কাঁথার শীতপোশাক ও শান্তা কবির

গ্রামবাংলার আদি ও অকৃত্রিম অনুষঙ্গ কাঁথা। নবজাতকের প্রথম পোশাক হলো কাঁথা। গ্রামীণ জীবনে কাঁথার চাহিদা আছে ও থাকবে। সেই কাঁথা দিয়ে এবার পোশাকের নকশা করলেন ডিজাইনার শান্তা কবির। কাঁথা দিয়ে তৈরি করছেন বহুরূপী শীতের পোশাক। নতুন ধরনের এই শীতপোশাক তৈরির প্রেক্ষাপট আর ডিজাইনার হয়ে ওঠার গল্প জানালেন মোহসীনা লাইজুকে

আমি ২০০০ সালে ডিজাইনার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করি। সব সময়ই আমি কাজে ফোকাস করেছি আমাদের হেরিটেজ। আস্তে আস্তে কাজ করেছি। কখনো থেমে থাকিনি। নিজের আত্মবিশ্বাসে এগিয়ে চলেছি। আমার বিয়ের পর একদিন আমার ননাস বলল, শান্তা তুমি চাইলে ডিজাইনার হিসেবে কাজ করতে পার। আমিও ভেবেছিলাম চাকরি না করে ব্যবসা করলে ঘরেও থাকা যাবে, বাচ্চাদের দেখভাল করতে পারব। আমার ছেলের বয়স যখন ১৯ দিন তখন একদিন আমার পরিচিত এক বাসায় বেড়াতে গেছি। ওই বাসায় তিন মেয়ে ছিল। খুব সুন্দর ফ্রক পরা ওরা। আমি আগ্রহবশত ওদের কাছে জানাতে চেয়েছিলাম কোথায় থেকে কিনেছে। তখন ওরা বলল, নিজেরাই এগুলো তৈরি করেছে। ঈদ খুব কাছে ছিল। আত্মীয়-পরিজনকে উপহার দেওয়ার জন্য আমি ওদের বললাম আমাকে কিছু কাপড় তৈরি করে দিতে। তো যাদের ওই কাপড়গুলো উপহার দিয়েছিলাম তারা খুব ভালো ফিডব্যাক দিয়েছে। এরপর প্রায়ই নানা উৎসব-পার্বণে আমি তাদের কাছ থেকে পোশাক কিনে উপহার দিয়েছি। এক সময় ওরাই বলল, আপু আপনি তো চাইলে ব্যবসা করতে পারেন। আমি বললাম, কীভাবে। পরামর্শ দিল ওদের কাছে ডিজাইন দিয়ে কাপড় তৈরি করে নিয়ে বিক্রি করতে। সময়টা ছিল ১৯৯৯ সাল। আমি শুরুতে সিরাজগঞ্জ থেকে তাঁতের ৫টি সালোয়ার-কামিজ ওদের কাছ থেকে ব্লক করে নিয়ে বিক্রি করি। এক দিনেই সব বিক্রি হয়ে গেল। আমার লাভ হয়েছিল ১০০০ টাকা। ওই টাকা দিয়ে আবার কাপড় কিনি। এভাবেই ৬ মাস কাজটা করেছি। আলাদা করে আমার কোনো মূলধন ছিল না। সিরাজগঞ্জের বেলকুচিতে হ্যান্ডলুমের থ্রিপিস কিনে তাঁতে ব্লকের ডিজাইন করে বিক্রি করা শুরু করি। সেই সময় বেইলি রোডের অফিসার্স ক্লাবে ঈদ আনন্দ মেলা নামে একটা মেলা চলছিল। আমি সে মেলায় অংশগ্রহণ করি। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমার একটা কাপড়ও বিক্রি হয়নি। আমার মন খুব খারাপ হলো। এর কয়েক দিন পর ডব্লিউভিএ তে একটা মেলা হলো, সেখানেও আমি অংশগ্রহণ করলাম। কিন্তু এখানেও একই ঘটনা, একটা কাপড়ও বিক্রি হলো না। উপরন্তু আমার ২টি পোশাক চুরি হলো। আমি অনেক বেশি হতাশ হলাম। মনে মনে ভাবতে শুরু করলাম, আমাকে দিয়ে বোধহয় হবে না। তখন এক দিন আমার হাজবেন্ড বলল, তুমি হতাশ হচ্ছ কেন। তুমি মেলায় যাচ্ছ অংশগ্রহণ করতে। বিক্রি করতে না, এটা ভাবো। মেলায় আসা মানুষজন দেখ। তারা কী নিচ্ছে, কী ধরনের পোশাক পরছে এটা খেয়াল করো। সবকিছু স্টাডি করো। নিরাশ হওয়ার কিছু নেই। এক কথায় বলতে গেলে নেগেটিভ থেকে ইনস্পায়ার হয়েছি। আমার বাচ্চা ও আমার ভাইয়ের বাচ্চা গ্রীন হেরাল্ড স্কুলে পড়ত। গ্রীন হেরাল্ড স্কুল পথকলি বাচ্চাদের জন্য একটা চ্যারিটি ফেয়ার করে প্রতি বছর। ফেয়ার থেকে ১০ পারসেন্ট পথকলি বাচ্চাদের ফান্ডে দিতে হয়। আমি প্রতি বছরই স্কুলের ওই ফেয়ারে অংশগ্রহণ করি। আমার একটা পরিচিত ক্রেতার সার্কেল গড়ে ওঠে। এদের কাছেই আমার ডিজাইন করা পোশাক শাড়ি-ব্লাউজ বিক্রি করতাম। এরপর ২০১০ সালে পল্লবীতে আমার বাসার কাছেই ছোট পরিসরের একটা আউটলেট খুলি। তার নাম দেই আজুরা। অর্থ মজুরি। বাংলা একাডেমি ডিকশনারির প্রথম শব্দ এটা। শব্দটা আমার ভালো লেগে গেল।

