মিয়ানমারের বাস্তবতায় কী করবে বাংলাদেশ

ঢাকা থেকে দামেস্ক ও বৈরুতের দূরত্ব যথাক্রমে ৬ হাজার ২০৯ এবং ৬ হাজার ৩২৪ কিলোমিটার। সেই তুলনায় নেপিডো নিকটবর্তী রাজধানী। মাত্র ১ হাজার ৩৩৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। অথচ এ দেশের সংবাদপত্র, টিভি চ্যানেল ও ফেসবুক-জাতীয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্ল্যাটফর্মে সিরিয়া কিংবা লেবানন যুদ্ধ নিয়ে তুমুল আগ্রহ দেখা গেলেও গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত পড়শি মিয়ানমার সম্পর্কে আলোচনা নেই বললেই চলে।

আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে বিশ শতকের ষাটের দশকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম অগ্রসর দেশ ছিল মিয়ানমার। দীর্ঘ সামরিক শাসন তাদের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানব উন্নয়ন সূচকের মাপকাঠিতে তারা ক্রমেই পিছিয়ে পড়েছে। ২০১১ সালে জান্তার মুঠো কিঞ্চিৎ আলগা হয়েছিল। বেসামরিক সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর অর্থনীতিতে প্রাণসঞ্চারিত হয়। মধ্যবিত্ত শ্রেণির পুনরুত্থান ঘটছিল ধীরে ধীরে। মিয়ানমারের সামরিক জান্তা তাতমাদো নামে পরিচিত। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তারা এক অভ্যুত্থানে দেশটির গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে। ক্ষমতা আবার তাদের কুক্ষিগত হয়। এর প্রতিবাদে জনতার স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ রূপ নেয় নজিরবিহীন সশস্ত্র জান্তাবিরোধী লড়াইয়ে। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে তাতমাদো নিজ দেশের জনগণের ওপর প্রবল আক্রোশে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

কোণঠাসা তাতমাদো : গত দুই মাসে শান, কারেন ও কারেন্নি প্রদেশে এবং মান্দালয় ও সাগাইং অঞ্চলের সাধারণ নাগরিকদের লক্ষ্য করে জান্তা সরকার নির্বিচার বিমান হামলা চালিয়েছে। শুধু আগস্ট মাসেই ৩৫০ বার বিমান হামলার শিকার হয়েছে গণতন্ত্রকামী জনতা।

সম্প্রতি বিবিসির অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, রাজধানী নাইপিদো, ইয়াঙ্গুন ও মান্দালয়ের মতো প্রধান শহরগুলোর অর্থাৎ মাত্র ২১ শতাংশ ভূমির নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ জান্তা এখনো ধরে রেখেছে। দেশের ৪২ শতাংশ এলাকা চলে গেছে প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোর দখলে। বাকি ২৯ শতাংশ এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে জোর লড়াই চলছে। বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার চীনের সঙ্গে দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী মান্দালয়ের সংযোগ রক্ষাকারী ৪৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ মহাসড়কের বড় অংশ প্রতিরোধ গোষ্ঠী দখল করে নিয়েছে অক্টোবর মাসে।

জান্তাবিরোধীদের কাছে ভারী অস্ত্রসমেত জান্তাবাহিনীর আস্ত ব্যাটালিয়ন আত্মসমর্পণ করছে, এমন খবর আকসার পাওয়া যাচ্ছে। গত সপ্তাহেই যেমন দক্ষিণ চীন প্রদেশে জান্তা সরকারের অনুগত ১৬৮ সৈন্য ও পুলিশ সপরিবারে চীন ব্রাদারহুডের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে, তেমনি স্থলপথে সৈন্যদের কাছে রসদ সরবরাহ করাও তাতমাদোর জন্য মুশকিল হয়ে গেছে। গেরিলা অ্যামবুশের ভয়ে ব্যাটালিয়ন আকারের ইউনিট ছাড়া তারা কোথাও যাওয়ার সাহস করছে না।

গৃহযুদ্ধ পরিণতির দিকে পৌঁছে গেছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, বড়জোর এক বছরের মধ্যে প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো ইরাবতি বেসিন অর্থাৎ ইয়াঙ্গুন, নেপিডো ও মান্দালয় জুড়ে বিস্তীর্ণ এলাকা কবজা করতে সক্ষম হবে। সেপ্টেম্বর মাসে তাতমাদো প্রথমবারের মতো প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো রাজনৈতিকভাবে এই সংকটের সমাধান করার অর্থাৎ আপসের প্রস্তাব দিয়েছে। প্রত্যাশিতভাবেই বিদ্রোহীরা জান্তার ফাঁদে পা দেয়নি। মান্দালয় পিপলস ডিফেন্স ফোর্সের কমান্ডার সো থু ইয়া জাও মন্তব্য করেন, তারা ছাগলের মাথা ঝুলিয়ে কুকুরের মাংস বেচার চেষ্টা করছে। কারেন ন্যাশনাল ইউনিয়নের মুখপাত্র পাডো সাও তাও নি স্পষ্টভাবে জানান, ভবিষ্যতে মিয়ানমারের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর কোনো অংশগ্রহণ থাকবে না এবং এ পর্যন্ত সংঘটিত সব অপকর্মের দায় নিতে হবে এই শর্তে রাজি হলে তাতমাদোর সঙ্গে তারা আলোচনায় বসবে।

