নতুন সমীকরণে দক্ষিণ এশিয়া

সার্কভুক্ত দেশগুলোতে পৃথিবীর এক-চতুর্থাংশ অর্থাৎ ২০০ কোটি মানুষ বাস করে। জনবহুল দক্ষিণ এশিয়া একুশ শতকের ভূ-রাজনৈতিক পালাবদলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে যাচ্ছে। ২০২৪ সালে এই অঞ্চলের চারটি দেশে নির্বাচন হয়েছে। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, প্রত্যেকটিই সুদূরপ্রসারী ও অপ্রত্যাশিত পরিবর্তনের অনুঘটক হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে।

মালদ্বীপে চীন ও ভারতের দ্বৈরথ : ভারত মহাসাগরকেন্দ্রিক বাণিজ্যপথের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে মরিয়া এশিয়ার দুই পরাশক্তি চীন ও ভারত। ভূ-কৌশলগত অবস্থানের কারণে উভয় দেশই মালদ্বীপকে নিজেদের বলয়ে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে। মোহাম্মদ মুইজ্জুর উত্থানে চীন খুশি হলেও ভারত নাখোশ। কেননা নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর সময় তার প্রতিশ্রুতি ছিল, জয়ী হলে তিনি মালদ্বীপ থেকে ভারতীয় সৈন্যদের বহিষ্কার করবেন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে মুইজ্জু ঘোষণা দেন, মে মাসের মধ্যে ভারত সরকারকে মালদ্বীপে মোতায়েন সেনাদের ফিরিয়ে নিতে হবে।

ভারত ও মালদ্বীপের মধ্যে উদ্ভূত টানাপড়েনের সুরাহা হওয়ার আগেই মালদ্বীপের তিনজন উপমন্ত্রী ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্পর্কে কটু মন্তব্য করে বসে। বিষয়টি কূটনৈতিকভাবে মোকাবিলা করার সুযোগ না দিয়ে উত্তেজিত ভারতীয় নেটিজেনরা ‘বয়কট মালদ্বীপ’ প্রচারণা শুরু করে। এপ্রিল নাগাদ ৪২ শতাংশ ভারতীয় পর্যটক তাদের বুকিং বাতিল করে। যা পর্যটননির্ভর দ্বীপ রাষ্ট্রটির অর্থনীতিকে চাপে ফেলে। ভারতের ব্যাপারে মালদ্বীপের সাধারণ নাগরিকদের বিরূপ ধারণা এতে বরং আরও তীব্র হয়ে ওঠে। জবাবে প্রেসিডেন্ট মুইজ্জু প্রকাশ্যে বলেন, আমরা কোনো দেশের উঠান নই। মালদ্বীপ একটি স্বাধীন দেশ। তিনি আরও বলেন, তুরস্ক থেকে খাদ্যশস্য এবং ইউরোপ থেকে ওষুধ আমদানি করা হবে। যাদের স্বাস্থ্যবীমা আছে তারা চিকিৎসার জন্য এখন থেকে দুবাই বা থাইল্যান্ডে যেতে পারে।

মুইজ্জুর ইঙ্গিতটা স্পষ্ট। ভারতের ওপর নির্ভরশীলতা তিনি কমিয়ে আনতে চান। যদিও মালদ্বীপের বিশ্লেষকরা বলছেন, তুরস্ক বা অন্য কোনো দেশ থেকে খাদ্যশস্য আমদানি অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাস্তবসম্মত বা প্রজ্ঞাপ্রসূত হবে না। মুইজ্জু মূলত ভারতবিরোধী ভোটার ও রাজনীতিবিদদের সমর্থন আদায়ের উদ্দেশ্যে এই অবস্থান নিয়েছেন।

তবে বিদেশি ঋণের ভারে ন্যুব্জ অর্থনীতির ধস ঠেকাতে গিয়ে তিনি ভারতের সঙ্গে পুনরায় সম্পর্ক ঝালাইয়ে মনোযোগী হয়েছেন। তারল্যসংকট কাটিয়ে ওঠার উপায় খুঁজতে মুইজ্জু অক্টোবরে দিল্লি সফর করেন। মালদ্বীপে চীনের প্রভাব ঠেকাতে ভারত সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে। মালদ্বীপে চীন ও ভারতের যুগপৎ তৎপরতা থেকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলো প্রয়োজনীয় পাঠ সংগ্রহ করতে পারে।

টালমাটাল পাকিস্তান : দুই প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সীমান্ত সংঘর্ষ ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটে বছর জুড়ে উত্তাল ছিল পাকিস্তান। জানুয়ারি মাসে পাকিস্তানের বালুচিস্তান প্রদেশে ইরান মিসাইল ছোড়ে। কারণ হিসেবে তারা জানায়, সশস্ত্র গোষ্ঠী জঈশ আল-আদলের সন্ত্রাসীরা দীর্ঘদিন ধরে ইরানের সীমান্ত পুলিশ ও রেভল্যুশনারি গার্ডের সেনাদের লক্ষ্য করে চোরাগোপ্তা হামলা চালিয়ে আসছে। তাদের শায়েস্তা করতেই ইরান এই পদক্ষেপ নিয়েছে। যদিও পাকিস্তান এটিকে তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর হস্তক্ষেপ বলে কঠোর প্রতিবাদ জানায়। পাল্টা জবাব হিসেবে ইরানের সিস্তান-বালুচিস্তান প্রদেশে বিচ্ছিন্নতাবাদী বালুচিস্তান লিবারেশন আর্মি ও বালুচিস্তান লিবারেশন ফ্রন্টের আস্তানা তাক করে তারা আক্রমণ চালায়।