ব্যবসা করতে গিয়ে টাকা-পয়সার দরকার হয়েছে। সেটা আমি ইস্টার্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছি। ইস্টার্ন ব্যাংক থেকে ঋণ দেওয়া-নেওয়ার মধ্য দিয়েই আমার ব্যবসা চলছে। করোনার সময় বেশ কিছুটা পিছিয়ে গিয়েছিলাম। পরবর্তী সময় সেগুলো কাটিয়ে উঠতে পেরেছি। শুরুটা ব্লকের কাজ দিয়ে শুরু করলেও পরবর্তী সময় স্ক্রিন প্রিন্ট, হ্যান্ড ব্লক, ন্যাচারাল ডাই এসব মিডিয়ায় কাজ করেছি। আমাদের দেশের ন্যাচারাল ডাইয়ের পোশাক শাড়ির প্রতি এলিট শ্রেণির বেশ আগ্রহ আছে। আমি চেষ্টা করেছি দামি ফেব্রিকস দেশীয় এন্ডি কটন, বলাকা সিল্ক, মসলিন নিয়ে কাজ করতে।

আমার ডিজাইন লাইনে ক্যাজুয়াল, ফরমালের পাশাপাশি ওয়েস্টান ও করপোরেট পোশাকও আছে। সালোয়ার-কামিজ, শাড়ির পাশাপাশি শ্রাগ, কেপ, স্কাট, ব্লাউজ, শর্টটপ, কুর্তা, পাঞ্জাবি, ওড়না, ত্যাগা, শার্ট, কার্গো প্যান্ট বিছানার চাদর, কাঁথাও আছে। আমি ইস্টার্ন ও ওয়েস্টান দুধরনের পোশাকেরই ডিজাইন করি। সময়-সুযোগ হলে বিভিন্ন মেলায় অংশগ্রহণ করি। এর ফলে নানা বয়সী ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ঘটে। পোশাক নিয়ে তাদের কোন ধরনের আগ্রহ আছে, সেটা জানার চেষ্টা করি। গত বছর আলোকিতে যে মেলাটা হয়েছিল সেখানে আমার ডিজাইনে ন্যাচারাল ডাইয়ের পোশাক-শাড়ি খুব ভালো সাড়া ফেলেছিল। পরবর্তী সময় জুট ফেব্রিকস নিয়ে বিজিএমইএতে একটা শোতে অংশগ্রহণ করি। আমার ডিজাইন করা শাড়ি দিয়ে বিজিএমইএতে ডেকোরেশন করা।

