জাতীয় ঐক্যের পরীক্ষা

গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশকে নিয়ে চক্রান্ত থেমে নেই। জুলাই-আগস্টের কষ্টার্জিত সফলতা বিনষ্ট করার এক ও অভিন্ন উদ্দেশ্যে একেক সময় একেক রূপে নানা চক্রান্ত সামনে আসছে। এহেন জটিল পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকার, সব রাজনৈতিক দল ও দেশপ্রেমিক জনতার সুদৃঢ় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। দীর্ঘ সংগ্রাম ও স্বাধীনতাযুদ্ধের মধ্য দিয়ে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছে এ দেশের মানুষ। ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ণ গণ-অভ্যুত্থানের বছর পার করে, নতুন বছরে গত বছরের সাফল্য, সমস্যা ও করণীয় নিয়ে ভাবতে হবে।

আমাদের দেশের জনগণ জাতীয় সংসদের নির্বাচন করার সামর্থ্যও এখন পর্যন্ত অর্জন করেনি। যারা নানা কৌশলে ক্ষমতাসীন হয়, তারা নানা কুৎসিত উপায় অবলম্বন করে দমননীতি, জেল-জুলুম, গায়েবি মামলা, খুন, গুম ইত্যাদি অবলম্বন করে ক্ষমতায় থেকেছে। দেশের বড় অঙ্কের অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে, ব্যাংকগুলোকে ঋণখেলাপি লোকেরা চরম দুর্দশায় ফেলেছে, বৈদেশিক ঋণ নিয়ে রাষ্ট্র দুর্গতিতে ভুগছে। প্রশাসনব্যবস্থাকে দলীয়করণের মধ্য দিয়ে অত্যন্ত খারাপ অবস্থায় ফেলা হয়েছে। দলীয়করণের পরিণতিতে পুলিশ বাহিনীর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মনোবলহারা। রাষ্ট্রীয় শিক্ষানীতি ও শিক্ষাব্যবস্থাকে সব দিক দিয়ে খারাপ অবস্থায় রাখা হয়েছে। রাষ্ট্রের সংবিধানকেও জনবিরোধী রূপ দিয়ে রাখা হয়েছে। আশার কথা যে এসব সংস্কারে অন্তর্বর্তী সরকার কাজ শুরু করেছে।

আমাদের দেশের স্বাধীন সত্তা রক্ষার জন্য বৃহত্তম জাতীয় ঐক্য এখন অপরিহার্য। ১৯৭২ সাল থেকে কোনো সরকারই বৃহত্তম জাতীয় ঐক্যের নীতি গ্রহণ করেনি। আমাদের দেশের রাজনীতি রাজনীতিবিদদের, রাজনৈতিক দলগুলোর ও রাজনৈতিক নেতাদের হাতছাড়া হয়ে গেছে। বর্তমানে যে উপদেষ্টা পরিষদ দ্বারা বাংলাদেশ পরিচালিত হচ্ছে, তা নির্দলীয়, নিরপেক্ষ, অরাজনৈতিক মেধাবী ব্যক্তিদের দ্বারা গঠিত। রাজনীতিবিদদের প্রতি, রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে অনাস্থা আছে। ছাত্র-জনতার নেতৃত্বে সংঘটিত গণ-অভ্যুত্থান জনগণকে রাজনীতিমুখী করেছে। এখন রাজনৈতিক দলগুলো ফের আস্থা অর্জনের সুযোগও পেয়েছে। 

নির্দলীয়-নিরপেক্ষ অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের দ্বারা রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কারের জন্য এই সরকার রাষ্ট্রের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কোনো কোনো দিক অনুসন্ধান করে দেখছে। রাজনৈতিক মহল থেকে দ্রুত জাতীয় সংসদের নির্বাচন দেওয়ার জন্য দাবি তোলা হচ্ছে। তবে দেশের রাজনৈতিক জটিলতা হঠাৎ দেখা দেয়নি। পক্ষপাতমুক্ত পর্যবেক্ষণে গেলে দেখা যাবে, ১৯৭২ সালের প্রায় শুরু থেকেই সমস্যা সংকটে রূপ নিয়েছে। যেসব মর্মান্তিক ঘটনা ক্রমাগত ঘটেছে, সেগুলোর কথা স্মরণ করলে এবং কারণ-করণীয় ও ফলাফল ঘটনাপ্রবাহকে বিচার করলে বোঝা যাবে, জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় জীবনে দেশের মানুষ কী অবস্থায় আছে। সব কিছুকেই আমাদের বিচার করতে হবে জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় উন্নতির লক্ষ্য নিয়ে। রাজনীতির ও রাজনৈতিক উন্নতির জন্য আদর্শ অপরিহার্য।

বাস্তবে দেখা যায়, আদর্শকে এখন অর্থহীন করে ফেলা হয়েছে। এসব আদর্শকে আলোচনা-সমালোচনার মধ্য দিয়ে দেখতে হবে এবং আজকের প্রয়োজনে সর্বজনীন কল্যাণের আদর্শ রচনা করতে হবে। সর্বজনীন কল্যাণে নতুন রাজনীতির জন্য এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার পুনর্গঠনের জন্য সব দেশ-কালে তরুণরাই অগ্রযাত্রীর ভূমিকা পালন করে। বাংলা ভাষার দেশেও তা-ই হয়েছে। তরুণরা এগিয়ে আসতে শুরু করেছে। সর্বজনীন কল্যাণে কাজ করার জন্য প্রবীণদের থেকে এবং বই-পুস্তক থেকে তাদের অনেক কিছু শিখতে হবে। প্রযুক্তির কল্যাণে মানুষের শ্রমের কিছু না কিছু লাঘব হচ্ছে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবে মানুষ যদি প্রযুক্তির অধীন হয়ে পড়ে, তাহলে সমূহ সর্বনাশ। এ নিয়ে যথাসম্ভব জানতে ও বুঝতে হবে। উদীয়মান রাজনীতিবিদদের মতামত দেশবাসীর মধ্যে প্রচার করা দরকার। তারা নতুন কিছু, ভালো কিছু অবলম্বন করে এগোচ্ছে শিক্ষিত লোকদের মধ্যে তার প্রচার দরকার। দুই পক্ষের মধ্যে সুসম্পর্ক দরকার। তবে তরুণদের পক্ষ থেকে প্রবীণদের প্রগতিবিমুখ চিন্তার সমালোচনা অপরিহার্য। সমালোচনা মানে নিন্দা নয় এ কথাও মনে রাখতে হবে। জনশক্তি ও প্রাকৃতিক সম্পদের সদ্ব্যবহার ও কল্যাণকর ব্যবহারে মনোযোগ আনতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না, ‘সত্যের চিরজয় ও মিথ্যার চিরপরাজয়’। পরিশেষে বলব, মৌলিক সংস্কার সম্পন্ন করে আগামী নির্বাচনের একটা সম্ভাব্য সময়সূচিও দ্রুতই জাতির সামনে আসা উচিত। দেশ নির্বাচনমুখী হলে বিরাজমান আশঙ্কাগুলোও কিছুটা কমতে শুরু করবে বলে অনেকেই মনে করছেন। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার নানা রকম নিত্যনতুন পরিকল্পনা যখন তখন সামনে আসা অস্বাভাবিক কোনো বিষয় নয়। তাই সংশ্লিষ্ট সবাইকেই সজাগ থাকতে হবে।

লেখক : গবেষক ও কলাম লেখক

raihan567@yahoo.com