সরকারি কর্মচারীদের ইংরেজিতে পিপলস সার্ভেন্ট বলা হয় আর বাংলা ভাষায় বলা হয় সেবক। তবে, কাগজে-কলমে যাই হোক না কেন, বাস্তবে সরকারি কর্মকর্তা, বিশেষত প্রশাসনের উচ্চপদস্থদের লোকে দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হিসেবেই দেখে। ইংরেজ শাসনামলে ঔপনিবেশিক প্রজাদের শায়েস্তা করার জন্য এ দেশে সিভিল সার্ভিসের প্রচলন হয়েছিল। ইংরেজ তাড়িয়ে পাকিস্তান, পাকিস্তানের বিপক্ষে যুদ্ধ করে বাংলাদেশ অর্জিত হলেও, প্রশাসনের ঔপনিবেশিক কাঠামোর তেমন একটা পরিবর্তন হয়নি। জনগণের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হয়েই আছেন আমলারা। রাজনীতিবিদদেরও আমলাতন্ত্রকে সমঝে চলতে হয়। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারসহ বিভিন্ন স্বৈরশাসনের সময় আমলাতন্ত্র ছিল শাসকদের মেরুদণ্ড। তাদের ওপর ভর করে দিনের পর দিন ক্ষমতা কুক্ষিগত করে এসব সরকার। ফলে, দীর্ঘদিন ধরেই ঔপনিবেশিক এই কাঠামো ভেঙে জনপ্রশাসন ও আমলাতন্ত্রকে সত্যিকারের জনগণের সেবক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার দাবি আছে।
জুলাই গণ-আন্দোলনের পর দেশ জুড়ে যে সংস্কারের স্বপ্ন ছড়িয়েছে, তারই জোয়ারে প্রশাসনিক সংস্কারের দাবি উঠেছে। এ নিয়ে কমিশনও গঠন করা হয়েছে। কিন্তু অপ্রত্যাশিতভাবে কমিশনের কাজ শেষ হওয়ার আগেই এর কিছু সুপারিশ ফাঁস হয়ে গেছে। এসব সুপারিশের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা। জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন এখনো তাদের সুপারিশ জমা দেয়নি। তবে গত ১৭ ডিসেম্বর কমিশনের প্রধান সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় জানান, উপসচিব পদে পদোন্নতিতে প্রশাসন ক্যাডারের জন্য ৫০ শতাংশ এবং অন্যান্য ক্যাডারের জন্য ৫০ শতাংশ কোটা রাখার সুপারিশ করা হবে। এরপর থেকেই সম্ভাব্য এমন সুপারিশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছেন প্রশাসন ক্যাডারের বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তারা। তারা সংস্কার কমিশনের এই সুপারিশের প্রস্তাবকে বৈষম্যমূলক, অযৌক্তিক, ষড়যন্ত্রমূলক উল্লেখ করে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন।
বুধবার রাজধানীর বিয়াম ফাউন্ডেশন মিলনায়তনে প্রশাসন ক্যাডারের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের এক যৌথ প্রতিবাদ সভার আয়োজন করা হয়। ‘জনপ্রশাসন সংস্কারকে ভিন্নপথে পরিচালিত করে দেশকে অস্থিতিশীল করা ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে’ শিরোনামে এই সভার আয়োজন করে বিসিএস (প্রশাসন) অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন (বাসা) এবং বিসিএস (প্রশাসন) কল্যাণ সমবায় সমিতি লিমিটেড। সভায় পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন প্রধানের পদ থেকে আবদুল মুয়ীদ চৌধুরীকে অপসারণের দাবি করা হয়। একই সঙ্গে প্রশাসন ক্যাডারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন পুনর্গঠনেরও দাবি জানিয়েছেন তারা। পাশাপাশি এই সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন দেওয়ার আর দরকার নেই বলেও উল্লেখ করেন বক্তারা। তারা উপসচিব পদে প্রশাসন ক্যাডার থেকে ৫০ শতাংশ এবং অন্য ক্যাডার থেকে ৫০ শতাংশ হারে পদোন্নতির সম্ভাব্য সুপারিশ ‘অযৌক্তিক ও ষড়যন্ত্রমূলক’ আখ্যা দিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করেন। এ ছাড়া উপসচিবের শতভাগ পদে প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেওয়ার দাবি জানান। বরাবরের মতো চলমান বিতর্কেও প্রশাসন ক্যাডার ‘একলা চলো’ নীতিতেই রয়েছে। আর শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্যাডার অবশিষ্ট ক্যাডারকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন করছে। এ অবস্থায়ও বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস করার পথেই রয়েছে কমিশন। কিন্তু বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস গঠন করলে দেশের প্রশাসনে গুণগত কোনো বদল আসবে কি না জানতে চাইলে সাবেক একজন সচিব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রশাসন ক্যাডারকে বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস করা হলে তাৎক্ষণিক কোনো পরিবর্তন আসবে না। তবে এর দীর্ঘমেয়াদি ব্যাপক প্রভাব পড়তে পারে, যা আমরা ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, সিঙ্গাপুরসহ অনেক দেশে দেখতে পাই। গুণগত পরিবর্তন আনতে হলে নিয়োগ ও পদোন্নতি সিলেবাসে পরিবর্তন আনতে হবে। বিধিমালায়ও পরিবর্তন আনতে হবে।’
স্থানীয় সরকার বিভাগের সাবেক সচিব আবু আলম মো. শহীদ খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গণতন্ত্র বাস্তবায়ন করতে নিরপেক্ষ, সৎ, দক্ষ ও যোগ্য সিভিল সার্ভিসের প্রয়োজন। জনকল্যাণমুখী গণকর্মচারী দরকার। যারা দল-মতের ঊর্ধ্বে জনগণের জন্য কাজ করবে। কিন্তু বিগত সময়ে বাংলাদেশে সিভিল সার্ভিস এমনভাবে পরিচালিত হয়েছে, জনগণের কল্যাণ বাদ দিয়ে তারা রাজনীতিতে ব্যবহার হয়েছে, তারা আত্মীয়তায় ব্যবহৃত হয়েছে, তারা এলাকা ইজমে ব্যবহৃত হয়েছে। এসব মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে।’ কমিশনের সুপারিশ প্রকাশের আগেই ফাঁস হওয়া এবং সম্ভাব্য সুপারিশ নিয়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের প্রতিবাদ উভয়টিই সমস্যাজনক। এর ফলে আসল যে উদ্দেশ্য, প্রশাসনকে জনবান্ধব করে তোলা, তা সুদূরপরাহত হবে।