অবশ্য খুব দ্রুতই পাকিস্তান ও ইরান বিরোধ মিটিয়ে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করে। কেননা পশ্চিম এশিয়ার আঞ্চলিক যুদ্ধে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা ইরান আরেকটি যুদ্ধে জড়াতে চায় না। অন্যদিকে গভীর অর্থনৈতিক সমস্যায় জর্জরিত পাকিস্তানও শক্তিশালী ইরানের সঙ্গে লড়াইয়ের ব্যাপারে আগ্রহী নয়।

ইরান বছরের শুরুতে যে যুক্তি দেখিয়ে পাকিস্তানে অভিযান চালিয়েছিল, বছরের শেষপ্রান্তে এসে পাকিস্তান সেই একই কারণ দেখিয়ে আফগানিস্তানের পাকতিকা প্রদেশে বিমান হামলা চালাল। তালেবানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ তেহরিক-ই-তালেবানের ১৫ সদস্যসহ ৪৬ জন নিহত হয়। আফগানিস্তানের পাল্টা জবাবে পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে ১৯ জন পাক সেনা নিহত হয়েছে। ব্রিটিশদের আঁকা ডুরান্ড সীমান্তরেখা জুড়ে সংঘর্ষ আগামীতে আরও বিস্তৃত হতে পারে।

ফেব্রুয়ারি মাসের জাতীয় নির্বাচনে কারাবন্দি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফকে (পিটিআই) ঠেকানোর নানা চেষ্টা করা হয়। তারপরও সবচেয়ে বেশি আসন জেতে পিটিআই সমর্থিত প্রার্থীরা। কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় নওয়াজ শরিফের মুসলিম লীগের নেতৃত্বে জোট সরকার গঠিত হয়। ইমরান খান এটিকে দিনেদুপুরে ভোট ডাকাতি হিসেবে আখ্যায়িত করেন। পিটিআইর অভিযোগ, ২২৬টি আসনের মধ্যে তাদের প্রার্থীরা ৯৩টি নয়, বরং ১৮০টি জিতেছে এবং তারাই সরকার গঠনের হকদার।

এদিকে আগস্ট মাসে ইমরানের অনুগত লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) ফয়েজ হামিদকে গ্রেপ্তার করা হয়। পাকিস্তানের ইতিহাসে এর আগে কোনো গোয়েন্দা প্রধানকে আটক করা হয়নি। ইমরানের বিরুদ্ধে চলমান বিচারকাজ সামরিক আদালতে হস্তান্তর করা হতে পারে, এই আশঙ্কায় পিটিআই সমর্থকরা ইমরানের মুক্তির দাবিতে তার স্ত্রী বুশরা বিবির নেতৃত্বে নভেম্বরে ইসলামাবাদে বিশাল সমাবেশ ডাকে। রাজধানী উত্তালে অচল হয়ে উঠলে নিরাপত্তা বাহিনী শক্ত হাতে বিক্ষোভ দমন করে। পিটিআই সমর্থকরা আপাতত পিছু হটলেও শাহবাজ শরিফের গদি আগামী বছর আরও কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

ঘনিষ্ঠ হয়েছে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান : দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের দ্বিমুখী সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করেছে। যা দক্ষিণ এশিয়ায় ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিতে পারে। গত চার মাসে অল্প সময়ের ব্যবধানে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ দুবার সাক্ষাৎ করেছেন। এরপর দুই দেশের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক এগিয়ে নিতে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

আওয়ামী লীগ শাসনামলে ঢাকা বিমানবন্দরে একটি বিশেষ নিরাপত্তা ডেস্ক স্থাপন করা হয়েছিল কেবল পাকিস্তান থেকে আগত যাত্রীদের তল্লাশি করার জন্য। সেই ডেস্কটি সম্প্রতি বিলুপ্ত করা হয়েছে। পারস্পরিক বাণিজ্যও ঊর্ধ্বমুখী। পাকিস্তান থেকে আসা সব পণ্য এতদিন লাল তালিকাভুক্ত ছিল। শতভাগ কায়িক পরীক্ষা ছাড়া খালাস করা হতো না। ২৯ আগস্ট জাতীয় রাজস্ব বোর্ড নিত্যপ্রয়োজনীয় ও উৎপাদনমুখী পণ্যের ক্ষেত্রে সেই নিষেধাজ্ঞা বাতিল করে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে যে বিষয়টি নিয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে তা হলো, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ৫৩ বছর পর এই প্রথম করাচি বন্দর থেকে কনটেইনার বহনকারী জাহাজ সরাসরি চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাচ্ছে। এতদিন দুই দেশের মধ্যে আমদানি-রপ্তানি দুবাই, সিঙ্গাপুর কিংবা কলম্বো হয়ে করতে হতো। সরাসরি যোগাযোগের ফলে সময় ও খরচ দুটোই হ্রাস পেয়েছে। এই পরিবর্তনগুলোর সম্মিলিত প্রভাব দৃশ্যমান হচ্ছে। পাকিস্তানি দৈনিক ডন-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে বাংলাদেশে পাকিস্তানের রপ্তানি বেড়েছে ২৯ দশমিক ৭৬ শতাংশ এবং বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানে রপ্তানি বেড়েছে ১৮ শতাংশ। দুই দেশের মধ্যে সরাসরি ফ্লাইট চালুর ব্যাপারে আলাপও অনেক দূর এগিয়ে গেছে। সার্কভুক্ত গুরুত্বপূর্ণ এই দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে শুরু করায় নয়াদিল্লির কপালে ভাঁজ পড়েছে।