কোণঠাসা জান্তা সরকার এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে নির্দেশ জারি করে, ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী সব পুরুষ এবং ১৮ থেকে ২৭ বছর বয়সী সব নারীকে বাধ্যতামূলকভাবে দুই বছরের জন্য সামরিক বাহিনীতে যোগ দিতে হবে। অনূর্ধ্ব ৪৫ বছর বয়সী পেশাজীবীদের ক্ষেত্রে সামরিক দায়িত্ব পালনের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয় তিন বছর। জোরপূর্বক নিয়োগ করা ২৫ হাজার সৈন্যের মধ্যে পাঁচ হাজারজনকে নামমাত্র প্রশিক্ষণ দিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে রণক্ষেত্রে।

সেনাবাহিনী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল নিহত সেনাদের পরিবারের কাছে বেতন ও পেনশনের অর্থ পৌঁছে দেওয়া হবে। সেই প্রতিশ্রুতিও তাতমাদো রাখতে ব্যর্থ। নিহত এক সেনার বিধবা চাও সু জানান, গ্রামপ্রধান তাকে মাত্র ৭০ হাজার কিয়াট বা চার হাজার টাকা দিয়েছে। আর কোনো আর্থিক সহায়তা তিনি পাননি।

পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তরুণরা সহায়-সম্বল বিক্রি করে, কেউ কেউ ধারদেনা করে হলেও ঘর ছাড়ছে পাশের দেশগুলোয় আশ্রয় গ্রহণের উদ্দেশ্য। দূতাবাসগুলোর সামনে অপেক্ষমাণ মানুষের ভিড় দীর্ঘ হচ্ছে। তাতমাদোর নজরদারি এড়িয়ে যারা থাইল্যান্ডে প্রবেশের চেষ্টা করছে, তাদের অধিকাংশকেই থাই সীমান্তরক্ষীরা ফেরত পাঠাচ্ছে। যারা কোনোভাবে ঢুকে পড়ছে, তাদেরও সহসা নিস্তার মিলছে না। অবৈধ অভিবাসী হওয়ায় উচ্চশিক্ষিত পেশাজীবীরা তাদের দক্ষতা অনুযায়ী কাজের সুযোগ পাচ্ছেন না।

মিন মিন নামের এক প্রকৌশলী বিবিসিকে জানিয়েছেন, তিনি শিক্ষা ভিসায় থাইল্যান্ডে আশ্রয় পেয়েছেন। ভিসার মেয়াদ ফুরিয়ে গেলে স্বল্প মজুরিতে শ্রমিকের চাকরি জোটানো ছাড়া তার সামনে আর কোনো বিকল্প নেই। থাই ব্যবসায়ীরাও মিয়ানমারের শরণার্থীদের অল্প পয়সায় খাটিয়ে নেওয়ার সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে। চীন উদ্বাস্তুদের একাংশ ভারতের মিজোরামে আশ্রয় নিয়েছে। রাখাইন প্রদেশ থেকে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে, ২ লাখ মালয়েশিয়ায় এবং ৪০ হাজার ভারতে অবস্থান করছে।

অর্থনৈতিক মন্দা প্রকট : প্রায় চার বছর ধরে চলমান গৃহযুদ্ধ মিয়ানমারের জনজীবনকে ওলটপালট করে দিয়েছে। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা করোনা মহামারীর আঘাতে দেশটির দুর্বল অর্থনীতি আরও ভেঙে পড়ে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে। গৃহযুদ্ধ থামার কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না। এদিকে বিদ্যুৎ সংকটের ফলে কারখানাগুলোয় উৎপাদন বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে। অমৌসুমে প্রবল বৃষ্টিতে সৃষ্ট বন্যায় বিপর্যস্ত হয়েছে কৃষিজমি ও প্রাণিসম্পদ। টাইফুন ইয়াগির আঘাতে মিয়ানমারের ৩৩০টি শহরের ৭০টি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

