অতীত মানুষকে ভাবায়, ভীষণভাবে তাড়িত করে। যে ভাবনা ও তাড়না কাউকে মোলায়েম সুখ দেয়, কাউকে দেয় বিষাক্ত দুঃখ। গত হওয়া দিনগুলোয় এক-একটি অর্জন কিংবা বিসর্জনের পুঁতি দিয়ে গাঁথা হয় সফলতা কিংবা ব্যর্থতার অদৃশ্য মালা। এ মালা প্রত্যেকেই বহন করেন চেতনে কিংবা অবচেতনে। যারা চেতনে বহন করেন, তাদের উদ্দেশেই আজকের লেখা। আর যারা অবচেতনে বহন করেন, তাদের আগে জাগ্রত করতে হবে। কেননা তারা নামমাত্র জীবিত আছেন। তাদের অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ বলতে কিছু নেই। তাদের জীবনের কোনো লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নেই। তারা একদিন মায়ের জঠর থেকে ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন। পৃথিবীর আলো-বাতাসে একটা জীবন অযথা খরচ করেছেন। অতঃপর পাথেয় ছাড়াই পরকালের পথে যাত্রা করেছেন। মহান আল্লাহ তো অযথা জীবনযাপন করার জন্য পৃথিবীতে পাঠাননি। তিনি পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন নির্দিষ্ট কিছু দায়িত্ব দিয়ে। মানুষ তার ইবাদত-বন্দেগি করবে, তার নির্দেশনা মেনে চলবে, সৎকাজ সম্পাদন করবে এবং অসৎকাজ থেকে বিরত থাকবে। এই কাজগুলো ছাড়া মানুষ পৃথিবীতে যত বড় অর্জনই করুক না কেন, তা পরকালে অযথাই হবে। এমন অনেক মানুষ পৃথিবী থেকে গত হয়েছেন, যাদের এই বোধটুকুও জাগ্রত হয়নি। কিংবা জাগ্রত হলেও হেলায় কাটিয়েছেন জীবন। মহান আল্লাহ তাদের সব পাপ ক্ষমা করুন।
আল্লাহতায়ালা মানুষকে এজন্যই সৃষ্টি করেছেন যে, মানুষ তার ইবাদত করবে। আবার শয়তানের ধোঁকায় পড়ে গুনাহেও লিপ্ত হবে। অতঃপর অনুধাবন করবে যে, সে গুনাহ করে ফেলেছে। এই অনুধাবন ও বোধ মানুষের ভেতরে অনুশোচনা জাগাবে। সেই অনুশোচনায় পুড়ে অনুতপ্ত হয়ে মানুষ আবার মহান আল্লাহর পথে ফিরে আসবে। আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করবে। আর দয়ালু আল্লাহ গুনাহগার অনুতপ্ত বান্দাকে ক্ষমা করে দেবেন। অতঃপর বান্দা আবার গুনাহে লিপ্ত হবে, আবার অনুশোচনায় পুড়বে, আবার ক্ষমাপ্রার্থনা করবে আর মহান আল্লাহ আবার ক্ষমা করে দেবেন। এভাবে বান্দা যতবার ভুলপথে পা বাড়াবে, অতঃপর আবার ফিরে আসবে, ততবার মহান আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেবেন। তাই মানুষ পাপ করবে, আবার ক্ষমাপ্রার্থনাও করবে, এটাই স্বাভাবিক।
একটি বছর শেষ হতে যাচ্ছে। এ সময় সবার কর্তব্য হলো অতীতের ভুল ও গুনাহের হিসাব কষা। যেসব গুনাহ হয়ে গেছে, তা থেকে মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করা এবং নতুন করে পুণ্যের পথে চলার শপথ করা। শয়তানের কাজ মানুষকে বারবার মূল উদ্দেশ্য ভুলিয়ে দেওয়া। জান্নাতের পথ থেকে পথভ্রষ্ট করা। জাহান্নামের দিকে পরিচালিত করা। মানুষের তৎপরতা যত বৃদ্ধি পায়, শয়তানের কুমন্ত্রণা তত শক্তিশালী হয়। শয়তান নানাভাবে মানুষকে গুনাহের পথে প্ররোচিত করে। এ প্ররোচনায় মানুষ গুনাহের পথে ধাবিত হয়। মহান আল্লাহর অবাধ্য হয়ে নিষিদ্ধ কাজে পা বাড়ায়। অনেক সময় বড় বড় গুনাহের কাজ করে ফেলে। মুমিন ব্যক্তি শয়তানের প্ররোচনায় গুনাহ করে, আবার অনুধাবন করার সঙ্গে সঙ্গে মহান আল্লাহর কাছে ফিরে আসে। তার কাছে নিজের গুনাহের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করে।