ঘরে-বাইরে চাপে ভারত : ঘরে-বাইরে দুই জায়গাতেই বিরূপ অভিজ্ঞতা হয়েছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির। লোকসভা নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হওয়ায় এই প্রথম তাকে মিত্র দলগুলোর সঙ্গে জোট বেঁধে সরকার গঠন করতে হয়েছে। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময় থেকে তার যে অপরাজেয় লড়াকু ভাবমূর্তি তৈরি করা হয়েছিল সেটা জোর ধাক্কা খেয়েছে। প্রতিপক্ষ ইন্ডিয়া জোটও আগের চেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে।

কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও এ বছর মোদি সরকার চাপে পড়েছে। মালদ্বীপ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কায় বর্তমানে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক দল ক্ষমতাসীন। দক্ষিণ এশিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে ভারতের সবচেয়ে বিশ^স্ত মিত্র ছিল বাংলাদেশের শেখ হাসিনার সরকার। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ভারতে শেখ হাসিনার আশ্রয় পাওয়া পর থেকে ভারতীয় মিডিয়ায় লাগাতার অপপ্রচার, আগরতলায় বাংলাদেশের উপ-দূতাবাসে হামলা এবং বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে ভিসা-সংক্রান্ত কড়াকড়ির জের ধরে দুই দেশের সম্পর্কে পরিবর্তন এসেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সঙ্গেও ভারতের সম্পর্ক জটিল হয়ে উঠেছে। বিজেপি ঘনিষ্ঠ ধনকুবের গৌতম আদানির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে তদন্ত শুরু হয়েছে। ২০২০ সালে দোকলাম সীমান্তে সংঘর্ষের পর থেকে চীনের সঙ্গে শীতল সম্পর্ক বিরাজ করছিল। অর্থনৈতিক স্বার্থ বিবেচনা করে সেই বিরোধ মেটাতে ভারত অক্টোবর মাসে চীনের সঙ্গে সীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।

শ্রীলঙ্কায় রাজনৈতিক অভিজাততন্ত্রের পরাজয় : প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অনুঢ়া কুমার দিশানায়েকের জয়লাভ শ্রীলঙ্কায় নতুন আশার জন্ম দিয়েছে। ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে দেশটির রাজনীতি যে অভিজাততন্ত্রের হাতে জিম্মি ছিল তা থেকে বেরিয়ে আসার পক্ষে রায় দিয়েছে জনগণ। দেশটি অর্থনৈতিক মন্দা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছে। অবশ্য এই কৃতিত্বের দাবিদার রনিল বিক্রমাসিংহের অন্তর্বর্তী সরকার। ভারত মহাসাগরের একেবারে মধ্যখানে অবস্থান হওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক একাধিক বাণিজ্যপথ শ্রীলঙ্কার সীমানার মধ্যে পড়েছে। ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের কাছে তাই শ্রীলঙ্কার গুরুত্ব অপরিসীম। নিরপেক্ষ থাকাটাই চ্যালেঞ্জ। শপথ গ্রহণের পর দিশানায়েকে যে কারণে বলেছেন, শ্রীলঙ্কা সারা পৃথিবীর সঙ্গেই কাজ করতে আগ্রহী।

ভেঙে যাচ্ছে মিয়ানমার : সবার নজর এখন মিয়ানমারের দিকে। বার্মার-প্রধান জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে স্বাধিকার আদায়ে লড়ছে অন্যান্য জাতিভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এবং গণতন্ত্রকামী গেরিলারা। দেশের সিংহভাগ এলাকার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তাতমাদো কোণঠাসা। খুব শিগগিরই হয়তো মিয়ানমার ভেঙে নতুন একটি দেশের জন্ম হতে যাচ্ছে। সে ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসবে প্রতিবেশী দেশগুলোর পররাষ্ট্রনীতিতেও। নতুন রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে চীন, বাংলাদেশ ও ভারত কতটা প্রস্তুত তা পরিষ্কার হবে ২০২৫ সালে।

লেখক: অনুবাদক ও বিশ্লেষক

rezwanur1991@gmail.com