১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয় দিবস এবার নানা দিক দিয়ে ছিল গুরুত্বপূর্ণ। একে তো, দীর্ঘদিন বাদে আওয়ামী লীগ-শূন্য দেশে সরকারি তদারকি ছাড়াই স্বতঃস্ফূর্ত উৎসবের সাক্ষী থাকতে পেরেছেন সাধারণ মানুষ। কোথাও ছিল খেলার প্রতিযোগিতা, কোথাও বসেছিল মেলা, কোথাও আবার বাইচ বা ঘোড়দৌড়ের আসর। সেসব অবশ্যই পদ্মা পাড়ের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। আমার চেয়ে আপনারা সবাই অনেক বেশি জানেন। হয়তো কেউ কেউ এবার সক্রিয়ভাবে কোনো না কোনো ইভেন্টে যোগ দিয়েওছিলেন। ব্যক্তিগতভাবে ১৬ ডিসেম্বর আমার কাছেও খুব স্মরণীয়। ওই দিন আমার নানির জন্মদিন। আমি তখন নিতান্তই বালক। আর নানি বা দিদিমা, যাই বলি না কেন, তিনি তখন বেশ বয়স্কা। তিনি ছিলেন খুলনার বাসিন্দা। কবি হিসেবে খ্যাতি ছিল। ছিলেন মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। আমার মামাবাড়ি ছিল কমিউনিস্ট পার্টির ঘাঁটি। বিষ্ণু চ্যাটার্জি, রতন সেন, পুলিন পিপলাই, সুধীর চ্যাটার্জি, অনিল বিশ্বাস, ধনঞ্জয় দাশদের নিত্য আনাগোনা। রাজশাহী জেলের খাপরা ওয়ার্ডে পুলিশের গুলিতে শহীদ আনোয়ার হোসেন ছিলেন নানির অত্যন্ত স্নেহভাজন।
আমাকে যারা একটুও জানেন, তারা নিশ্চিত মানবেন যে আমি সচরাচর ব্যক্তি কাসুন্দি ঘাঁটি না। এবার একটু বললাম, বড় দুঃখে। যে খুলনার স্মৃতি শুনে শুনে আমার মানসিক জগৎ কিছুটা হলেও গড়ে উঠল; আমি যে আলটপকা রাজনীতি নিয়ে কথা বলি না বা রাজনৈতিক ছবি আচমকাই করতে শুরু করে দিয়েছি তা নয় তার পেছনে খুলনার ভূমিকা বিরাট। যে অসাম্প্রদায়িক খুলনাকে মা-দিদিমার চোখ দিয়ে জেনেছি, তা শেষ বার গিয়ে মনে হয়েছে অনেক বদলে গেছে। আমার মা, দিদিমার ১৯৪৭-এ বাধ্য হয়ে কলকাতা চলে আসা কিন্তু কোনো সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের অত্যাচারে নয়। একেবারেই পারিবারিক কারণে। কিন্তু এবার মনে হলো যে ইসলাম ফোবিয়া শুধু নির্দিষ্ট কোনো জনগোষ্ঠীর মধ্যে চারিয়ে যায়নি। এ এক আধিপত্যবাদী সংস্কৃতি, যা আদতেই মনুবাদী। তা ধর্ম নির্বিশেষে চারিয়ে গেছে অনেকের মনে। তারা সেটাকেই সেক্যুলার বলে চালাতে চান।
ফলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মাননীয় নরেন্দ্র মোদি যখন বাংলাদেশের বিজয় দিবসে মুক্তিযোদ্ধাদের যাবতীয় অবদানকে অস্বীকার করে ভারতীয় সেনাবাহিনীর মহান বিজয় বলে সোচ্চার হন, তখন আমি খুব একটা অবাক হই না। কারণ আমি নিশ্চিত যে বাংলাদেশের তথাকথিত ‘প্রগতিশীল’ লোকজনের কাছেও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যতটা শ্লাঘা যথেষ্ট, তার থেকে অনেক বেশি আজও রয়ে গেছে ভারত রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য। কারণ লেখক, চলচ্চিত্র পরিচালক, থিয়েটার কর্মীর বড় বাজার আছে ভারতে। ফলে নিজেদের ইতিহাস নিয়ে চিন্তাভাবনা করার থেকে ভারতের আধিপত্যবাদী সংস্কৃতি নিয়ে উচ্ছ্বসিত না হলে তো আবার প্রগতিশীল সাজা কঠিন।
নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ বা রাহুল, প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর বাংলাদেশের বিজয় দিবস নিয়ে বয়ান মোটের ওপর এক। বিতর্ক ততটুকুই যে সাবেক জনসংঘ অধুনা বিজেপি নয়, তৎকালীন কংগ্রেসের, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কৃতিত্বেই পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে পরাজিত করা সম্ভব হয়েছিল। এখন এই পাত্রধর তৈল না তৈলাধার পাত্র নিয়ে অনন্ত কাল বিতর্ক চলতে থাকুক কিন্তু মুক্তিবাহিনীর ভূমিকাকে খাটো করে দেখা শুধু সত্যের অপলাপ নয়, ইতিহাসের বিকৃতিও। বাংলাদেশের এক বিখ্যাত কবি এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কেউই একটি কথাও বললেন না ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী নেতাদের মন্তব্য নিয়ে। হতে পারে তারা দুজনেই আশ্রিত বলে মেরুদণ্ড বন্ধক রেখেছেন। কিন্তু বাংলাদেশে থেকে যাওয়া, শিল্পী-সাহিত্যিক, চলচ্চিত্র পরিচালক যারা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলে বলে কীর্তন শোনান, তারা কতজন মোদি বা রাহুল গান্ধীর হালের বাংলাদেশ নিয়ে কথাবার্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জানতে ইচ্ছে করে।
ইতিহাসের দিকে তাকান। মনে পড়তেই পারে, শীতের ঢাকায় পাকিস্তানের সেনানায়ক নিয়াজি যখন ভারত-বাংলাদেশ যৌথ কমান্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন, তখন আশ্চর্যজনকভাবে মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল ওসমানী ছিলেন অনুপস্থিত। বলা হয়ে থাকে তার বিমান দুর্ঘটনায় পড়েছিল বলে তিনি সঠিক সময়ে পৌঁছতে পারেননি। এটা আদৌ সত্য কি না বলা কঠিন। ফলে এত বছর বাদে নরেন্দ্র মোদি ও ভারতের অন্য নেতাদের বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক তুলে লাভ নেই। এমনিতেই বিশ্বরাজনীতির চালচিত্র পুরোপুরি পাল্টে গেছে। ষাট, এমনকি সত্তরের দশকেও যে আন্তর্জাতিকতা নিয়ে আমাদের গর্ব ছিল, তা এখন অন্তর্হিত। গ্লোবাল দুনিয়ার বাণী ফিন্যান্স ক্যাপিটাল বা লগ্নিপুঁজির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। স্বার্থে গ্লোবাল, বাস্তবে জাতীয়তাবাদের রমরমা এখন দস্তুর। তাই ভারতের শাসকরা যা বলেন, করেন এবং দেখেন তা বলাবাহুল্য সবই জাতীয়তাবাদী চোখ দিয়ে।
বাঙালি বনাম বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের দ্বন্দ্ব বাংলাদেশে বহুদিন ধরে। আওয়ামী লীগের বাঙালি জাতীয়তাবাদে বাঙালি ভাষা সংস্কৃতি ছাড়া অন্যের জায়গা নেই। বিপুল আদিবাসী, অবাঙালি, পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসী সবাই এক অর্থে ব্রাত্য। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ সেদিক দিয়ে অনেক বেশি ইনক্লুসিভ। কিন্তু যেহেতু বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের স্লোগান বিএনপি দলের মস্তিষ্ক থেকে বের হয়েছে তাই, ভাবটা এমন যে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চিন্তার বাইরে যা কিছু তাই-ই প্রতিক্রিয়াশীল।
ঢাকা কিংবা কলকাতার তথাকথিত সেক্যুলার গোষ্ঠী বাঙালি সংস্কৃতি বলতে প্রায়ই আধিপত্যবাদকেই একমাত্র বাঙালি জাতির কালচার বোঝেন। এই জায়গায় বাঙালি মুসলমানের সঙ্গে তাদের দ্বন্দ্ব আবহমানকাল ধরে চলে আসছে। আসবেও। এই মুহূর্তে ভারতের শাসকদের তাত্ত্বিক আইকন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের বয়ান হচ্ছে, ভারতের সংস্কৃতি আদতেই উচ্চবর্গের হিন্দু সংস্কৃতি। এই সুপ্রিমেসিই নতুন করে নানা সমস্যা করছে উপমহাদেশে। পানি না জল, গোসল না স্নান, পিসি অথবা ফুফু আপাত তুচ্ছ কিন্তু নিত্যব্যবহার্য এসব শব্দ নিয়ে আকচাআকচি এখন নিত্যদিনের লড়াইয়ের উপকরণ। পশ্চিমবঙ্গের বহু মানুষ দেখি ইদানীং, যারা প্রায়ই দম্ভভরে বলেন, আমরা, ভারত না থাকলে কি ‘তোরা’ স্বাধীন হতে পারতিস! এটা ঠিক যে ১৯৭১-এ ভারতের সর্বস্তরের মানুষ ‘নানা কারণে’ মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের পাশে ছিলেন। কিন্তু কোনো একবার পাশে ছিলেন বলে সারা জীবন মাথা নিচু করে কুর্নিশ করতে হবে, এই প্রত্যাশা অত্যন্ত অশোভন।