খন্ডকালীন চাকরিতে উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন শিক্ষার্থীদের

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের পূর্বাচলে এবার ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার ২৯তম আসরে প্যাভিলিয়নসহ ৩৬১টি স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এসব স্টল ও প্যাভিলিয়নের বেশিরভাগ বিক্রয়কর্মীই শিক্ষার্থী। প্রতিবছরই মাসব্যাপী বাণিজ্য মেলায় খ-কালীন চাকরিতে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কাজ করেন। এতে আয় তো হয়ই, পাশাপাশি উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন বুনেন তারা।

গতকাল শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে তীব্র শীত উপেক্ষা করেও মেলায় আসেন দর্শনার্থীরা। সরেজমিনে দেখা গেছে, মেলার কিছু স্টলের নির্মাণকাজ এখনো শেষ হয়নি। তবে মেলা শুরুর পর প্রথম সাপ্তাহিক ছুটির দিনে তীব্র শীত উপেক্ষা করে বিকেল থেকেই দর্শনার্থীরা মেলায় আসতে শুরু করেন।

বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত মেলা ছিল ক্রেতা-দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখরিত। সবচেয়ে বেশি ভিড় দেখা গেছে গৃহস্থালি, প্রসাধনী ও আসবাবপত্র ও শিশুপার্কে। পার্কের বিভিন্ন রাইডের টিকিটের মূল্য ৫০-১০০ টাকা মধ্যে।

ব্যবসায়ীরা জানান, সাধারণত জানুয়ারি মাসে শিক্ষার্থীদের তেমন লেখাপড়ার চাপ থাকে না। সে জন্য প্রতিবছরই বাণিজ্য মেলার বিভিন্ন স্টলে তারা এক মাসের জন্য কাজ নেন। এর মধ্য দিয়ে অর্থ উপার্জনের পাশাপাশি বিভিন্ন নামিদামি ব্র্যান্ড ও স্টলে কাজের মাধ্যমে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন শিক্ষার্থীরা। এ অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন বুনেন শিক্ষার্থীরা। এবারের মেলায় চার হাজারের মতো শিক্ষার্থী খন্ডকালীন কাজ করছেন। পূর্বাচলে মেলা শুরু হওয়ার পর থেকেই এক মাস ঘিরে রূপগঞ্জ ও তার আশপাশের এলাকার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। মেলার আশপাশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন দোকানপাট। মেলার মাস জুড়ে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের আয়ও বেশি হয়।

মি. নুডলসের বিক্রয় প্রতিনিধি সুমাইয়া বলেন, ‘আমি (রাজধানীর) মিরপুর-১-এ পরিবারের সঙ্গে বসবাস করি। ওখানকার স্থানীয় একটি কলেজে লেখাপড়া করছি। বাণিজ্য মেলা হলেই মনের মধ্যে অন্যরকম এক আনন্দ বিরাজ করে। আমি এ নিয়ে দ্বিতীয়বার মেলায় চাকরি করছি। মেলার পরিবেশও আমার অনেক ভালো লাগে। আমার ইচ্ছে ভবিষ্যতে নিজে উদ্যোক্তা হয়ে দেশের জন্য কিছু করব।’

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের কর্মী সানজিদা আক্তার মিতু বলেন, ‘আমি প্রতিবছরই মেলায় এক মাসের জন্য চাকরি করি। আমার হস্তশিল্পের বিভিন্ন জিনিস তৈরি করতে ভালো লাগে। ভবিষ্যতে আমার উদ্যোক্তা হওয়ার ইচ্ছা। আমার স্বপ্ন নিজের একটি বুটিক হাউজ থাকবে।’

প্রাণ কোম্পানির বিক্রয়কর্মী মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘আমি মতিঝিলে জাতীয় বিশ^বিদ্যালয়ের অধীনে একটি কলেজে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে মার্কেটিংয়ে পড়ছি। জানুয়ারি মাসে লেখাপড়ার চাপ কিছুটা কম থাকায় বাণিজ্য মেলায় চাকরি করছি। এতে করে বাড়তি আয়ের পাশাপাশি আমি অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারছি। যেহেতু আমি মার্কেটিংয়ের শিক্ষার্থী, এটি আমার জন্য একটি সুযোগ ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি কানেক্ট করার।’

