শতবছরের ঐতিহ্যবাহী পাবনার ঈশ্বরদী রেলওয়ে জংশন স্টেশন। উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রাচীন এই স্টেশনটি দীর্ঘদিন থেকে নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে পড়ে আছে। উন্নয়ন আর আধুনিকায়নের প্রতিশ্রুতি থাকলেও উল্লেখযোগ্য তেমন কোনো উন্নয়ন বা আধুনিকায়ন হয়নি সেখানে। এখনো জরাজীর্ণ ভবন, প্রবেশের পথ, টিকিট কাউন্টারের অবস্থান, বিশ্রামাগারের বাজে অবস্থাসহ নানা সংকট রয়েছে সেখানে। সম্প্রতি সেব সংকট আরও প্রকট হয়েছে।
ঈশ্বরদী রেলওয়ে জংশন স্টেশন থেকে প্রতিদিন ১২ জোড়া (২৪টি) যাত্রীবাহী ট্রেন ঢাকা, রাজশাহী, খুলনা, চিলাহাটিসহ দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াত করে। এতে প্রতিদিন প্রায় ৮/১০ হাজার যাত্রী যাতায়াত করে দেশের প্রাচীনতম এই জংশন দিয়ে। কিন্তু শতবছরের ঐতিহ্যবাহী স্টেশনটিতে সুবিধাজনক প্রবেশপথ নেই। রেললাইন আর ফুট ওভারব্রিজ ব্যবহার করে যাতায়াত করতে হয়। এতে বয়স্ক, অসুস্থ রোগী ও বিভিন্ন ব্যাগপত্র সঙ্গে থাকা যাত্রীদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। বিষয়টি নিয়ে রেলওয়ে কর্র্তৃপক্ষ চরম উদাসীন বলে মন্তব্য করেছেন রেলসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও ভুক্তভোগীরা।
জনগুরুত্বপূর্ণ এই স্টেশনটিতে নেই ভিআইপি বা প্রথম শ্রেণির বিশ্রামাগার, বিশুদ্ধ খাবার পানি ও গণশৌচাগারের ব্যবস্থা। নিরাপত্তা সীমানাপ্রাচীর না থাকায় এর আগে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে বেশ কয়েকবার। সবকিছু মিলিয়ে চরম অব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে ধুঁকে ধুঁকে চলছে উত্তরাঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন এই রেলওয়ে জংশনটি।
১৯১২ সালে গোড়াপত্তন হয় ঈশ্বরদী রেলওয়ে জংশনের। শুরুর কয়েক দশক যাত্রী কম হলেও ধীরে ধীরের বাড়তে থাকে। এরপর যমুনা সেতু চালু হলে ঈশ্বরদী রেলওয়ে জংশনের মাধ্যমে উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের সঙ্গে রাজধানী ঢাকার সরাসরি রেল যোগাযোগ শুরু হয়। এতে যাত্রীসংখ্যা শতগুণে বৃদ্ধি পেলেও উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি সেখানে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, ঈশ্বরদী ইপিজেডসহ বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শহর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় ঈশ্বরদী। সেই বিবেচনায় জংশনটি ভয়াবহভাবে অবহেলিত।
ঈশ্বরদী পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর আনোয়ার হোসেন জনি বলেন, উত্তরবঙ্গের মধ্যে রেলওয়ে শহর হিসেবে পরিচিত ঈশ্বরদী। অথচ এই ঈশ্বরদী জংশনে যাতায়াতের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো প্রবেশ পথ নেই। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষকে রেললাইন মাড়িয়ে অথবা ফুট ওভারব্রিজ ডিঙিয়ে প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করতে হয়।
ঈশ্বরদী সরকারি কলেজের সাবেক ভিপি আলহাজ আসাদুর রহমান বীরু বলেন, ভৌগোলিক দিক থেকে ঈশ্বরদী এখন অনেক গুরুত্বপূর্ণ। অথচ ঈশ্বরদীর যাত্রীদের কথা বিবেচনা করে ঈশ্বরদী রেলওয়ে জংশনের দৃশ্যমান কোনো উন্নয়নই করা হয়নি। অথচ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের মালপত্র ব্যবহার করার নামে প্রায় ৩৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন রেলপথ নির্মাণ করা হয়েছে।
ঈশ্বরদীর বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আলহাজ আবদুল মান্নান টিপু বলেন, ঈশ্বরদী থেকে প্রতিদিন হাজারো ব্যবসায়ী ঢাকায় যান ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য। কিন্তু সময়মতো ট্রেনের শিডিউল আর কাক্সিক্ষত টিকিট না পাওয়ায় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয় তাদের। এর মধ্যে কোনো বিকল্প ব্যবস্থা না করেই খুলনা ও যশোরের বেনাপোল থেকে ঈশ্বরদী হয়ে ঢাকাগামী সুন্দরবন এক্সপ্রেস ও বেনাপোল এক্সপ্রেস ট্রেনটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এতে যাত্রীদের দুর্ভোগ বেড়েছে কয়েকগুণ। এ ছাড়া স্টেশনে ব্যবসায়ী ও যাত্রীদের নিরাপত্তার শঙ্কাও চরম। প্রতিদিনই চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে সেখানে।
ঈশ্বরদী রেলওয়ে জংশনের আধুনিকায়ন না হওয়া এবং যাত্রী সেবার মান নিম্নমুখী হওয়ায় চরম ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেন ঈশ্বরদী প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এস এম ফজলুর রহমান। তিনি বলেন, স্টেশনটির উভয়পাশেই প্ল্যাটফর্ম নির্মাণ করা দরকার। এতে সহজেই যাত্রীরা স্টেশনে প্রবেশ বা বের হতে পারতেন। কিন্তু তা না হওয়ায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে হাজার হাজার যাত্রীকে। তিনি বলেন, প্রতিদিন ফুট ওভারব্রিজ বাদেই ঈশ্বরদী প্রেস ক্লাবের সামনে দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ রেললাইন মাড়িয়ে হাজার হাজার যাত্রী স্টেশনে যাচ্ছেন। এজন্য প্রেস ক্লাব চত্বর এলাকায় তীব্র যানজট লেগেই থাকছে। এর সুষ্ঠু প্রতিকার হওয়া দরকার।
এসব বিষয়ে ঈশ্বরদী রেলওয়ে জংশন স্টেশন সুপারিনটেন্ডেট (ভারপ্রাপ্ত) মো. মহিউল ইসলাম বলেন, রেলওয়ের ১৩ বিভাগের মাধ্যমে ঈশ্বরদী জংশন স্টেশনের যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালিত হয়। প্রতিটি বিভাগের সমন্বয় ছাড়া এতসব সমস্যা সমাধান কোনোভাবেই সম্ভব নয়। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই স্টেশনটিতে সুবিধাজনক কোনো প্রবেশপথ না উন্নয়নকাজ করারও কষ্টকর।
পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ের ব্যবস্থাপক (ডিআরএম) শাহ্ সুফি নূর মোহাম্মদ মোবাইল ফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ফুট ওভারব্রিজ ব্যবহার করেই যাত্রীরা অনায়াসে যাতায়াত করছেন, এতে কোনো সমস্যা নেই। স্টেশনটিতে প্রবেশের জন্য আপাতত সুনির্দিষ্ট পথ নির্মাণের পরিকল্পনা নেই বলেও জানান তিনি।
স্টেশনটিতে ভিআইপি বা প্রথম শ্রেণির বিশ্রামাগার, বিশুদ্ধ খাবার পানি ও গণশৌচাগার এবং বুকিং কাউন্টার সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তার কোনো জবাব না দিয়ে মোবাইল সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন তিনি।