নির্বাচনী খরা কেটে বৃষ্টি আসুক

২০২৫ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর বিদ্যমান দূরত্ব ও সংশয়ের শতভাগ অবসান হয়নি। বিএনপি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্রনেতাদের মধ্যে এ দূরত্ব বাড়ছে। জামায়াতে ইসলামীর কৌশলী ভূমিকা কিছু প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বাম দলগুলো দ্রুত নির্বাচনের আহ্বান জানিয়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্ররা বলছেন- আগে সংস্কার পরে নির্বাচন। মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে ১৬ ডিসেম্বর জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সম্ভাব্য রূপরেখা ও সময় ঘোষণা করেছেন। ২০২৫ সালে নির্বাচন প্রশ্নে শতভাগ ঐকমত্য হয়নি। বিষয়টি বোঝা যায়- বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, বিভিন্ন বাম দল এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্রনেতাদের বক্তব্যে। অন্তর্র্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ২০২৫ সালের শেষ দিক থেকে ২০২৬ সালের প্রথমার্ধের মধ্যে নির্বাচনের সময় নির্ধারণ করা যায়। যদিও নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ নেই।

জামায়াতে ইসলামীর কৌশলী ভূমিকা কিছু প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। আবার বিভিন্ন বাম দলের বক্তব্য দ্রুত নির্বাচনের পক্ষে। তবে উপদেষ্টাদের বিভিন্নমুখী বক্তব্য ধোঁয়াশা সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখেছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এতে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। বলেছেন ‘নির্বাচনী রোডম্যাপ  ঘোষণার সময় উপদেষ্টাদের চেহারায় অস্বস্তি দেখা দিলে তা হবে জনআকাক্সক্ষাবিরোধী। রাষ্ট্র মেরামতের জন্য কত সময় প্রয়োজন, তা জানার অধিকার জনগণের আছে।’ এদিকে বৈষম্যবিরোধীরা ও জাতীয় নাগরিক কমিটি স্বল্প সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে নয়। মৌলিক ও জাতীয় জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারসমূহ করার পরই তারা নির্বাচনের পক্ষে, তাতে যদি দুই-আড়াই বছরও লাগে। অবশ্য জামায়াতে ইসলামী নীতিগতভাবে বৈষম্যবিরোধীদের পক্ষে। এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরে রবিবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

বিএনপি মনে করে, সরকার চাইলে ২০২৫ সালের মধ্যেই সংসদ নির্বাচন করতে পারে। তারা চায় সরকার দ্রুত প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষে নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা করুক। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘নির্বাচন আয়োজনের জন্য অতিরিক্ত সময়ের প্রয়োজন নেই। নির্বাচন কমিশনসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরের সংস্কার সম্পন্ন হলে, ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব। তবে, নির্বাচন আয়োজনের জন্য সরকারকে আমরা ২০২৫ সালের পুরো সময়টাই দিতে চাই। এ সময়ের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন না করা হলে রাজনৈতিক দলগুলো মানবে না।’ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান গত শুক্রবার এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘আমরা চাই আগামী দিনে অতি জরুরি সংস্কারকাজ শেষ করে বর্তমান সরকার সুষ্ঠু নির্বাচন দিয়ে যার যার জায়গায় ফিরে যাক। এ নির্বাচনে জনগণ যার ওপর আস্থা রাখবে, তাকে ভোট দেবে, যাদের ভোট দিলে দেশের মানুষকে সম্মান করবে, দেশের মানুষকে ভালোবাসবে।’ বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স আগামী ১৫ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন। নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেছেন, ‘আমরা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন চাই। নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা হালনাগাদ শুরু করেছে। তাদের প্রস্তুতির বিষয় আছে। এগুলো শেষ হলে অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে সুস্পষ্ট ঘোষণা দেবে। তবে মনে হচ্ছে, এসব কাজ করতে এক থেকে দেড় বছর লাগবে না।’ ‘সরকার চাইলে চলতি বছরেই নির্বাচন করতে পারে’ এমন মন্তব্য করেছেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। তিনি বলেন, ‘এখন সরকারের দিক থেকে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) বার্তা দেওয়া দরকার যে তারা ২০২৫ সালের মধ্যে নির্বাচন করতে চায়।’ তবে অন্তর্র্বর্তী বৈষম্যবিরোধী ও জাতীয় নাগরিক কমিটি স্বল্প সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে নয়। মৌলিক ও জাতীয় জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার করার পরই তারা নির্বাচনের পক্ষে, তাতে যদি দুই-আড়াই বছরও লাগে। অবশ্য জামায়াতে ইসলামী নীতিগতভাবে বৈষম্যবিরোধীদের পক্ষে। 

ভুলে গেলে চলবে না নির্বাচনের নামে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় যা হয়েছে, তা ছিল প্রহসন। শুধুমাত্র তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ই নির্বাচন মোটামুটি সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য হয়েছিল। তারপর কোনো নির্বাচনই গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। আমি-তুমি নির্বাচনের ফলে দেশের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এবারই যেহেতু প্রথমবারের মতো নতুনরা ভোট দেবে সুতরাং নিরপেক্ষতার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। মনে রাখা দরকার, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী না হলে, সবকিছুই ধ্বংস হয়ে যায়। নির্বাচন প্রশ্নে সম্মিলিতভাবে রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে আমরা এগিয়ে যেতে চাই। আমাদের প্রত্যাশা, নির্বাচনী খরা কেটে বৃষ্টি আসুক।