জীবন চলার পথে মানুষ ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় অনেক ধরনের গুনাহে লিপ্ত হয়ে যায়। তাই গুনাহ করার সঙ্গে সঙ্গে তওবা করা ও ক্ষমা চাওয়া কর্তব্য। তওবা উভয় জগতে সফলতা লাভের বড় মাধ্যম। আন্তরিক তওবার মাধ্যমেই শুধু আখিরাতে মুক্তি সম্ভব। তওবা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ ও অসন্তুষ্টি থেকে বাঁচার উপায়। এটি পাপ মুছে দেয়, ভুলত্রুটি ঢেকে রাখে, মানুষকে সঠিক পথ দেখায়। এজন্য রাসুল (সা.) ও তার সাহাবিরা নিয়মিত ভালো আমল করা সত্ত্বেও অল্প ঘুমাতেন, শেষ রাতে আল্লাহর কাছে ইসতেগফার ও ক্ষমাপ্রার্থনা করতেন। পাপের কারণে ইমানি শক্তি প্রায় অকার্যকর হয়ে যায়। সেজন্যই তওবাকারীকে নতুন করে ইমানের ঘোষণা দিতে হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘চোর যখন চুরি করে, তখন সে মুমিন থাকে না। জিনাকারী যখন জিনা করে তখন সে মুমিন থাকে না।’ (সহিহ মুসলিম) অর্থাৎ তখন তার মধ্যে ইমানি চেতনা কার্যকর থাকে না। পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সব ইসলামি স্কলার এ বিষয়ে একমত, ছোট-বড় সব গুনাহ থেকে সঙ্গে সঙ্গে তওবা করা ফরজ।
সবার জন্য করণীয় হলো, এত দিন যেসব পাপ হয়ে গেছে, তা থেকে দ্রুত ফিরে আসা। মহান আল্লাহর কাছে তওবা করা। তওবা মানেই শুদ্ধতার পথে ফিরে আসা। তওবা প্রত্যেক বান্দার জন্য অপরিহার্য। নবী-রাসুলরা সব গুনাহ থেকে মুক্ত থাকার পরও আল্লাহর কাছে তওবা-ইসতেগফার করতেন। কারণ তওবাকারীদের মহান আল্লাহ পছন্দ করেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারী ও পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা বাকারা ২২২) এজন্য হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) দিনে অসংখ্যবার তওবা-ইসতেগফার করতেন। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, আল্লাহর শপথ! আমি প্রতিদিন ৭০ বারের বেশি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই ও তওবা করি (সহিহ বোখারি) অন্য বর্ণনায় তিনি বলেছেন, ‘হে মানুষ! তোমরা আল্লাহর কাছে তওবা করো এবং ক্ষমা চাও। কেননা আমি প্রতিদিন ১০০ বার আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই।’ (সহিহ মুসলিম)
মাঝেমধ্যে ইমানি অবস্থা যাচাই করা জরুরি। বছরের শেষে এ সুযোগটি কাজে লাগানো যেতে পারে। পুরো এক বছরে কী কী ভালো কাজ করা হয়েছে এবং কী কী গুনাহের কাজ করা হয়েছে, সেই হিসাব বের করা। যেসব গুনাহের কাজ করা হয়েছে, সেগুলোর জন্য অনুতপ্ত হয়ে মহান আল্লাহর কাছে তওবা করা। অতীতের গুনাহগুলো খুঁজে বের করে সেটার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা মুমিনের বৈশিষ্ট্য, যা মুমিন ব্যক্তির ইমানকে মজবুত করে। তাই অতীত পর্যালোচনার ইমানি গুরুত্ব অনেক। মহান আল্লাহ আমাদের অতীতের সব পাপ থেকে তওবা করে সিরাতে মুসতাকিমের পথে অবিরাম চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট
atikr2047@gmail.com