অন্যদিকে চীন ও থাইল্যান্ড সীমান্তে বিদ্রোহী-জান্তার তীব্র সংঘর্ষে আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্য প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম। গৃহযুদ্ধের প্রভাবে ধাক্কা লেগেছে মিয়ানমারের তৈরি পোশাক খাতেও। গার্মেন্টস কারখানাগুলোয় গ্রামাঞ্চলের লাখ লাখ নারী কাজ করত। পূর্বাভাস ছিল, ২০২৬ সাল নাগাদ ১৬ লাখ নারীর কর্মসংস্থান হবে শুধু তৈরি পোশাক খাতে। লড়াই শুরু হওয়ার পর বহু কারখানায় তালা ঝুলছে। বিদেশি ক্রেতারা অন্য দেশে ব্যবসা সরিয়ে নিয়েছে। বিদেশি অনেক কোম্পানিও পাততাড়ি গুটিয়েছে নিরাপদ গন্তব্যের খোঁজে।

সব মিলিয়ে মিয়ানমারের অর্থনীতি ভয়ানক চাপে। এ বছর দেশটিতে মূল্যস্ফীতি ২৬ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। ডিম ও টুথপেস্টের মতো জিনিসপত্রের দাম তিন গুণ বেড়েছে। ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সমীক্ষা অনুযায়ী, মিয়ানমারে খাবার খরচ বেড়েছে ১৬০ শতাংশ! ডলারের বিপরীতে তাদের মুদ্রা কিয়াটের মূল্যমান ৪০ শতাংশ কমেছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিয়ানমারের অর্ধেক মানুষ বর্তমানে দারিদ্র্যকবলিত।

গৃহযুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও উদ্ভূত প্রবল অর্থনৈতিক সংকট মিয়ানমারে এক নির্মম বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে। সম্প্রতি নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে ভয়াবহ তথ্য উঠে আসে। দুর্মূল্যের বাজারে স্রেফ বেঁচে থাকার তাগিদে ডাক্তার, শিক্ষক, নার্স এবং অন্য উচ্চশিক্ষিত পেশাজীবী নারীরা দেহব্যবসা করতে বাধ্য হচ্ছেন। টুকরো টুকরো এই ঘটনাগুলো জোড়া দিলে মিয়ানমারের জনজীবনের দুর্ভোগ সম্পর্কে কিছুটা আভাস পাওয়া যায়। জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটিতে অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুর সংখ্যা ৪০ লাখ, প্রতিবেশী দেশগুলোয় শরণার্থী হয়েছে কমপক্ষে ১৫ লাখ মানুষ, রাষ্ট্রহীন রোহিঙ্গার সংখ্যা অন্তত চার লাখ। চলমান গৃহযুদ্ধর ফলে মানবেতর জীবনযাপন করছে আড়াই কোটি মানুষ। ২০২৫ সালে এদের মধ্যে প্রায় দুই কোটি মানুষের জন্য জরুরি ভিত্তিতে খাদ্য সহায়তা প্রয়োজন হবে।

কূটনৈতিক সুযোগ বাংলাদেশের সামনে : হাদিস সংকলন বায়হাকি শরিফে বর্ণিত আছে, প্রতিবেশীকে অভুক্ত রেখে যে পেট পুরে খায়, সে বিশ্বাসী নয়। ভয়াবহ মানবিক সংকটের মুখোমুখি মিয়ানমারের সাধারণ নাগরিকদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া প্রথমত নৈতিক দায়িত্ব। ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ থেকেও বাংলাদেশের উচিত হবে তাতমাদো-পরবর্তী মিয়ানমারের পুনর্গঠনে ইতিবাচকভাবে অংশগ্রহণ করা।

প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে মৈত্রী গড়তে আন্তর্জাতিক কূটনীতির এই কৌশল সুপ্রাচীনকাল থেকে রাষ্ট্রনায়করা প্রয়োগ করে আসছেন। সপ্তম শতকের আরবে খন্দক যুদ্ধের পর দুর্ভিক্ষকবলিত প্রতিপক্ষ নগরী মক্কায় খাদ্যশস্য পাঠিয়েছিলেন হজরত মোহাম্মদ (সা.)। তার এই উদারতা মদিনাকেন্দ্রিক রাষ্ট্রটির প্রতি মক্কাবাসীর মনোভাব বদলে দেয়। ফলে মক্কার যুদ্ধবাজ গোত্রপতিরা বিদ্বেষ ও জিঘাংসার জিগির আবার তোলার চেষ্টা করলেও তা আর ধোপে টেকেনি।

স্বাধীনতার পর থেকে মিয়ানমারের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরির কার্যকর উদ্যোগ খুব একটা দেখা যায়নি। নানা দিক দিয়েই ২০২৪ ছিল বাংলাদেশের জন্য আত্ম-আবিষ্কারের বছর। আগামী বছর বিশ্বমঞ্চে বিশেষত দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নিজেদের শক্তিশালী কূটনৈতিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থান নির্মাণের সূচনা হতে পারে মিয়ানমারের সঙ্গে আস্থা ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক করার মধ্য দিয়ে।

লেখক: লেখক ও অনুবাদক

rezwanur1991@gmail.com