্নি ও শিয়া; উভয়েরই চরম অস্বস্তি রয়েছে। তারা কেউই দ্রুজদের স্ব স্ব দলভুক্ত মনে করে না। রীতিমতো অমুসলিম বলেই প্রতিপন্ন করা হয়। দ্রুজদের সঙ্গে ইসমাইলি শিয়াদের যে সম্পর্কের কথা ঐতিহাসিকরা বলেন, তা-ও ইসমাইলিদের কাছে ততটা গুরুত্ব পায় না। ৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে শিয়াদের ষষ্ঠ ইমাম জাফর আস-সাদিকের মৃত্যুর পর ইমামের উত্তরাধিকার প্রশ্নে বিরোধিতা করে ইসমাইলি শিয়ারা আলাদা উপদল হিসেবে আবির্ভূত হয়; যার পরে তাদের থেকেও আলাদা বিশ্বাসের ঘরানা তৈরি করে দ্রুজদের ধর্মীয় নেতা হামজা ইবনে আলি। অথচ দ্রুজরা ইসলামের সর্বশেষ নবী রাসুল (সা.) শেষ নব্যুয়তপ্রাপ্ত ব্যক্তিত্ব মনে করে। জনগোষ্ঠীটির মধ্যে হিন্দু ধর্মমতের জন্মান্তরবাদের বিশ্বাস রয়েছে। ঈসা (আ.) ও মুসা (আ.)-এর মতো সেমেটিক নবী-রাসুলদের প্রতি তাদের বিশ্বাস অগাধ। কিন্তু এসব বিশ্বাস ও দর্শন কখনোই মধ্যপ্রাচ্যে তাদের স্বস্তিদায়ক পরিবেশ তৈরি করেনি। বরং ধর্ম বিশ্বাস ও গোপনীয়তার চর্চা সবসময়ই তাদের জুলুমের শিকারে পরিণত করেছে। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে, বাগদাদে সুন্নিপন্থি আব্বাসীয় খিলাফত উৎখাত হওয়ার বেশ আগে মোটামুটিভাবে ৯০০ শতকের দিকে ফাতিমীয়রা কায়রোয় আব্বাসীদের প্রভাব নস্যাৎ করে দেয়। কিন্তু নাটকীয় ব্যাপার হলো, নীল নদের তীরে দ্রুজদের ধর্মীয় দর্শনের পত্তন যেভাবে হয়েছিল, সেই নীল নদের অববাহিকায় তারা আর শেষ পর্যন্ত টিকতে পারেননি। ফাতিমীয়রাই একদিন তাদের বিতাড়িত করে। ইসমাইলিদের সঙ্গে ওই সময় থেকে বিশ্বাসগত ফারাক প্রগাঢ় হতে থাকে। দ্রুজদের ধর্মগুরু হামজা ইবনে আলির সঙ্গে ১০১৭ সালের দিকে বিরোধ তৈরি হয় ফাতেমীয় শাসক আল-হাকিম বিল্লাহর। এ সময় দ্রুজরা মিসর থেকে বিতাড়িত হয়ে সিরিয়া, লেবাবন, ফিলিস্তিনসহ নানা জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী সময় এসব এলাকায় দ্রুজদের জনগোষ্ঠী বিকাশ ততটা না হওয়ার কারণ হলো নিজ সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে ঐক্য ও যূথবদ্ধ থাকার স্বভাব এবং অন্যদের সঙ্গে চলাফেরায় অস্বস্তি।
মিসরে ফাতিমীয়দের আবির্ভাবের পর আব্বাসীয়রা রাজনৈতিকভাবে যখন তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবা শুরু করত, তখন নানা জায়গায় দ্রুজরা হুমকির মুখে পড়তেন। উসমানীয় খিলাফত (অটোম্যান সাম্রাজ্য) প্রভাব বিস্তার শুরু করলে দ্রুজদের ওপর নানা কায়দার নিষ্পেষণ দেখা গেছে। বিশেষ করে ১৮৬০ সালের একটি ঘটনার পর দ্রুজরা কঠিন চাপে পড়ে যায়। লেবাননে দ্রুজদের সঙ্গে খ্রিস্টান একটি গোত্রের দাঙ্গায় কয়েক হাজার হাজার খ্রিস্ট মতাবলম্বী নিহত হন। এই ঘটনার সাজা হিসেবে উসমানীয় শাসকরা দ্রুজদের ওপর ব্যাপক নিপীড়ন চালায়। ফাতিমীয় খিলাফতের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে এক হাজার শতকের পরে যারা লেবাননের পাহাড়ি এলাকায় এসেছিলেন, তারা মোটামুটিভাবে স্বাধীন সশাসিত রাজ্যের মতো বসবাস করত। পরে অটোম্যান শাসকদের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে শাসনাধিকার ও কর্র্তৃত্ব হারায় দ্রুজরা। এ সময় ব্যাপক অত্যাচার-নিপীড়ন ভোগ করেন দ্রুজরা। চলতি শতকেও যেখানেই দেখা যায়; অবস্থাদৃষ্টে মূলধারার বাইরের চিরনিপীড়িত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী মনে হয় তাদের। সিরিয়ার দ্রুজদের দ্বিতীয় বৃহত্তম বসতি লেবাননে, সেখানে সত্তরের দশকের গৃহযুদ্ধে তারা বর্বর আক্রমণ ও বাস্তুচ্যুতির শিকার হয়েছে।
লেখক: অনুবাদক ও লেখক
musfikur.muzahid1993@gmail.com