ব্রিটিশ বনেদি সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট দুই হাজার চব্বিশ সালের সেরা দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে। তাদের গত সপ্তাহের সংখ্যায় এ সংক্রান্ত খবরে তারা উপ-শিরোনাম দিয়েছেন ‘বাংলাদেশ বিগিনস এগেইন’। চব্বিশ চলে যাওয়ার জোগাড়যন্ত্র করছে যখন, তখন ভাবতেই হচ্ছে কেন এবং কীভাবে বাংলাদেশের এই নতুন পরিচয়প্রাপ্তি। সবাই জানে অসম্ভব ঘটনাবহুল ছিল চব্বিশ সাল। তিনশ পঁয়ষট্টি দিন, আট হাজার সাতশ ঘণ্টার ঘনঘটা সাঙ্গ করে চব্বিশ প্রস্থান করবে, পঁচিশ এসে পাতবে সংসার। কিন্তু এই যে নিত্য চলে যাওয়া-আসা, দেখার বিষয় যে কালের কপোলতলে কী রেখে গেল বা যাবে এসব পঞ্জিকাবর্ষ প্রবরেরা? সমাজ সংসার দেশ ও দুনিয়ার অভিজ্ঞতার ভান্ডারে কী জমবে বা কেমন দাঁড়াবে তার যোগ-বিয়োগের জমা খরচের জের?
দুই হাজার চব্বিশে বাংলাদেশ অবশ্যই ছিল ঘটনাবহুল। এ বছরটিতে মানবিক বিপর্যয়, মূল্যবোধ ও বিশ্বাসের ভান্ডারে অনেক বিস্ময়, বৈপরীত্য ও বিতর্ক তুলনামূলকভাবে অবশ্য বেশিই ঘটেছে, জমেছে। মার্কিন মুলুকে মাতবরের পরিবর্তন, ভারতের টলটলায়মান মাদবরি, ইরানে বারবার নক্ষত্র পতন, ইসরায়েলের আস্ফালন, পুতিনের অপ্রতিরোধ্য প্রত্যাশা নিয়ে টিকে থাকা, সিরিয়ায় নতুন মোড় এবং বলা বাহুল্য বাংলাদেশে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের তোড়ে ক্ষমতাসীনদের প্রস্থান বা পলায়ন। সিলেট, ফেনী, নোয়াখালীতে বড় বন্যা, মিয়ানমারে মানবিক বিপর্যয়ে আপতিত রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অব্যাহত অবস্থান, প্রতিবেশী দুই বড় ভাইয়ের ঠান্ডা যুদ্ধের মহড়ার উত্তপ্ত হওয়া এসব নিয়ে চব্বিশ ছিল অঘটনঘটনপটিয়সী। চবিবশে অনেক আত্মত্যাগ ও মৃত্যু। বছর দুই-তিন আগে করোনার কোপানলকে ছাড়িয়ে গেছে চব্বিশের আন্দোলন। আন্দোলনে ছাত্র-জনতার সঙ্গে বর্ষীয়ান নেতা-রাজনীতিক, শিল্পপতি, আইনজ্ঞ, বরেণ্য বুদ্ধিজীবী, প্রজ্ঞাবান প্রকৌশলী, লেখক, শিল্পী, অভিনেতা, কলাকুশলী কে না ছিলেন সেই মৃত্যুর মিছিলে!
২০২৪-এ প্রতিষ্ঠিত অনেক সত্য, সার্বিক সুন্দর ও স্বাভাবিকের বাইরে ঘটেছে অনেক কিছুই। ব্যক্তি সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার অব্যাহত অভিযাত্রা যেমন ছিল, অর্থনীতি ও রাজনীতিও তেমন প্রত্যক্ষ করেছে পটপরিবর্তনের নানান নাটক। দেশে-বিদেশে সংক্ষুুব্ধ উত্তাল উদ্দামের উম্মীলন সহসা স্তিমিত হয়নি। অনেক কিছুই সম্পূর্ণ বিপরীত বলয়ে চলে গিয়েছে যেমন বড় ঝড়ের পরে নেতিয়ে পড়ে প্রকৃতি। সে কি ক্লান্ত হয়ে, শ্রান্ত হয়ে নাকি কোনো সে জাদুবলে? নিশ্চয়ই না। তবে সেটি কি বৃহত্তর ব্যর্থতার মরা কাটালে বন্দি, না অন্য কিছু। হয়তো বা সেটি একটি দূরবর্তী মন্দার আভাস দিয়ে, নিম্ন চাপের আগে তাপমাত্রায় যেমন ঘটে অস্থিরমতিত্বের প্রভাব কিংবা ভালোভাবে সুপ্ত আগ্নেয়গিরির লাভা উদগীরণের মতো নব-উদ্যমের সর্বনাশের সংগঠনের প্রেরণা।
