‘বাংলাদেশ পুলিশের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে কঠোর প্রতিযোগিতা পেরিয়ে আমরা সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) পদে চাকরি পেয়েছিলাম। কিন্তু সেই স্বপ্ন চুরমার হয়ে গেছে প্রশিক্ষণ চলাকালে অব্যাহতি পাওয়ার মধ্য দিয়ে। সামান্য কারণ দেখিয়ে অন্যায়ভাবে আমাদের চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। আমরা দয়া চাই না, ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দিন।’
গতকাল রবিবার সকালে চাকরিতে পুনর্বহালের দাবিতে সচিবালয়ের বিপরীত পাশে জিরো পয়েন্ট এলাকায় অবস্থান কর্মসূচি পালনকালে চাকরিহারা এসআইরা এভাবেই বলছিলেন। কর্মসূচিতে ২ শতাধিক অব্যাহতিপ্রাপ্ত এসআই অংশ নেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া ৪০তম ক্যাডেট এসআই ব্যাচে ৮২৩ জন ছিলেন। প্রশিক্ষণ চলাকালে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ এনে তাদের মধ্যে ৩২১ জনকে একাধিক দফায় চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এর মধ্যে গত ২১ অক্টোবর ২৫২ জন, ৪ নভেম্বর ৫৮, ১৮ নভেম্বর ৩ এবং সর্বশেষ গত ১ জানুয়ারি ৮ জনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল প্রশিক্ষণ মাঠে উচ্চ স্বরে হইচই করা!
অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া সাবেক ক্যাডেট এসআই মোস্তফা বলেন, ‘এক বছর ধরে কঠোর পরিশ্রমের পর সামান্য কারণে আমাদের চাকরি হারাতে হলো। আমরা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। এই চাকরিটাই আমাদের স্বপ্ন ছিল। আমাদের পুনর্বহাল করা হোক।’
আরেক আন্দোলনকারী সাজেদুল হাসান বলেন, ‘৪০তম ক্যাডেট সাব-ইন্সপেক্টর ব্যাচের চলমান ট্রেনিং থেকে অন্যায়ভাবে আমাদের অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। আমরা ন্যায়বিচার চাই, পুনর্বহাল চাই।’
চাকরিচ্যুত এসআই রবিউল ইসলাম বলেন, ‘শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ তুলে আমাদের চাকরি কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এটি অবিচার ছাড়া কিছুই নয়। সরকারের কাছে অনুরোধ, আমাদের ফিরে যাওয়ার সুযোগ দিন।’
এক নারী সাবেক এসআই বলেন, ‘আমরা কঠোর পরিশ্রম করে সব ধরনের পরীক্ষা পাস করেছি। যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রশিক্ষণের সুযোগ পেয়েছি। কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই আমাদের অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইজিপি স্যারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে স্মারকলিপি দিয়েছি, কিন্তু কোনো সাড়া পাইনি। আমাদের চাকরির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। বাধ্য হয়েই এখানে এসেছি, দেখি সরকার কী ব্যবস্থা নেয়।’
এসআই হওয়ার স্বপ্ন দেখা এই তরুণদের অনেকেই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তারা বলছেন, প্রশিক্ষণ প্রায় শেষপর্যায়ে পৌঁছানোর পর আচমকা এমন সিদ্ধান্ত তাদের পরিবারকেও সংকটে ফেলে দিয়েছে। চাকরিচ্যুত এক এসআই আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, ‘আমার বাবা-মা আমার সাফল্য দেখতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আজ আমি বেকার। আমাদের কি আর কোনো ভবিষ্যৎ নেই?’
অবস্থান কর্মসূচির বিষয়ে শাহবাগ থানার ওসি মোহাম্মদ খালিদ মনসুর বলেন, ‘গতকাল রবিবার সকাল ১০টার দিকে ২০০ থেকে ২৫০ জন্য অব্যাহতিপ্রাপ্ত সাব-ইন্সপেক্টর সচিবালয়ের উল্টোদিকের রাস্তায় জিরো পয়েন্টের কাছে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তাদের অপরাধ যদি এতটাই গুরুতর হয়, তবে সেটা প্রমাণ করা হোক। কিন্তু ঢালাইভাবে বরখাস্ত করা ঠিক নয়। সামান্য কারণ দেখিয়ে তাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে বলে আমি মনে করছি না। বাংলাদেশ পুলিশের জন্য এসআই একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।’