পারভেজ নামে একজন বিক্রয়কর্মী বলেন, ‘আমার বাসা রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায়। আমি ওখানকার স্থানীয় একটি কলেজের এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। পরীক্ষার দেরি আছে তাই মেলায় এক মাসের জন্য বিক্রয়কর্মীর চাকরি নিয়েছি। সামনে পড়াশোনা শেষ করে ব্যবসা করার ইচ্ছে আছে। তাই নিজেকে ঝালিয়ে নিলাম এখান থেকে। আশা করছি, নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় এ অভিজ্ঞতা কাজে দেবে।’

রূপগঞ্জের হাটাবো এলাকা থেকে মেলায় আসা আনিছ বলেন, ‘তীব্র শীত থাকার পরও শুক্রবার ছুটির দিন হওয়ায় মেলায় পরিবার নিয়ে বেড়াতে এসেছি। অন্যান্য বছর মেলা শুরুর দিকে না জমলেও এবার শুরু থেকেই জমে উঠেছে।’

‘লামিসা সুজের’ মালিক মাসুম আহমেদ স্বপন বলেন, ‘আমার দোকান ঢাকার এলিফ্যান্ট রোড এলাকায়। এবারই প্রথম মেলায় অংশগ্রহণ করছি।

শুনলাম এখানে নাকি ঢাকার মতো বেচাবিক্রি হয় না। তবে এবারের মেলায় ভিন্নরূপ দেখছি। এবার শুরু থেকেই জমে উঠেছে। আজ (গতকাল) ছুটির দিন হওয়ায় প্রত্যাশার চেয়ে বেশি দর্শনার্থী ছিল।’

‘এঞ্জেল কসমেটিকসের’ কর্ণধার আকবর বলেন, ‘আমার ঢাকার নিউ মার্কেট এলাকায় দোকান রয়েছে। আমি প্রতিবছরই মেলায় কসমেটিকসের দোকান নিয়ে অংশগ্রহণ করি। মেলায় এবার প্রথম দিকেই অনেক বেশি দর্শনার্থী দেখতে পাচ্ছি। আশা করছি, আমাদের বিক্রিও এবার ভালো হবে।’

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) কর্মকর্তারা জানান, এবারের মেলায় ভারত, পাকিস্তান, হংকং, তুরস্কসহ সাতটি দেশ থেকে ১১টি প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করেছে। মেলার প্রধান ফটক করা হয়েছে জুলাই ও আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পটভূমিতে। বাণিজ্য মেলার ২৯তম আসর সফল করতে ইপিবি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। নিরাপত্তার স্বার্থে সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছে মেলার প্রতিটি অংশে। দর্শনার্থীদের সুবিধার কথা চিন্তা করে এবারে ই-টিকেটিংয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এ ছাড়া স্টল ও প্যাভিলিয়নও পুরোপুরি অনলাইনে বরাদ্দের ব্যবস্থা করা হয়েছে।’

বাণিজ্য মেলার পরিচালক ও ইপিবির সচিব বিভেক সরকার বলেন, ‘আজ (গতকাল) ছুটির দিন হওয়ায় শুরুর দিকেই মেলায় দর্শনার্থীর সংখ্যা বেশি ছিল। তীব্র শীত উপেক্ষা করে দর্শনার্থীরা মেলায় আসছেন। মেলায় ব্যবসায়ীদের সুবিধার্থে প্রায় প্রতিটি ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু রাখা হয়েছে। বেকার তরুণদের পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা এখানে কাজ করছেন। এটা একটা ভালো দিক। সামনে শিক্ষার্থীরা যাতে আরও বেশি আগ্রহী হয় সে ব্যাপারেও আমরা উদ্যোগ গ্রহণ করব।’