২০২৪ বাংলাদেশের সমাজ ও অর্থনৈতিক জীবনে এই সত্যের ও তত্ত্বের জানান দিয়ে গিয়েছে যে, অর্থনীতি রাজনীতিকে এবং দৈনন্দিন জীবনযাপন বা অবলম্বনের বাস্তবতা তথাকথিত আবেগকে টপকিয়ে যাওয়ার পথ ধরেছে। অন্যের গোষ্ঠীগত স্বার্থ উদ্ধারের সঙ্গে সবসময় থাকতে আমজনতা দ্বিধান্বিত ও ক্রুদ্ধ। যে আমজনতার কল্যাণের কথা বলে বারবার তাদের মাড়িয়ে সিঁড়ি ভাঙা হয়েছে সে প্রবোধ ও উৎসাহে ভাটা তো পড়ছেই, কুপোকাতও হয়েছে। সুদূর ইতিহাসের আবেগ ও চেতনা দিয়ে বর্তমানের মহামারী ম-িত বিড়ম্বনাময় সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবন-সংগ্রামের বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা শাসকদের পক্ষে আর সম্ভব হয়নি। উপরন্তু নতুন চিন্তাচেতনা উপেক্ষার পাশাপশি দুর্নীতি, সিন্ডিকেট সৃষ্ট পরিস্থিতি ঢাকতে মন্ত্র-তন্ত্র হিসেবে মানুষের যান্ত্রিক জীবনে যে আবেগ সৃষ্টি করতে চেয়েছে, নানান খিস্তিখেউড়ে তা অপাঙ্্ক্তেয় নিস্পৃহতার বলয়ে চলে গিয়েছে সেসব বিব্রতকর ব্যস্তসমস্ত জীবন ও তার কর্মপ্রক্রিয়ার প্রহরে। বিস্ময়ের পর বিস্ময়ের উদ্রেক ঘটেছে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে। অন্তত শতাধিক সাজানো বানানো ঘটনা এসেছে বিব্রতকর পরিস্থিতিকে ধামাচাপা দিতে। সংবছরে জাতীয় দৈনিকে লাল অক্ষরের যত শিরোনাম হয়েছে সেগুলোর পর্যালোচনায় দেখা গিয়েছে অবারিত ষড়যন্ত্র, জনগণকে ধোঁকা দেওয়া, দ্রব্যমূল্য, এমনকি ডলারের ঢলাঢলির কারণে করুণ প্রস্থান, বড় দাগের দুর্নীতি, অর্থপাচার, খেলাপি ঋণ, অর্থ আত্মসাৎ, অপব্যয় অপচয়ে তহবিল তছরুপের অন্তর্ঘাতে ছিল অর্থনীতি।
বিশ্বাস ও আস্থায় ফাটল ধরেছিল চব্বিশে সবচেয়ে বেশি। অর্থনীতিতে এমন সব বিস্ময়কর উত্থান-পতন প্রত্যক্ষ করেছে সবাই যা প্রথাগত, প্রতিষ্ঠানগত, প্রতিষ্ঠিত নিয়মকানুনের বাইরে ঘটেছে। নানান পথ পদ্ধতিতে অর্থের চোরাচালান বেড়েছে। বিদেশে পুঁজির উড়াল ঘটেছে, দেশে দক্ষ জনবলের সংকট দেখিয়ে বিদেশি বুদ্ধিদাতার কর্মসংস্থান অব্যাহতভাবে হয়েছে, চোরাগোপ্তা পথে অবিরাম টাকা পাচার, আদম ব্যাপারীর অতি লোভের কারণে বিদেশ গমন ও প্রত্যাগতদের ভারে আরও কাহিল হয়েছেন রেমিট্যান্সযোদ্ধারা, বেকারের ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়ে অর্থনীতি। ব্যক্তি খাতে সঞ্চয় এবং বিনিয়োগ বাড়তির পথে তো নয়ই, বরং সনাতন সামর্থ্য ও ধ্রুপদ পুঁজির অস্তিত্ব রক্ষার ধারণা হোঁচট খেয়েছে বারবার। বারবার চাঙা হতে চেয়েছে, আদৌ দাঁড়াতে পারেনি পুঁজিবাজার, ঘাপটি মেরে বসেছিল প্রথাগত ষড়যন্ত্র।
বিদায়ী বছরে মনিটারি পলিসিগুলো সুশীল শব্দের সৌকর্যে ঐশ্বর্যে ভরপুর থাকলেও বাস্তবায়নের বেলাতে সেখানে যেন ‘কেউ কোনো কথা রাখেনি’। মনিটারি পলিসি প্রণেুাদের পক্ষপাতিত্বের পরাকাষ্টায় পালিয়ে বাঁচতে চেয়েছেন তারা, যারা নিজস্ব নিয়মে যে যা পেরেছিলেন সামাল দিতে চেষ্টা করেছিলেন ঘাটতির, তারল্য সংকোচনের। আবার সেই অস্বাভাবিক অবস্থাকে স্বাভাবিকের তকমা পরিয়ে সাফল্য হিসেবে দেখার ভান করেছিলেন অনেকে। স্বাস্থ্য খাতের দৈন্যদশা ও দুর্নীতির চিত্র উন্মোচিত হয়েছে, গুণগতমান সম্পন্ন প্রকৃত শিক্ষার দুয়ার বন্ধ করে পড়াশোনার পাঠ চুকে গেছে শত-সহস্র শিক্ষার্থীর। বিস্মিত হয়েছে সবাই। পাবলিক মানি মোটা দাগে উৎপাদন-অনুৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ ও ব্যয়ে অব্যাহত থাকার বছর ছিল ২০২৪-এর জুলাই অবধি।