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সমর্থন করার একাধিক কারণ ছিল ভারতের। তাই বলে লিবারেশন ওয়ারে বাংলাদেশের জনগণের অনন্যসাধারণ ত্যাগ, তিতিক্ষা, বুক চিতিয়ে লড়াই এসব আপনাকে মানতেই হবে। আপনি যদি কারোর লড়াইকে অস্বীকার করতে চান, যদি কাউকে সম্মান না করেন, কিন্তু সে আপনার সমর্থনের স্বীকৃতি দিয়ে নতজানু থাকবে কিংবা নিজে অপমানিত হতে থাকলেও আপনাকে সম্মান করেই যাবে এমন প্রত্যাশা না করাই ভালো। শাসকদের বিবৃতি আসলেই সুপ্রিমেসির প্রতিফলন।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অতীব দুই গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র চিত্তরঞ্জন সূতার ও কালিদাস বৈদ্য। দুজনেই ছিলেন চরম দক্ষিণপন্থি রাজনীতির লোক। বিস্ময়করভাবে শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগ্নে শেখ মনি, সিরাজুল আলম খান ও আরও প্রভাবশালী যুব নেতাদের কলকাতায় শেল্টার ছিল ভবানীপুরে চিত্তরঞ্জন সূতারের বাড়ি। চিত্তরঞ্জন বা কালিদাস কিন্তু কখনোই অস্থায়ী সরকারের প্রধান তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখেননি। বরং তাজউদ্দীন আহমদকে যে দু-দুবার প্রাণে মারার চেষ্টা হয়েছিল, শোনা যায় তার ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করা হয়েছিল ভবানীপুরের ডেরায় বসেই। আমার ধারণা কংগ্রেসের মধ্যেই ছিল চরম দক্ষিণপন্থি রাজনীতির লোকজন। যাদের উদ্দেশ্য ছিল অন্তত দেশের দক্ষিণ অংশকে হিন্দুরাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলা।
মুজিব বাহিনীর সঙ্গে দ্বন্দ্ব ছিল মুক্তিবাহিনীর। ফ্রন্ট লাইনের যুদ্ধে মুজিব বাহিনীর অংশগ্রহণ ও ভূমিকা নিয়ে নানা রকম কথা চালু রয়েছে। তাদের কাজ ছিল মূলত বামপন্থি রাজনীতির লোকজনকে যুদ্ধ থেকে দূরে রাখা। ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদের পক্ষে। যদিও তিনি মুজিব বাহিনী সম্পর্কে কিছু জানতেন না তা বলা যায় না। ভারতের রাজনীতিতে চাণক্য ছিলেন প্রণব মুখার্জি। সন্দেহ হয়, তিনি আগাগোড়া ছিলেন দক্ষিণপন্থি। পরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের হস্তক্ষেপ নিয়ে যে অভিযোগ, তার পেছনেও প্রণব মুখার্জির ভূমিকা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ফলে আজকের বাংলাদেশ নিয়ে ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি নতুন নয়। এর শেকড় লুকিয়ে রয়েছে পুরনো ইতিহাসে। বাংলাদেশ ফোবিয়া যে বাড়ছে তা হালের একাধিক ভারতের সিনেমা দেখলেও বোঝা যায়। পাকিস্তানবিরোধী বিষয়বস্তু তামাদি হয়ে গেছে। কাল্পনিক শত্রু হিসেবে নতুনভাবে পড়শি দেশকে না বেছে নিলেই কিন্তু ভালো হতো।
ব্যক্তিগত আলাপচারিতা দিয়ে লেখা শুরু করেছি। শেষ করব ব্যক্তিকথন দিয়েই। আমার নানির জন্মদিন ১৬ ডিসেম্বর। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার খবরে তিনি বলে উঠেছিলেন, খুব আনোয়ারের কথা মনে পড়ছে। তিনি নিশ্চিত জানতেন না, আনোয়াররা পরে প্রগতিশীল কলকাতাতে শুধু মুসলমান বলেই অপর হয়ে বেঁচে থাকবে।
লেখক: ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক
sdastidar27@gmail.com