কাঁথা নিয়ে কাজের শুরুর পেক্ষাপটটা বড় অদ্ভুত। হঠাৎ একদিন আমার মনে হলো গ্রামে নবজাতকের প্রথম অনিবার্য পোশাক হলো হাতে সেলাই করা কাঁথা। এই কাঁথা নিয়ে আমি কেন কাজ করি না। হঠাৎ করে গত জুলাইতে চায়না ফেয়ারে যাওয়ার সুযোগ হয়। হাতে খুব অল্প সময় ছিল। মোট ১৫ দিনের মতো আমি সময় পেয়েছিলাম। তখন আমি কাঁথা দিয়ে ব্লাউজ, ক্রপ শার্ট, কার্গো প্যান্ট, শ্রাগ, কডসেট তৈরি করে নিয়ে গিয়েছি। সঙ্গে এন্ডি সিল্ক, মসলিন, বলাকা সিল্কের পোশাক ছিল। আমি চেষ্টা করেছি ওয়েট যাতে কম হয়, এমন ফেব্রিকস বেছে নিতে। জামদানি ওয়ান পিস দিয়ে শার্ট তৈরি করে নিয়েছি। একটু শ্রাগ টাইপের। মেলায় অনেকেই পছন্দ করেছে। বেশ আগ্রহ ভরে ছেলেমেয়ে উভয়ই কিনে নিয়ে গেছে। দেশে ফিরে এই শীতের জন্য কাঁথার শ্রাগ লংকোট, সালোয়ার, কার্গো প্যান্ট করেছি ৬ পকেটের, টপ শার্ট করেছি। যা খুব ফোকাস হয়েছে। অনেকেই বেশ পছন্দ করেছে। কাঁথা দিয়ে আমি কিমেনো করেছি। যেটা জাপানে নিয়ে গেছে আমার একজন ক্রেতা। আমার নিজের একটা কারখানা আছে। প্রথমে তাদের একটা কাজের স্যাম্পল তৈরি করে দিই। সেটা দেখে আমার কারিগররা কাজ করেন। আমি দেশি ফেব্রিকস নিয়েই কাজ করি। ডিজাইন কপি করার বিষয়টা আমি মানি না। একজন ডিজাইনারের মাথায় হাজারো জিনিস ঘুরে বেড়ায়। তার কপি করার প্রয়োজন হয় না। ডিজাইন বিস্তৃত হতে পারে এবং হয়। আমি দেশে-বিদেশে দুই জায়গায় কাজ করছি এবং করতে চাই। অনেক প্রবাসীর বুটিকে আমার ডিজাইন করা পোশাক আছে। যত পরিচিতি বাড়ছে ততই কাজের পরিধি বাড়ছে।

আমার মনে আছে, যখন প্রথম কাজ শুরু করি তখন বাচ্চা ছোট, আমার মাস্টার্স পরীক্ষা চলছিল। বাবার বাড়িতে ছিলাম। এক দিন আব্বা আমাকে একটা স্টিলের আলমারি এনে দিলেন। আমার ব্যবসার কাপড় রাখার জন্য। আমার হাজবেন্ড সরকারি চাকরি করতেন। সৎ জীবনযাপন করেছেন। দুজনে পরামর্শ করে তার বেতন দিয়ে সংসার চালাতাম আর আমার ব্যবসার লাভ দিয়ে বাচ্চাদের পড়াশোনা করিয়েছি। এক কথায় বলা যায়, সৎ স্বাধীন জীবনযাপন করছি। আমার ছেলেমেয়েকে  আমি বলি আজুরা আমার আর একটা সন্তান।