যে প্রেক্ষাপটে আসবে পঁচিশ তাতে কেমন ধারা সূচিত হবে দেশ সমাজ ও অর্থনীতিতে? এ জন্যই নিকট ও দূরের দিনগুলোর দিকে তাকাতেই হয়। ব্যাংকের তারল্যে ও তদ-উৎসারিত সংকট একদিকে ঋণপ্রবাহ সৃষ্টির ক্ষেত্রে যেমন, অপরদিকে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও বন্ধ্যত্বের বলয়ে বন্দি যেন না হয় অতি অলস তারল্য, বেসরকারি বিনিয়োগ। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অতি অস্বাভাবিক অধোগতি অর্থনীতির রক্তে শর্করা কমে যাওয়ার আলামত হিসেবে যেন না থাকে, অর্থনৈতিক স্থবিরতায় এই অর্থের প্রায়োগিক প্রতিদান বা প্রতিফল বিপরীত কোনো অভিঘাত যাতে সৃষ্টি না হয় তা দেখার বিষয় থেকে যাচ্ছে। ক্যাপিটাল মেশিনারির আমদানির সঙ্গে উৎপাদনশীলতা উৎপাদন উৎপ্রেক্ষার মেলবন্ধন ঘটার আবশ্যকতা অনিবার্য। এভাবে সেভাবে পুঁজি পাচারের দুর্ভাবনা নতুন বছরের মাথাব্যথার কারণ হিসেবে যেন না থাকে। নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষিপণ্য যা সহজাত, অ-আমদানিজাত তার উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে, মূল্য অসহনীয় অব্যাহত থাকবে যদি না প্রকৃতি সদয় থাকে। স্থানীয় উৎপাদিত পণ্য দ্রব্যমূল্যের ঘোড়াকে পোষ মানাতে পারবে, কিন্তু আমদানিনির্ভর পণ্যের ক্ষেত্রে বিশ্ববাজারে দর ও দাম পড়ে গেলেও অভ্যন্তরীণ বাজারে তার দাম কমার নাম যদি না থাকে তাহলে এটি এক ধরনের অ্যালার্জি হিসেবে গাত্রদাহের কারণ হবে। তেল বা জ্বালানি খাতের এমন কিছু উপাদান উৎপাদনে এবং তার সামষ্টিক ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করবে সামষ্টিক উৎপাদনশীলতা ও ব্যক্তি বিনিয়োগের আগ্রহ সামর্থ্য ইত্যাদি। এটি ধরে রাখতে না পারলে বেপথে চলে যাবে মহার্ঘ বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয়ে আমদানি করা সামগ্রী অন্যের সংসারে। ফিসক্যাল পলিসি কাগজেকলমে নয়, বাস্তবে তার সদয় উপস্থিতির আবশ্যক হবে, অনিবার্য হবে তার সঠিক প্রয়োগ।
চব্বিশ সাল ছিল ‘এস ডিজি’ বাস্তবায়নের দশম বছর। আগেই করোনায় লন্ডভন্ড হয়ে গিয়েছিল বাস্তবায়ন মেট্রিক্সের ম্যাপ। মিলিনিয়াম দশটি গোলের বেশ কয়েকটি সামাজিক খাতে বাংলাদেশের অগ্রগতি ছিল সন্তোষজনক। তবে এটি একক কোনো সময় বা সরকারের কৃতিত্ব নয়, এ কৃতিত্ব আমজনতার। কিন্তু এখন পর্যন্ত অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বৈষম্য দূরীকরণ, দক্ষতা উন্নয়ন, বিকেন্দ্রীকরণগত সূচক বা শর্তগুলোতে বাংলাদেশের অগ্রগতি যৎসামান্য। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা পরিবেশ সৃজনে, সম্পদ ও সুযোগের সুষম বণ্টনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে এখনো আরও কিছু প্রতিবন্ধকতা পেরুতে হবে। সমস্যার ভারে কম্পমান কিংবা নিকট অতীতের প্রগলভ আত্মতৃপ্তির ধোঁয়াশে পরিবেশে যেন অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর প্রতি যত্নবান হওয়ার আগ্রহ তলিয়ে না যায়।
লেখকঃ উন্নয়ন অর্থনীতির বিশ্লেষক
mazid.muhammad@gmail.com